দেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলসহ বিভিন্ন জেলায় টানা ভারী বর্ষণ, পাহাড়ি ঢল ও উজানের পানিতে সৃষ্ট বন্যার পরিস্থিতি ধীরে ধীরে উন্নতির দিকে গেলেও দুর্ভোগ কাটেনি মানুষের। পানি নামতে শুরু করায় এখন সামনে আসছে ক্ষয়ক্ষতির ভয়াবহ চিত্র। কোথাও ঘরবাড়ি ধ্বংস, কোথাও কৃষিজমি ও খামারের ক্ষতি, আবার কোথাও নদীভাঙনে বসতভিটা হারানোর শঙ্কায় দিন কাটাচ্ছেন মানুষ।
দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, দেশের সাত জেলার ৫৯টি উপজেলা বন্যাকবলিত হয়েছে। বন্যা, পাহাড়ি ঢল ও পাহাড়ধসে এ পর্যন্ত ৫১ জনের মৃত্যু হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন ১০ লাখ ২২ হাজার ৯৬৩ জন মানুষ। পানিবন্দী রয়েছে ২ লাখ ৬৭ হাজার ৯১৮টি পরিবার।
মৃতদের মধ্যে কক্সবাজারে সর্বোচ্চ ২৮ জন, চট্টগ্রামে ১৩ জন, বান্দরবানে ৬ জন, রাঙামাটিতে ৩ জন এবং মৌলভীবাজারে ১ জন রয়েছেন।
বান্দরবানে পানি নামলেও দুর্ভোগ অব্যাহত
টানা কয়েক দিনের ভয়াবহ বন্যার পর বান্দরবানের পরিস্থিতি ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হতে শুরু করেছে। বৃষ্টিপাত কমে আসায় সাঙ্গু ও মাতামুহুরী নদীর পানি কমছে। আশ্রয়কেন্দ্রে থাকা মানুষজন ফিরছেন নিজ নিজ বাড়িতে।
তবে বাড়ি ফিরে নতুন সংকটের মুখোমুখি হচ্ছেন তারা। ঘরের ভেতরে জমে থাকা কাদা, নষ্ট আসবাবপত্র, ভেসে আসা আবর্জনা ও দুর্গন্ধ পরিষ্কার করতে ব্যস্ত হয়ে পড়েছেন দুর্গতরা। ক্ষতিগ্রস্ত ঘরবাড়ি মেরামতের কাজও শুরু হয়েছে বিভিন্ন এলাকায়।

বন্যার পানিতে খাদ্যসামগ্রী, কাপড়চোপড়, গুরুত্বপূর্ণ কাগজপত্র, আসবাবপত্রসহ গৃহস্থালির নানা জিনিস নষ্ট হয়েছে। অনেক এলাকায় এখনো বিশুদ্ধ পানির সংকট রয়েছে। পানিবাহিত রোগের আশঙ্কায় উদ্বেগ বাড়ছে স্থানীয়দের মধ্যে।
জেলা প্রশাসনের প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী, বান্দরবানে পাহাড়ধসে পাঁচজন এবং পানিতে ভেসে একজনসহ মোট ছয়জনের মৃত্যু হয়েছে। বিভিন্ন এলাকায় অবকাঠামো, কৃষিজমি ও বসতবাড়ির ক্ষয়ক্ষতির হিসাব সংগ্রহ চলছে।
বাংলাদেশ সেনাবাহিনী, বিজিবি, ফায়ার সার্ভিস ও বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন দুর্গত এলাকায় ত্রাণ বিতরণ, চিকিৎসাসেবা ও পুনর্বাসন কার্যক্রমে সহায়তা করছে।
রাঙামাটিতে ফুটে উঠছে ক্ষয়ক্ষতির চিত্র
রাঙামাটিতে গত ৪৮ ঘণ্টায় ভারী বৃষ্টিপাত না হওয়ায় বন্যা পরিস্থিতির উন্নতি হয়েছে। বাঘাইছড়ি, বিলাইছড়ির ফারুয়া বাজারসহ বিভিন্ন এলাকায় পানি নামতে শুরু করেছে। পানি কমার সঙ্গে সঙ্গে ক্ষয়ক্ষতির চিত্র স্পষ্ট হচ্ছে।
বাঘাইছড়ির বিভিন্ন এলাকা থেকে মানুষ বাড়িতে ফিরতে শুরু করলেও এখনো স্বাভাবিক হয়নি জীবনযাত্রা। খাদ্য, বিশুদ্ধ পানি, শিশুখাদ্য ও গোখাদ্যের সংকটে দিন কাটছে অনেক পরিবারের। পশ্চিম লাইল্যাঘোনা ইউনিয়নে এখনো দেড় শতাধিক পরিবার পানিবন্দী রয়েছে।

