মামুন মজুমদার

পার্বত্য চট্টগ্রাম, বাংলাদেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের এক কৌশলগত ভূখণ্ড, আবারও সীমান্ত রাজনীতির এক জটিল আবর্তে প্রবেশ করেছে। ঐতিহাসিক সংঘাত, শান্তিচুক্তি এবং জাতিগত মেরুকরণের দীর্ঘ ইতিহাসের পর এই অঞ্চল এখন এক নতুন ধরনের হুমকির সম্মুখীন। এই হুমকির কেন্দ্রে রয়েছে মিয়ানমারের বিদ্রোহী গোষ্ঠী আরাকান আর্মি (এএ) এবং তাদের সহযোগী সংগঠনগুলোর তৎপরতা। সাম্প্রতিক সময়ে খাগড়াছড়ির সহিংসতা থেকে শুরু করে বান্দরবানের গভীরে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন—প্রতিটি ঘটনাই এক গভীর ষড়যন্ত্রের ইঙ্গিত দিচ্ছে। আরাকান আর্মি এখন কেবল সামরিক উপস্থিতি নয়, বরং এক নতুন ধরনের ‘সামাজিক যুদ্ধ’ শুরু করেছে, যার লক্ষ্য বাংলাদেশের ভূখণ্ডে নিজেদের প্রভাব বিস্তার এবং কৌশলগত গভীরতা তৈরি করা। এটি বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব এবং অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তার জন্য এক অশনি সংকেত।

অতীতে আরাকান আর্মির কার্যক্রমের ধরন ছিল ভিন্ন। তারা পার্বত্য চট্টগ্রামের দুর্গম মদক অঞ্চলের মতো জায়গায় গোপনে সামরিক ঘাঁটি স্থাপন করে মিয়ানমারের সামরিক জান্তার বিরুদ্ধে সশস্ত্র তৎপরতা পরিচালনা করত। তাদের মূল উদ্দেশ্য ছিল বাংলাদেশের ভূমিকে একটি নিরাপদ আশ্রয় এবং আক্রমণ পরিচালনার লুক্কায়িত আস্তানা হিসেবে ব্যবহার করা। বাংলাদেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিজিবি) বিষয়টি জানতে পারার পর অভিযান চালিয়ে সেই ঘাঁটিগুলো ধ্বংস করে দেয় এবং আরাকান আর্মিকে সীমান্ত থেকে বিতাড়িত করে। সেই সময়কার হুমকি ছিল সুস্পষ্ট এবং সামরিক প্রকৃতির।

কিন্তু সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহ আরাকান আর্মির কৌশলগত পরিবর্তনের দিকে নির্দেশ করে। তারা এখন আর গোপন সামরিক ঘাঁটির ওপর নির্ভরশীল নয়, বরং স্থানীয় জনগোষ্ঠীর সঙ্গে মিশে যাওয়ার এক অভিনব ও বিপজ্জনক কৌশল গ্রহণ করেছে। বিশ্লেষকরা একে ‘সফট উপস্থিতি’ বলে আখ্যায়িত করছেন। এর সবচেয়ে বড় উদাহরণ হলো সাম্প্রতিক বান্দরবান সীমান্তে বাংলাদেশের প্রায় ১০ কিলোমিটার ভেতরে বৈশালী তথা জলকেলি উৎসবের আয়োজন। একটি সশস্ত্র বিদেশি বিদ্রোহী গোষ্ঠীর এমন আয়োজন শুধু অবৈধ অনুপ্রবেশই নয়, এটি ছিল নিজেদের সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা তৈরির একটি পরিকল্পিত প্রচেষ্টা। আরও উদ্বেগের বিষয় হলো, সেই অনুষ্ঠানে পার্বত্য চট্টগ্রামের জেলা পরিষদ সদস্য, স্থানীয় রাজনৈতিক নেতা এবং জনপ্রতিনিধিদের উপস্থিতি। এই ঘটনা প্রমাণ করে, আরাকান আর্মি স্থানীয় প্রভাবশালী মহলের সঙ্গে সম্পর্ক ঘনিষ্ঠ করতে সক্ষম হয়েছে, যা তাদের কার্যক্রমকে এক ধরনের বৈধতা দেওয়ার চেষ্টা। গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশের পর নিরাপত্তা বাহিনী দ্রুত পদক্ষেপ নিলেও এই ঘটনাটি তাদের পরিবর্তিত কৌশলের গভীরতাকেই স্পষ্ট করে তোলে।

