বিশ্বজুড়ে আজ রোববার (২১ জুন) পালিত হচ্ছে বাবা দিবস। ক্যালেন্ডারের পাতায় এটি একটি দিন হলেও, বাস্তব জীবনে এর তাৎপর্য ছড়িয়ে আছে প্রতিটি পরিবারের প্রতিদিনের গল্পে। বাবা এমন একজন মানুষ, যিনি অনেক সময় আলোচনার কেন্দ্রে থাকেন না, কিন্তু পরিবারের প্রতিটি সিদ্ধান্ত, স্বপ্ন এবং স্থিতিশীলতার পেছনে তার উপস্থিতি সবচেয়ে বেশি।

বাবার ভালোবাসা সাধারণত শব্দে প্রকাশ পায় না। এটি প্রকাশ পায় দায়িত্বে, পরিশ্রমে, আর ভবিষ্যৎ গড়ার নীরব পরিকল্পনায়। সন্তান যখন ঘুমায়, তখন অনেক বাবাই চিন্তা করেন আগামী দিনের স্কুল ফি, ঘরের খরচ, চিকিৎসা বা ভবিষ্যতের নিরাপত্তা নিয়ে।

একজন বাবার জীবন অনেক সময় একটানা দায়িত্ব পালনের নামান্তর। সকালে বের হওয়া, দিনভর কাজ, আর রাতে ক্লান্ত শরীর নিয়ে ঘরে ফেরা—এই চক্রের মাঝেই লুকিয়ে থাকে সন্তানের ভবিষ্যৎ।

ঢাকার একজন পোশাক শ্রমিক রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘নিজের জন্য কিছু ভাবার সময় পাই না। শুধু ভাবি, মেয়েটা যেন লেখাপড়া চালিয়ে যেতে পারে।’

তার এই একটি বাক্যের মধ্যেই লুকিয়ে আছে হাজারো বাবার বাস্তবতা—নিজের চাওয়া-পাওয়াকে পাশে রেখে সন্তানের স্বপ্নকে সামনে রাখা।

গ্রামের বাবাদের গল্প আরও কঠিন। কৃষি, দিনমজুরি বা ছোট ব্যবসার অনিশ্চয়তার মধ্যেও তারা সন্তানকে শিক্ষিত করার স্বপ্ন দেখেন।

খাগড়াছড়ির এক কৃষক বাবা বলেন, তিনি নিজের প্রয়োজন কমিয়ে দিয়েছেন, কিন্তু ছেলের পড়াশোনা বন্ধ করেননি। তার ভাষায়, ‘ফসল ভালো হোক বা খারাপ, আমি চাই আমার ছেলে ভালো মানুষ হোক।’

এই ধরনের গল্প দেশের প্রতিটি গ্রামে ছড়িয়ে আছে—যেখানে বাবার ত্যাগ কোনো হিসাব-নিকাশে ধরা পড়ে না।

শহরের বাবাদের ভূমিকা এখন আগের চেয়ে ভিন্ন। শুধু উপার্জন নয়, সন্তান লালন-পালনে অংশগ্রহণও বেড়েছে।

ঢাকার এক ব্যাংক কর্মকর্তা বলেন, ‘আমার বাবা আমাদের সময় দিতে পারতেন না। আমি চেষ্টা করি আমার সন্তান যেন আমাকে কাছে পায়।’

আজ অনেক বাবা সন্তানের স্কুলে যাওয়া-আসা, পড়াশোনা, এমনকি খেলাধুলার সঙ্গী হিসেবেও ভূমিকা রাখছেন। এটি পারিবারিক সম্পর্ককে আরও ঘনিষ্ঠ করছে।

অনেক পরিবারে বাবা একাই মা-বাবার দায়িত্ব পালন করেন। বিচ্ছেদ, মৃত্যু বা অন্য কারণে সন্তানকে বড় করার পুরো দায়িত্ব পড়ে তার কাঁধে।