বাঘাইছড়ির সঙ্গে খাগড়াছড়ির সড়ক যোগাযোগ ব্যাহত থাকায় পণ্য পরিবহনেও সমস্যা দেখা দিয়েছে। এতে খাদ্য সংকটের আশঙ্কা করছেন স্থানীয়রা।
বিলাইছড়ির ফারুয়া ইউনিয়নে পানি নেমে যাওয়ার পর ক্ষয়ক্ষতির চিত্র সামনে এসেছে। অনেক ঘরবাড়ি সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়েছে। ফারুয়া বাজারে এখনো কাদার স্তূপ জমে আছে। স্থানীয়রা কাদা সরিয়ে স্বাভাবিক জীবনে ফেরার চেষ্টা করছেন।
বরকল উপজেলার ঠেগা, খুব্বাং চুমাচুমি, লংগদু ও রাজস্থলীসহ বিভিন্ন এলাকায় কয়েকশ পরিবার নতুন করে পানিবন্দী হয়েছে।
চট্টগ্রামে ছয় লাখের বেশি মানুষ পানিবন্দী
চট্টগ্রামের বন্যাকবলিত বিভিন্ন এলাকা থেকে পানি নামতে শুরু করলেও পরিস্থিতি পুরোপুরি স্বাভাবিক হয়নি। জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, এখনো ছয় লাখের বেশি মানুষ পানিবন্দী রয়েছে। জেলায় বন্যায় মৃতের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৩ জনে।
৫ জুলাই থেকে শুরু হওয়া টানা বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে সাতকানিয়া, লোহাগাড়া, চন্দনাইশ ও বাঁশখালীর বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হয়। সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে সাতকানিয়া ও বাঁশখালী।

বন্যার পানিতে কোথাও ঘরবাড়ি ধসে পড়েছে, কোথাও সড়ক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সবজি ক্ষেত, ফসলি জমি, মাছের প্রকল্প ও পোলট্রি খামারের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে।
সাঙ্গু ও ডলু নদীর পানি কমতে শুরু করলেও অনেক এলাকায় পানি ধীরে নামছে। সাতকানিয়া-বান্দরবান সড়ক থেকে পানি সরে যাওয়ায় যোগাযোগ ব্যবস্থা কিছুটা স্বাভাবিক হয়েছে। চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়কেও যান চলাচল স্বাভাবিক হয়েছে।
প্রশাসনের পাশাপাশি সেনাবাহিনী বিভিন্ন উপজেলায় উদ্ধার ও ত্রাণ কার্যক্রম পরিচালনা করছে।
কুড়িগ্রামে নদীভাঙন ও কৃষিতে বড় ক্ষতি
কুড়িগ্রামে বন্যার পানি কমতে শুরু করলেও দেখা দিয়েছে নতুন সংকট। একদিকে নদীভাঙনে বিলীন হচ্ছে বসতভিটা, অন্যদিকে পানিতে নষ্ট হয়েছে শত শত হেক্টর ফসলি জমি।
ধরলা, ব্রহ্মপুত্র, তিস্তা ও দুধকুমার নদে তীব্র ভাঙন দেখা দিয়েছে। নদীতীরবর্তী মানুষ বসতভিটা হারানোর শঙ্কায় দিন কাটাচ্ছেন।

পানি উন্নয়ন বোর্ড জানিয়েছে, জেলার ৪০টি ভাঙন পয়েন্টের মধ্যে ৩০টিতে জরুরি ভিত্তিতে জিওব্যাগ ফেলে ভাঙন রোধের চেষ্টা চলছে। তবে স্থায়ী প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা না থাকায় উদ্বেগ কাটছে না।
বন্যায় পটোল, মরিচ, বেগুন, আমনের বীজতলা, পাটসহ বিভিন্ন ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। কৃষি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, প্রায় ৫০০ হেক্টর জমির ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
পশ্চিম ও উত্তর-পূর্বাঞ্চলেও উদ্বেগ
হবিগঞ্জে প্রায় সাড়ে ছয় হাজার পরিবার পানিবন্দী রয়েছে। মৌলভীবাজারের সাত উপজেলার মধ্যে পাঁচটিতে বন্যা পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, যেখানে সাত হাজারের বেশি পরিবার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
সুনামগঞ্জে টানা বর্ষণ ও উজানের ঢলে নদ-নদী ও হাওরের পানি বেড়েছে। নেত্রকোনায় নদীর পানি বৃদ্ধিতে নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। যশোরের কেশবপুরেও দুই শতাধিক পরিবার পানিবন্দী হয়ে পড়েছে।
পানি নামার পর এখন বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে পুনর্বাসন। বন্যা পরিস্থিতি কিছুটা উন্নতি হলেও ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের সামনে এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ ঘরবাড়ি মেরামত, জীবিকা পুনরুদ্ধার এবং স্বাভাবিক জীবনে ফেরা।
প্রশাসন জানিয়েছে, ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় ত্রাণ বিতরণ, চিকিৎসাসেবা ও পুনর্বাসন কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে। তবে পানি পুরোপুরি নেমে গেলে ক্ষয়ক্ষতির প্রকৃত চিত্র আরও স্পষ্ট হবে।


