বিশ্ব খরা ও মরুকরণ প্রতিরোধ দিবস আজ বুধবার (১৭ জুন)। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে বিশ্বজুড়ে ক্রমবর্ধমান খরা, ভূমিক্ষয় এবং মরুকরণের ভয়াবহতা সম্পর্কে সচেতনতা তৈরি এবং এর বিরুদ্ধে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণে উৎসাহিত করাই এ দিবসের মূল উদ্দেশ্য।
জাতিসংঘের উদ্যোগে ১৯৯৫ সাল থেকে বিশ্বব্যাপী দিবসটি পালিত হয়ে আসছে। এর আগে, ১৯৭৫ সালে প্রথমবারের মতো জাতিসংঘ খরা ও মরুকরণের বিষয়ে বিশ্ববাসীকে সচেতন হওয়ার আহ্বান জানায়। ১৯৭৭ সালে নাইরোবিতে অনুষ্ঠিত বিশ্ব মরুকরণবিরোধী সম্মেলনের মাধ্যমে এ বিষয়ে আন্তর্জাতিক অগ্রগতি শুরু হয়। পরবর্তীতে ১৯৯২ সালের রিও ডি জেনিরোতে অনুষ্ঠিত জাতিসংঘের পরিবেশ ও উন্নয়ন বিষয়ক সম্মেলনের পর মরুকরণ সংক্রান্ত আন্তর্জাতিক কনভেনশন গ্রহণের প্রক্রিয়া শুরু হয়। ১৯৯৪ সালে কনভেনশন চূড়ান্ত হয় এবং ১৯৯৬ সালের ২৬ ডিসেম্বর থেকে এটি কার্যকর হয়।
বিশ্বব্যাপী বিশেষজ্ঞদের মতে, পৃথিবীর প্রায় ৭০ শতাংশ জলভূমি ইতিমধ্যে কোনো না কোনোভাবে মরুকবলিত হয়েছে। সেচনির্ভর আবাদি জমির বড় অংশ নিষ্কাশন ব্যবস্থার ত্রুটি, লবণাক্ততা বৃদ্ধি এবং অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহারের কারণে অবক্ষয়ের মুখে পড়েছে। বর্তমানে পৃথিবীর মোট ভূমির প্রায় এক-চতুর্থাংশ মরুকরণের ঝুঁকিতে রয়েছে বলে বিভিন্ন গবেষণায় উঠে এসেছে।
মরুকরণের প্রধান কারণ হিসেবে জলবায়ু পরিবর্তন, অনিয়ন্ত্রিত নগরায়ন, বন উজাড়, ভূগর্ভস্থ পানির অতিরিক্ত ব্যবহার, নদী-নালা ও জলাশয় শুকিয়ে যাওয়া এবং ভূমির অযৌক্তিক ব্যবহারকে দায়ী করা হয়। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এসব কারণে কৃষি উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে, খাদ্য নিরাপত্তা হুমকির মুখে পড়ছে এবং পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট হচ্ছে।
বাংলাদেশও জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর মধ্যে অন্যতম। দেশের উত্তরাঞ্চল বিশেষ করে রাজশাহী অঞ্চলকে খরাপ্রবণ এলাকা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। নদীমাতৃক বাংলাদেশে নদী ভাঙন, নদী শুকিয়ে যাওয়া এবং দখল-দূষণের কারণে পরিবেশগত সংকট আরও বাড়ছে। গবেষণা সংস্থাগুলোর তথ্য অনুযায়ী, গত কয়েক দশকে প্রধান নদীগুলোতে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ ভূমি বিলীন হলেও নতুন ভূমি সৃষ্টির হার তুলনামূলকভাবে কম।
সেন্টার ফর এনভায়রনমেন্টাল অ্যান্ড জিওগ্রাফিক ইনফরমেশন সার্ভিসেসের (সিইজিইউএস) তথ্যমতে, গত ৪০ বছরে শুধু পদ্মা, মেঘনা ও যমুনা নদীতে প্রায় ১ লাখ ৫০ হাজার হেক্টর জমি বিলীন হয়েছে। অন্যদিকে নতুন ভূমি জেগেছে মাত্র ৩০ হাজার হেক্টর।
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, মরুকরণ প্রতিরোধে বৃক্ষরোপণ, বন সংরক্ষণ, জৈব কৃষি সম্প্রসারণ এবং পানি ব্যবস্থাপনার উন্নয়ন অত্যন্ত জরুরি। একইসঙ্গে নদী ও জলাশয় রক্ষা এবং পরিকল্পিত ভূমি ব্যবহারের ওপর গুরুত্ব দিতে হবে।
জাতিসংঘের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিশ্বের প্রায় ১৫০ কোটি মানুষ ক্ষয়িষ্ণু ভূমির ওপর নির্ভরশীল, যার মধ্যে দরিদ্র জনগোষ্ঠীর একটি বড় অংশ রয়েছে ঝুঁকিতে। আশঙ্কা করা হচ্ছে, এ প্রবণতা অব্যাহত থাকলে ভবিষ্যতে খাদ্য সংকট, পরিবেশগত বিপর্যয় এবং সামাজিক অস্থিরতা আরও বাড়তে পারে।