 গত ১৫-১৬ এপ্রিল বাংলাদেশের প্রায় ১০ কিলোমিটার ভেতরে স্থানীয় উপজাতি নেতাদের সহযোগিতায় আরাকান আর্মির জলকেলি উদযাপন। ছবি- সংগৃহীত

আরাকান আর্মির এই ‘সামাজিক যুদ্ধ’ কেবল সাংস্কৃতিক আয়োজনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। এর একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো মনস্তাত্ত্বিক ও প্রচারণামূলক কার্যক্রম, যা পরিচালনা করছে তাদের সহযোগী সংগঠন আরাকান স্টুডেন্ট ইউনিয়ন (এএসইউ)। অতি সম্প্রতি খাগড়াছড়িতে এক মারমা কিশোরীর ধর্ষণের অভিযোগ এবং তৎপরবর্তী সহিংসতার ঘটনাকে কেন্দ্র করে আরাকান আর্মির এই ছাত্র সংগঠন একটি বিবৃতি প্রকাশ করে, যা বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে সরাসরি হস্তক্ষেপের শামিল।

আরাকান আর্মির সহযোগী সংগঠন আরাকান স্টুডেন্ট ইউনিয়নের বিবৃতি। ছবি- ফেসবুক থেকে সম্পাদিত

বিবৃতিতে তারা বাংলাদেশ প্রশাসন এবং নিরাপত্তা বাহিনীর বিরুদ্ধে উপজাতিদের প্রতি বৈষম্য ও নিপীড়নের অভিযোগ তোলে। নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, এটি একটি সুচিন্তিত পদক্ষেপ। এর মাধ্যমে আরাকান আর্মি দুটি লক্ষ্য অর্জন করতে চাইছে। প্রথমত, পার্বত্য চট্টগ্রামে বসবাসকারী সমমনা জাতিগোষ্ঠীর মনে বাংলাদেশ রাষ্ট্র সম্পর্কে অবিশ্বাস ও ক্ষোভ তৈরি করা। দ্বিতীয়ত, নিজেদেরকে ওই অঞ্চলের নিপীড়িত জনগোষ্ঠীর সহমর্মী হিসেবে উপস্থাপন করে একটি সহানুভূতি ও সমর্থনের ভিত্তি তৈরি করা। এটি এক ধরনের মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধ, যার মাধ্যমে তারা জাতীয় পরিচয় এবং রাষ্ট্রীয় আনুগত্যের ধারণাকে দুর্বল করে দিয়ে একটি আন্তঃসীমান্ত জাতিগত পরিচয়ের রাজনীতিকে উস্কে দিতে চাইছে। এই ধরনের প্রচারণা পার্বত্য শান্তি চুক্তির বাস্তবায়নের পথে থাকা চ্যালেঞ্জগুলোকে আরও জটিল করে তুলতে পারে এবং জাতিগত বিভেদকে নতুন করে সামনে আনতে পারে।

আরাকান আর্মির এই ক্রমবর্ধমান তৎপরতার পেছনে সীমান্তের উভয় পাশের কিছু গোষ্ঠীর মধ্যে গড়ে ওঠা এক জটিল নেটওয়ার্ক কাজ করছে। ঐতিহাসিকভাবেই মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যের রাজনীতির সঙ্গে বাংলাদেশের রাখাইন জনগোষ্ঠীর একটি সামাজিক ও সাংস্কৃতিক যোগাযোগ ছিল। আরাকান আর্মি এই যোগাযোগকে ব্যবহার করে নিজেদের প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করছে। পার্বত্য অঞ্চলের কিছু প্রভাবশালী ব্যক্তি, ব্যবসায়ী এবং স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠীর সঙ্গে তাদের সম্পর্ক স্থাপনের অভিযোগও উপেক্ষা করার মতো নয়।

