কক্সবাজারের উখিয়ার একাধিক রোহিঙ্গা আশ্রয় শিবিরে গত এক সপ্তাহধরে অস্থিরতা দেখা দিয়েছে। শিবিরের আধিপত্য ধরে রাখতে দুই বিদ্রোহী সংগঠন আরসা ও আরএসওর সদস্যরা প্রকাশ্যে গোলাগুলি, সংর্ঘষের সাথে জড়িয়েছে। তারই ধারাবাহিকতায় ১৭ নম্বর আশ্রয় শিবিরে ঘরে ডুকে একই পরিবারের পিতা, পুত্র ও মেয়েসহ তিনজনকে গুলি করে হত্যা করেছে অস্ত্রধারী সন্ত্রাসীরা।
পুলিশ বলছে অস্ত্রধারী সন্ত্রাসীরা রোহিঙ্গা শিবির গুলোতে দিন দিন অস্থিরতা তৈরী করছে। নিজেরা নিজেরা খুনাখুনির মতো ঘটনায় জড়িয়ে পড়ছে। রাতের আধাঁরে ও দিনে প্রকাশ্যে গোলাগুলির ঘটনায় মারা যাচ্ছে বহু সংখ্যাক সাধারণ রোহিঙ্গা।
উখিয়া থানা সূত্রে জানা গেছে সোমবার ভোররাতে ১৭ নম্বর রোহিঙ্গা শিবিরে সন্ত্রাসী সংগঠন আরএসও সদস্যরা আরসার সদস্য আখ্যা দিয়ে আহমদ হোসেনের বাড়িতে ডুকে এলোপাতাড়ি ব্রাশ ফায়ার করে। সেখান প্রাণ হারায় ওই শিবিরের ১০৪ নম্বর ব্লকের বাসিন্দা আহমদ হোসেন (৬০), তার ছেলে সৈয়দুল আমিন (২৮) ও মেয়ে আসমা (১৩)।
গত বৃহস্পতিবার উখিয়ার পৃথক রোহিঙ্গা শিবিরে এক যুবককে গলা টিপে হত্যা এবং আরসা ও আরএসও এর সংঘর্ষে গুলিবিদ্ধ এক এনজিও কর্মিসহ আহত হয় আরও পাঁচজন। এর মধ্যে কুতুপালং ২-ইস্ট নম্বর রোহিঙ্গা ক্যাম্পের পরিত্যক্ত একটি ঘর থেকে মোহাম্মদ এমরান (১৮) নামের এক রোহিঙ্গার মরদেহ উদ্ধার করা হয়। তিনি ৩ নম্বর রোহিঙ্গা ক্যাম্পের জি-৮১ ব্লকের মোহাম্মদ ইদ্রিসের ছেলে।
একইদিন ১৫ নম্বর ক্যাম্পে আরসা ও আরএসও মধ্যে গোলাগুলি ঘটনায় গুলিবিদ্ধ হয়ে আহত হয়েছেন উখিয়ার পালংখালী ইউনিয়নের বালুখালী এলাকার ওমর হাকিমের ছেলে বেলাল উদ্দিন (৩৫)। তিনি আমান নামের একটি এনজিওতে ক্যাম্প-১৫ এর লার্নিং সেন্টারে কর্মরত ছিলেন।
এ ঘটনায় আহত হয় ১৫ নম্বর ক্যাম্পের ডি-৭ ব্লকের হোসেনের ছেলে ওমর ফারুক (৩০), ব্লক ৩ এর আবদুর রশিদের ছেল মো. ইউনুস (২৫), ১১ নম্বর ক্যাম্পের ব্লক ২ এর মো. আলমের ছেলে আবদুল্লাহ (১৮), ১৪ নম্বর ক্যাম্পের আবদুল গনির মেয়ে হামিদা (৫০)।
গত বৃহস্পতিবার ও শুক্রবারের ঘটনায় ক্যাম্পে অস্থিরতা তৈরী হলে তা ঠেকাতে ১৪ ও ১৫ নম্বর শিবিরে লাঠিসোঁটা নিয়ে বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশ করেন সাধারণ রোহিঙ্গারা। এ ঘটনার পর থেকে ক্যাম্পে নিয়োজিত সেবাদানকারী সংস্থার লোকজন ভয়ে যাচ্ছে না বলে একাধিক এনজিওর প্রতিনিধিরা জানিয়েছেন।
রোহিঙ্গা ক্যাম্পের ভেতরে থমথমে পরিস্থিতি বিরাজ করছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে অতিরিক্ত এপিবিএন পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে বলে ৮ এপিবিএন পুলিশের অধিনায়ক (অতিরিক্ত ডিআইজি) মোহাম্মদ আমির জাফর জানিয়েছেন।
