মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে জান্তা বাহিনী ও বিদ্রোহী আরাকান আর্মির মধ্যে নতুন করে সংঘাত শুরু হওয়ায় বিপদে পড়েছে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী। প্রাণ বাঁচাতে ইতোমধ্যেই আরও একটি ঢল শুরু হয়েছে। এ পরিস্থিতিতে জাতিসংঘের শরণার্থীবিষয়ক সংস্থা ইউএনএইচসিআর বাংলাদেশ সরকারের কাছে নতুন করে ১ লাখ ১৩ হাজারেরও বেশি রোহিঙ্গাকে আশ্রয় দেওয়ার অনুরোধ জানিয়েছে।
জাতিসংঘের এই অনুরোধ গত ২৮ এপ্রিল আনুষ্ঠানিকভাবে চিঠির মাধ্যমে বাংলাদেশ সরকারের কাছে পেশ করা হয় বলে জানিয়েছে তুরস্কের রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা আনাদোলু। অনুরোধপত্রে জানানো হয়, এই বিপুল সংখ্যক রোহিঙ্গা বর্তমানে সীমান্ত এলাকায় অবস্থান করছে এবং জরুরি মানবিক সহায়তা প্রয়োজন।
রিফিউজি রিলিফ অ্যান্ড রিপ্যাট্রিয়েশন কমিশনের (আরআরআরসি) কমিশনার মোহাম্মদ মিজানুর রহমান জানান, “নতুন রোহিঙ্গাদের একটি অংশ ইতোমধ্যেই কক্সবাজারের আশপাশে অবস্থান নিয়েছে। কেউ কেউ স্কুল, মসজিদসহ স্থানীয় অবকাঠামোতে আশ্রয় নিচ্ছে। এখনো পর্যন্ত বাংলাদেশ সরকার জাতিসংঘের অনুরোধের বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্ত জানায়নি।”
তিনি আরও বলেন, “নতুন ঢল শুরু হলে পুনর্বাসন প্রক্রিয়া আরও জটিল হয়ে উঠবে। বর্তমান শিবিরগুলোতেই তীব্র সংকট চলছে। নিরাপত্তা, খাদ্য, পানি, চিকিৎসা ও শিক্ষার প্রশ্নে আমরা এমনিতেই হিমশিম খাচ্ছি।”
২০১৭ সালের আগস্টে মিয়ানমারের সামরিক বাহিনীর নিপীড়নের মুখে প্রায় সাত লাখ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়। বর্তমানে কক্সবাজারে বিশ্বের সবচেয়ে বড় শরণার্থী শিবিরে বসবাস করছে প্রায় ১৫ লাখ রোহিঙ্গা। তাদের সুরক্ষা, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, খাদ্য ও নিরাপত্তার ভার বহন করছে বাংলাদেশ ও আন্তর্জাতিক দাতারা। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে আন্তর্জাতিক সহায়তা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে, যার ফলে রোহিঙ্গাদের রেশন হ্রাসসহ নানান সংকট দেখা দিয়েছে।
আরাকান আর্মি সম্প্রতি রাখাইনের বেশিরভাগ এলাকা দখলে নিয়েছে বলে জানিয়েছে স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকরা। রাজধানী সিতওয়ে ছাড়া পুরো রাজ্য এখন বিদ্রোহীদের নিয়ন্ত্রণে। রোহিঙ্গা অধ্যুষিত অঞ্চলগুলোতে নতুন করে সহিংসতা শুরু হওয়ায় পালিয়ে আসার প্রবণতা বাড়ছে। আনাদোলুর খবরে বলা হয়েছে, গত সপ্তাহেই ১ হাজার ৪৪৮টি পরিবার সীমান্ত পেরিয়ে বাংলাদেশে ঢুকেছে।
নতুন করে রোহিঙ্গাদের ঢল সামাল দেওয়া বাংলাদেশের পক্ষে আদৌ সম্ভব কি না—এ নিয়ে প্রশ্ন উঠছে নীতিনির্ধারক মহলে। নিরাপত্তাজনিত দিক ছাড়াও জলবায়ু, পরিবেশ, স্থানীয় জনজীবনে প্রভাব, অপরাধের প্রবণতা—সবকিছুই বিবেচনায় আনতে হচ্ছে সরকারকে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের উচিত বাংলাদেশকে এই সংকট মোকাবেলায় আরও বৃহত্তর সহায়তা দেওয়া। সেই সঙ্গে রোহিঙ্গাদের নিরাপদে নিজ দেশে ফেরত পাঠানোর জন্য চাপ সৃষ্টি করাও জরুরি।
বাংলাদেশ মানবিক বিবেচনায় আগত রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দিয়েছে, এখনো দিচ্ছে। তবে নতুন করে লাখো মানুষের ভার বহন করা আর সহজ নয়। ইউএনএইচসিআরের অনুরোধের প্রেক্ষিতে বাংলাদেশের অবস্থান এখন আন্তর্জাতিক রাজনীতির কৌশলগত কেন্দ্রবিন্দুতে এসে দাঁড়িয়েছে। একদিকে মানবিক দায়বদ্ধতা, অন্যদিকে জাতীয় স্বার্থ—এ দুইয়ের ভারসাম্য রক্ষা করেই সরকারকে সিদ্ধান্ত নিতে হবে।
-পার্বত্য সময়


