রাজধানীর মিরপুরের বনফুল আদিবাসী গ্রীনহার্ট কলেজে ট্রাস্ট পরিচালনা, আর্থিক ব্যবস্থাপনা ও প্রশাসনিক কার্যক্রম নিয়ে একাধিক অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগ রয়েছে, ট্রাস্ট আইন ও গভর্নিং বডির অনুমোদন উপেক্ষা করে কয়েকজন ট্রাস্টি দীর্ঘদিন ধরে মাসিক সম্মানি গ্রহণ করে আসছেন। এতে প্রতিষ্ঠানটির আর্থিক সংকট তৈরি হয়েছে এবং শিক্ষক-কর্মচারীদের বেতন পরিশোধেও নিয়মিত বিলম্ব হচ্ছে।

কলেজ-সংশ্লিষ্ট নথি ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য অনুযায়ী, ২০১৪ সাল থেকে কয়েকজন ট্রাস্টি বিভিন্ন পদবি ব্যবহার করে মাসিক অর্থ গ্রহণ করছেন। অভিযোগ রয়েছে, এক যুগে এভাবে ৪ কোটির বেশি টাকা নেওয়া হয়েছে। তবে এ অর্থ গ্রহণের প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে, কারণ ট্রাস্ট পরিচালনার নিয়ম অনুযায়ী ট্রাস্টিরা দায়িত্ব পালনের জন্য নিয়মিত বেতন বা সম্মানি নিতে পারেন না।

ট্রাস্ট আইনের ধারা-৩২ অনুযায়ী, ট্রাস্টি ট্রাস্ট পরিচালনার জন্য যৌক্তিক ও প্রকৃত খরচ, যেমন ভ্রমণ, নথিপত্র বা প্রশাসনিক ব্যয় গ্রহণ করতে পারেন। তবে তা কোনোভাবেই নিয়মিত সম্মানি বা বেতন হিসেবে গ্রহণযোগ্য নয়।

ট্রাস্টিদের সম্মানি নিয়ে অভিযোগ

অভিযোগ রয়েছে, ট্রাস্টের সাধারণ সম্পাদক প্রসেনজিৎ চাকমা, ধনমণি চাকমা, রিয়েল দেওয়ান ও কামনা দেওয়ানসহ কয়েকজন ট্রাস্টি দীর্ঘদিন ধরে মাসিক সম্মানি নিয়ে আসছেন।

গত এপ্রিলের একটি সম্মানি শিটে দেখা যায়, প্রসেনজিৎ চাকমা ৮০ হাজার টাকা, ধনমণি চাকমা ৬৫ হাজার টাকা, রিয়েল দেওয়ান ৬৫ হাজার টাকা এবং কামনা দেওয়ান ৫০ হাজার টাকা নিয়েছেন। আরেকজন ট্রাস্টিও ৬৫ হাজার টাকা সম্মানি নিয়েছেন বলে ওই নথিতে উল্লেখ রয়েছে।

সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, ট্রাস্টিরা নিয়মিত অর্থ গ্রহণ করলেও অনেক সময় প্রাপ্তি স্বীকারপত্র বা প্রয়োজনীয় কাগজপত্রে স্বাক্ষর করেন না। এ বিষয়ে বাধা দিলে শিক্ষক-কর্মকর্তাদের চাকরি হারানোর হুমকি দেওয়া হয় বলেও অভিযোগ রয়েছে।

গত ২৫ জুন প্রতিষ্ঠানটির পক্ষ থেকে ট্রাস্টিদের পাঠানো এক চিঠিতে বলা হয়, অনেকেই প্রাপ্তি স্বীকারপত্রে স্বাক্ষর না করে দীর্ঘদিন ধরে অর্থ গ্রহণ করছেন, যা বিধিসম্মত নয়। দ্রুত স্বাক্ষর না করলে পরবর্তী মাসে তাদের বিল করা হবে না বলেও চিঠিতে উল্লেখ করা হয়।

যেভাবে শুরু

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ২০১৪ সালে প্রধান ট্রাস্টি ও কলেজ গভর্নিং বডির সভাপতি ভদন্ত প্রজ্ঞানন্দ মহাথেরো ধর্মীয় সম্মেলনে কানাডা ও যুক্তরাষ্ট্রে গেলে ট্রাস্টের সাধারণ সম্পাদক প্রসেনজিৎ চাকমাকে সাময়িকভাবে দায়িত্ব দেওয়া হয়।

এই সুযোগে প্রসেনজিৎ চাকমা একটি বৈঠক ডাকেন। ওই বৈঠকে কয়েকজন ট্রাস্টির জন্য আলাদা আলাদা পদবি নির্ধারণ এবং সম্মানি চালুর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় বলে অভিযোগ রয়েছে।

সেই সময় ভদন্ত প্রজ্ঞানন্দ মহাথেরোকে প্রধান নির্বাহী, প্রসেনজিৎ চাকমাকে পরিচালক (অর্থ ও নিয়োগ), ধনমণি চাকমাকে বাজেট, কেনাকাটা ও ট্রাস্ট ব্যবস্থাপনা পরিচালক, রিয়েল দেওয়ানকে উন্নয়ন পরিচালক, প্রীতিময় চাকমাকে হোস্টেল ব্যবস্থাপক এবং কামনা দেওয়ানকে মহিলাবিষয়ক পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া হয় বলে জানা গেছে।

তবে অভিযোগ রয়েছে, ওই সিদ্ধান্তের কার্যবিবরণীতে প্রধান ট্রাস্টি ও গভর্নিং বডির সভাপতির স্বাক্ষর ছিল না। এরপরও দীর্ঘদিন ধরে কয়েকজন ট্রাস্টি ওই পদবি ব্যবহার করে অর্থ গ্রহণ করে আসছেন।

