কক্সবাজারের উখিয়া-টেকনাফের বনাঞ্চল শুধু রোহিঙ্গাদের চাপেই ক্ষতিগ্রস্ত হয়নি; দেশি-বিদেশি এনজিও-আইএনজিওর দখলদারিতেও সংকুচিত হচ্ছে হাজারো একর বনভূমি। সরকারি নোটিশ ও বন আইন অমান্য করে এসব সংস্থা অবৈধভাবে অফিস, ওয়্যারহাউস, প্রকল্প কার্যালয়সহ স্থাপনা গড়ে তুলেছে। অথচ এ জমি যদি সরকার নিয়মতান্ত্রিকভাবে ইজারা দিত, বছরে শতকোটি টাকা রাজস্ব আদায় সম্ভব ছিল। বাস্তবে কোটি কোটি টাকা চলে যাচ্ছে দখলবাজ সিন্ডিকেটের হাতে।
সরেজমিন অনুসন্ধানে জানা গেছে, ২০১৭ সালে রোহিঙ্গা ঢলের পর বনভূমি উন্মুক্ত করার সুযোগে স্থানীয় দখলদাররা বনের জমি দখল করে এনজিওদের কাছে ভাড়া দিতে শুরু করে। ওয়ালাপালংয়ের মুহুরীপাড়া, মধুরছড়া, কুতুপালং, ফলিয়াপাড়া—প্রায় সব জায়গায়ই দেখা যাচ্ছে বিশাল অবৈধ স্থাপনা। মাইশা এন্টারপ্রাইজ নামের এক প্রতিষ্ঠানের ম্যানেজার রাশিক খান দাপটের সঙ্গে বনভূমি দখল করে স্থানীয়দের প্রবেশও নিয়ন্ত্রণ করছেন।
উখিয়া রেঞ্জ অফিস ২০২৪ সালের ২৯ সেপ্টেম্বর ব্র্যাক, ডব্লিউএফপি, আইওএম, ইউএনএইচসিআরসহ ছয়টি এনজিও-আইএনজিওকে বৈধ কাগজপত্র প্রদর্শনের নোটিস দিলেও কেউ সাড়া দেয়নি। বরং দখল করা স্থাপনায় তারা আগের মতোই কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, এনজিওগুলো সরাসরি দখল করেনি; তারা প্রভাবশালীদের কাছ থেকে জায়গা ভাড়া নিয়েছে। মাসে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে দখল সিন্ডিকেট। সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান জাহাঙ্গীর কবির চৌধুরী মধুরছড়ার একটি দখলকৃত জায়গা আন্তর্জাতিক সংস্থা ডব্লিউএফপির কাছে ভাড়া দিয়েছেন সাত লাখ ৫০ হাজার টাকায়। মুহুরীপাড়ার ইব্রাহিম প্রকাশ্যে স্বীকার করেছেন, তিনি দখল করা জমি এনজিও ফোরামের কাছে ভাড়া দিয়েছেন এবং লাখ টাকা আয় করছেন।
দখলকৃত বনে এখন সড়ক কাটা হয়েছে, কাঁটাতারের বেড়া বসানো হয়েছে, বড় বড় ভবন দাঁড়িয়ে গেছে। হাতির করিডোর বন্ধ হয়ে পড়ায় মানুষ-হাতি সংঘাত বেড়েছে। হারিয়ে যাচ্ছে হরিণ, বন্যশূকরসহ অসংখ্য প্রাণীর প্রাকৃতিক আবাসস্থল। পরিবেশবিদরা সতর্ক করে বলছেন, এই ধারা চলতে থাকলে উখিয়া-টেকনাফের জীববৈচিত্র্য চিরতরে ধ্বংস হবে।
উখিয়া রেঞ্জ কর্মকর্তা আব্দুল মান্নান জানিয়েছেন, এনজিও-আইএনজিওগুলোকে নোটিস দেওয়ার পরও কোনো জবাব পাওয়া যায়নি। আদালতের মাধ্যমে উচ্ছেদ প্রক্রিয়া শুরু করার কথা থাকলেও স্থানীয় প্রশাসন কার্যকর পদক্ষেপ নিচ্ছে না। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ভারপ্রাপ্ত) ফোন ধরেননি বলেও অভিযোগ রয়েছে। স্থানীয়রা মনে করেন, প্রভাবশালী রাজনৈতিক মহল ও আন্তর্জাতিক দাতাদের ছত্রছায়ায় এসব দখল কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে।
বিশ্লেষকরা মনে করেন, সরকার যদি আইনি প্রক্রিয়ায় বনভূমি ইজারা দিত, বছরে কয়েকশ কোটি টাকা রাজস্ব আদায় হতো। এখন অবৈধ দখলদাররা টাকা লুটছে, সরকার পাচ্ছে না কিছুই। তাদের মতে— দখলকৃত এলাকা জরিপ করে চিহ্নিত করতে হবে, অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ করে এনজিও-আইএনজিওকে বিকল্প জমিতে স্থানান্তর করতে হবে এবং দখল সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে কঠোর আইন প্রয়োগ করতে হবে।
স্থানীয়দের মতে, উখিয়া-টেকনাফের বনভূমি শুধু রোহিঙ্গাদের জন্য নয়, এনজিও-আইএনজিও ও স্থানীয় সিন্ডিকেটের দখলদারিতেই ধ্বংসের পথে। এখনই আইন প্রয়োগ না করলে বনভূমি হারিয়ে যাবে, পরিবেশ ভেঙে পড়বে, আর কোটি কোটি টাকা চলে যাবে সিন্ডিকেটের হাতে।
-সূত্র- প্রতিদিনের বাংলাদেশ