সাধারণ রোহিঙ্গারা নাম প্রকাশ না করে জানান, রোহিঙ্গা ক্যাম্পে হঠাৎ অস্থিরতা বেড়ে গেছে। দিনে-রাতে সমানতালে গোলাগুলি চলছে। ঘর থেকে বের হতে ভয় লাগে।
গত তিনদিন ধরে উখিয়ার শফিউল্লাহ কাটা, জামতলী, হাকিম পাড়া, বালুখালী, ময়নারঘোনা, জামতলীসহ বিভিন্ন রোহিঙ্গা ক্যাম্পে রাতের আধাঁরে দেশী ও বিদেশি অস্ত্রের গোলাগুলির শব্দ ভেসে আসে। গোলাগুলির শব্দের ক্যাম্পের পার্শ্ববর্তী এলাকার বাংলাদেশি বাসিন্দাদের মাঝে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে।
স্থানীয় বাংলাদেশি বাসিন্দা জয়নাল আবেদীন প্রতিবেদকে জানান, শফিউল্লাহ কাটা ও জামতলী ক্যাম্পে গত দুইদিন ধরে দুই সন্ত্রাসী গ্রুপের ধাওয়া দেওয়া এবং গোলাগুলি হচ্ছে। এ সময় সন্ত্রাসীরা কয়েক শ রাউন্ড ফাঁকা গুলিবর্ষণ করেছে।
উখিয়ার জামতলী রোহিঙ্গা ক্যাম্পের একাধিক ব্যবসায়ী জানান, গত শনিবার সকালে কিছু সংখ্যক রোহিঙ্গাকে মিছিল করতে দেখেছি।
৮ আর্মড পুলিশ ব্যাটেলিয়নের (এপিবিএন) অধিনায়ক ও অতিরিক্ত ডিআইজি আমির জাফর বলেন, কিছুসংখ্যক রোহিঙ্গা গত শনিবার মিছিল করেছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ রাখতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা সজাগ রয়েছে।
উখিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. আরিফ হোসাইন বলেন, নিহতদের মরদেহ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য কক্সবাজার সদর হাসপাতাল মর্গে পাঠানোর প্রস্তুতি চলছে।
পুলিশ ও রোহিঙ্গাদের দেওয়া তথ্যমতে, চলতি বছরের ২১ অক্টোবর পর্যন্ত সাড়ে ৯ মাসে আশ্রয়শিবিরগুলোতে বেশ কয়েকটি সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। এতে অন্তত ৭৪ জন রোহিঙ্গা খুন হয়েছেন। এসব সংঘর্ষের মধ্যে আরসা ও আরএসও এবং ক্যাম্পে সক্রিয় রোহিঙ্গা সন্ত্রাসী বাহিনীর মধ্যে ঘটেছে।
বর্তমানে উখিয়া ও টেকনাফের ৩৩টি আশ্রয়শিবিরে নিবন্ধিত সাড়ে ১২ লাখ রোহিঙ্গার বসবাস। এর মধ্যে আট লাখ রোহিঙ্গা মিয়ানমারের সেনাবাহিনীর অত্যাচার-নির্যাতনে বাস্তুচ্যুত হয়ে ২০১৭ সালের ২৫ আগস্টের পরের কয়েক মাসে আশ্রয় নেওয়া। এ পর্যন্ত একজন রোহিঙ্গাকেও মিয়ানমারে ফেরত পাঠানো সম্ভব হয়নি।
রোহিঙ্গা কমিউনিটির নেতারা বলছেন, রোহিঙ্গা আশ্রয়শিবিরে সক্রিয় মিয়ানমারের সশস্ত্র গোষ্ঠী আরসা ও আরএসওর মধ্যে ক্যাম্পের আধিপত্য বিস্তার, মতাদর্শগত বিরোধ, মাদক পাচার ও চোরাচালানসহ বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড নিয়ন্ত্রণ নিয়ে প্রায় প্রতিদিনই কোনো না কোনো ক্যাম্পে গোলাগুলি ও সংঘর্ষের ঘটনা ঘটছে।
- -পার্বত্য সময়