বিদেশে থেকেও সম্মানি নেওয়ার অভিযোগ

অভিযোগ রয়েছে, সাধারণ সম্পাদক প্রসেনজিৎ চাকমা প্রায় পাঁচ বছর জাপানে অবস্থান করেও নিয়মিত সম্মানি গ্রহণ করেছেন। বর্তমানে তিনি দেশে অবস্থান করছেন বলে জানা গেছে।

এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে যোগাযোগ করা হলে প্রসেনজিৎ চাকমা পরে কথা বলবেন বলে ফোন সংযোগ বিচ্ছিন্ন করেন।

ট্রাস্টি ধনমণি চাকমা বলেন, ‘আমরা এই প্রতিষ্ঠানের প্রতিষ্ঠাতা। কাজের বিনিময়ে সম্মানি নিচ্ছি। এটা বৈধ না অবৈধ, তা বলতে পারব না।’

রিয়েল দেওয়ানের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলে তাঁর স্ত্রী কামনা দেওয়ান ফোন ধরেন। তিনি এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।

সংশ্লিষ্টদের ভাষ্য, ধনমণি চাকমা অন্য একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিক্ষকতা করেন। রিয়েল দেওয়ান ও কামনা দেওয়ান স্বামী-স্ত্রী। তাদের নিয়মিত কলেজে উপস্থিতি না থাকলেও মাস শেষে সম্মানি গ্রহণ করেন বলে অভিযোগ রয়েছে। তবে প্রীতিময় চাকমা নিয়মিত হোস্টেল দেখাশোনা করেন বলে জানা গেছে।

রেক্টর ও প্রশাসন নিয়েও অভিযোগ

এদিকে ২০২৪ সালের নভেম্বরে রেক্টর হিসেবে যোগ দেওয়া তরুণ কান্তি বড়ুয়ার বিরুদ্ধেও একাধিক অভিযোগ উঠেছে।

অভিযোগের মধ্যে রয়েছে—অধ্যাপক পদবি ব্যবহারে অনিয়ম, নিয়মিত অনুপস্থিতি, আদিবাসী শিক্ষক ধীরেন মাহাতোসহ ১৫ জন কর্মচারীকে চাকরিচ্যুত করা এবং নারী শিক্ষকদের সঙ্গে অশোভন আচরণ।

এসব অভিযোগের বিষয়ে ২০২৫ সালের নভেম্বরে মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তর (মাউশি) থেকে তাকে তলব করা হয়েছিল বলে জানা গেছে।

এছাড়া কলেজটির পরিচালনা নিয়ে ভদন্ত প্রজ্ঞানন্দ মহাথেরো, অধ্যক্ষ ড. সঞ্জয় কুমার ধরসহ কয়েকজনের প্রভাব নিয়েও অভিযোগ রয়েছে।

শিক্ষক-কর্মচারীদের বেতন দিতে সংকট

দেড় হাজারের কম শিক্ষার্থীর এই প্রতিষ্ঠানটিতে বর্তমানে ৮৬ জন শিক্ষক এবং ২০ থেকে ২৫ জন কর্মচারী রয়েছেন।

সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, কলেজের আর্থিক সংকটের কারণে শিক্ষক-কর্মচারীদের বেতন দিতে হিমশিম খেতে হচ্ছে। অনেক সময় এক মাসের বেতন পরবর্তী মাসের শেষ দিকে দেওয়া হয়।

অভিযোগ রয়েছে, শিক্ষক-কর্মচারীদের মে মাসের বেতন জুনের ২৫ তারিখে দেওয়া হলেও ট্রাস্টিরা মাসের শুরুতেই তাদের সম্মানির অর্থ নিয়ে গেছেন।

শাক্যমুনি বৌদ্ধ বিহারের জায়গা নিয়ে বিতর্ক

এদিকে মিরপুরের শাক্যমুনি বৌদ্ধ বিহারের জায়গা ভাড়া নিয়ে কলেজ পরিচালনা নিয়েও আপত্তি উঠেছে।

অভিযোগ রয়েছে, তিন পার্বত্য জেলার পাহাড়ি বৌদ্ধদের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় উপাসনালয়ের জায়গায় শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনার কারণে বিহারের পরিবেশ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

এছাড়া বিহারে আসা এক বৌদ্ধ দায়ককে কলেজের নিরাপত্তাকর্মী চয়ন দেওয়ান হেনস্তা করেছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।

এসব অভিযোগের পর পাহাড়ি বৌদ্ধ সমাজের পক্ষ থেকে কলেজটি মিরপুর থেকে অন্যত্র সরিয়ে নেওয়ার দাবিতে ঢাকা শিক্ষা বোর্ডে গণস্বাক্ষর জমা দেওয়া হয়েছে বলে জানা গেছে।

প্রধান ট্রাস্টির বক্তব্য

কলেজের প্রধান ট্রাস্টি ও গভর্নিং বডির সভাপতি ভদন্ত প্রজ্ঞানন্দ মহাথেরো বলেন, তার অনুপস্থিতিতে প্রসেনজিৎ চাকমা ট্রাস্টিদের সম্মানি নির্ধারণ করে কলেজের তহবিল থেকে অর্থ গ্রহণ শুরু করেন। দেশে ফিরে তিনি ওই সিদ্ধান্তে স্বাক্ষর করেননি।

তিনি বলেন, ট্রাস্ট বিধি অনুযায়ী ট্রাস্টিরা মাসিক সম্মানি নিতে পারেন না। এই ব্যবস্থা বন্ধ করতে চেষ্টা করেও তিনি সফল হননি।

তার ভাষ্য, ‘ট্রাস্টিরা খুবই সংঘবদ্ধ। আমি নিজেই অনেকটা অসহায় অবস্থার মধ্যে আছি।’