এমনই এক একক বাবা বলেন, ‘দিনে কাজ করি, রাতে সন্তানদের দেখাশোনা করি। ক্লান্তি আছে, কিন্তু থামার সুযোগ নেই।’

এই বাবাদের জীবন অনেক বেশি নিঃশব্দ, কিন্তু দায়িত্বে সবচেয়ে ভারী।

রিকশাচালক, দিনমজুর, নির্মাণশ্রমিক—এই শ্রেণির বাবাদের জীবন প্রতিদিনের সংগ্রামের গল্প। রোদ, বৃষ্টি, শীত—সব আবহাওয়ায় তাদের কাজ থামে না।

একজন রিকশাচালক বলেন, ‘নিজে কষ্ট করলেও ছেলে-মেয়েকে কষ্ট দিতে চাই না।’

এই এক লাইনেই বোঝা যায় তাদের জীবনের মূল দর্শন—নিজের কষ্টে সন্তানের স্বস্তি নিশ্চিত করা।

ডিজিটাল যুগে বাবার ভূমিকাও বদলেছে। এখন অনেক বাবা সন্তানদের প্রযুক্তি ব্যবহার, অনলাইন শিক্ষা এবং ক্যারিয়ার পরিকল্পনায় সক্রিয়ভাবে যুক্ত।

একজন আইটি পেশাজীবী বাবা বলেন, ‘আমি চাই আমার ছেলে শুধু ভালো ছাত্র না, ভালো মানুষও হোক।’

এখন বাবা অনেক ক্ষেত্রেই শিক্ষক, বন্ধু এবং গাইড—একসঙ্গে তিনটি ভূমিকা পালন করছেন।

অনেক সংস্কৃতিতে বাবারা আবেগ প্রকাশে সংযমী হন। তারা সরাসরি ‘ভালোবাসি না’ বললেও তাদের ভালোবাসা প্রকাশ পায় কাজে।

নতুন জুতা কেনা, সময়মতো স্কুলে পৌঁছে দেওয়া, অসুস্থতায় রাত জাগা—এসবই বাবার ভালোবাসার ভাষা।

জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের শিক্ষার্থী আজাদ বলেন, ‘আমার বাবা কখনো বলে না তিনি আমাকে ভালোবাসেন, কিন্তু আমি জানি তিনিই সবচেয়ে বেশি ভালোবাসেন।’

সমাজে বাবার অদৃশ্য ভিত্তি

পরিবারের কাঠামোয় বাবা অনেক সময় একটি ভিত্তির মতো কাজ করেন—যাকে দেখা যায় না, কিন্তু যার ওপর পুরো পরিবার দাঁড়িয়ে থাকে। সেই ভিত্তি শক্ত হলে পরিবার স্থিতিশীল থাকে, আর দুর্বল হলে পুরো কাঠামো নড়ে যায়।

বাবার এই ভূমিকা অনেক সময় অদৃশ্য থাকে, কিন্তু সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

বাবা দিবস শুধু একটি আনুষ্ঠানিক উদযাপন নয়, বরং এটি উপলব্ধির দিন। বাবার ত্যাগ, নীরবতা এবং দায়িত্বকে নতুন করে বোঝার সুযোগ।

একজন বাবার ভালোবাসা হয়তো শব্দে কম, কিন্তু কাজের মাধ্যমে সবচেয়ে গভীর। তিনি নিজের স্বপ্ন কমিয়ে দেন, যাতে সন্তানের স্বপ্ন বড় হতে পারে।

বাবা মানে শুধু একজন উপার্জনকারী নন, বরং একটি পরিবারের নীরব শক্তি। তার উপস্থিতি হয়তো সবসময় চোখে পড়ে না, কিন্তু তার অনুপস্থিতি পুরো পরিবারকে বদলে দিতে পারে।

এই বাবা দিবসে তাই শুধু শুভেচ্ছা নয়—একটু সময়, একটু কৃতজ্ঞতা আর একটু উপলব্ধিই হয়তো একজন বাবার সবচেয়ে বড় পাওয়া।