এই সংযোগের ফলে বেশ কিছু নিরাপত্তা ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে:
 ১. তথ্য পাচার: স্থানীয় সহযোগীরা আরাকান আর্মিকে নিরাপত্তা বাহিনীর চলাচল এবং পরিকল্পনা সম্পর্কে তথ্য সরবরাহ করতে পারে, যা সীমান্ত ব্যবস্থাপনাকে দুর্বল করে দেবে।
 ২. রসদ ও আশ্রয়: এই নেটওয়ার্ক ব্যবহার করে আরাকান আর্মি খাদ্য এবং চিকিৎসা রসদ সংগ্রহ করতে পারে। পাশাপাশি, আহত সদস্যদের জন্য নিরাপদ আশ্রয়ের ব্যবস্থাও হতে পারে।
 ৩. অবৈধ বাণিজ্য: সীমান্ত অঞ্চলে মাদক, বিশেষ করে ইয়াবা এবং ক্রিস্টাল মেথ (আইস) চোরাচালানের সঙ্গে আরাকান আর্মির সংযোগ সর্বজনবিদিত। স্থানীয় নেটওয়ার্ক ব্যবহার করে তারা এই অবৈধ বাণিজ্যকে আরও বিস্তৃত করতে পারে, যা বাংলাদেশের মানুষ ও সামাজিক স্থিতিশীলতার জন্য মারাত্মক হুমকি।
 ৪. জাতিগত উত্তেজনা: আরাকান আর্মির কার্যক্রম পার্বত্য চট্টগ্রামে বসবাসকারী বাঙালি এবং অন্যান্য ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর মধ্যে বিদ্যমান অবিশ্বাস ও উত্তেজনাকে আরও বাড়িয়ে তুলতে পারে। বহিরাগত শক্তির হস্তক্ষেপ এই অঞ্চলের শান্তি ও স্থিতিশীলতাকে ভঙ্গুর করে তুলতে পারে।

পার্বত্য চট্টগ্রাম বাংলাদেশের জন্য কেবল একটি ভূখণ্ড নয়; এটি দেশের অভ্যন্তরীণ শান্তি, স্থিতিশীলতা এবং জাতীয় সংহতির এক প্রতীক। ১৯৭২ সাল থেকে শুরু হওয়া সংঘাতের পর ১৯৯৭ সালে স্বাক্ষরিত শান্তিচুক্তি এই অঞ্চলে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনার একটি ঐতিহাসিক পদক্ষেপ ছিল। কিন্তু আরাকান আর্মির মতো বহিরাগত শক্তির উত্থান সেই শান্তি প্রক্রিয়াকে আবারও ঝুঁকির মুখে ফেলছে।

এই পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের জন্য চ্যালেঞ্জগুলো বহুমাত্রিক এবং এর মোকাবিলায় একটি সমন্বিত কৌশল গ্রহণ করা অপরিহার্য।

আরাকান আর্মির অনুষ্ঠানে স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের উপস্থিতি একটি বিপজ্জনক সংকেত। 

আরাকান আর্মির অনুষ্ঠানে স্থানীয় জনপ্রতিনিধিসহ প্রভাবশালীরা। ছবি- সম্পাদিত

কেন এবং কোন কারণে তারা সেখানে উপস্থিত হয়েছিলেন, তা পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে তদন্ত করা প্রয়োজন। রাষ্ট্রীয় পদে থেকে কোনো বিদেশি সশস্ত্র গোষ্ঠীর সঙ্গে সম্পর্ক রাখাকে রাষ্ট্রদ্রোহ হিসেবে গণ্য করে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করা দরকার ।

আরাকান আর্মির সাম্প্রতিক তৎপরতা প্রমাণ করে যে, পার্বত্য চট্টগ্রামের নিরাপত্তা সমীকরণ দ্রুত বদলে যাচ্ছে। এটি এখন আর কেবল অভ্যন্তরীণ শান্তি-শৃঙ্খলা বা বিচ্ছিন্নতাবাদের বিষয় নয়; এটি একটি জটিল ভূ-রাজনৈতিক এবং আন্তঃসীমান্ত নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জে পরিণত হয়েছে। সামরিক শক্তি প্রয়োগের পাশাপাশি মনস্তাত্ত্বিক ও সামাজিক প্রভাব বিস্তারের যে নতুন কৌশল আরাকান আর্মি নিয়েছে, তা মোকাবিলা করা অনেক বেশি কঠিন। বাংলাদেশের নিরাপত্তা, সার্বভৌমত্ব এবং বহু কষ্টে অর্জিত পার্বত্য চট্টগ্রামের শান্তি টিকিয়ে রাখার জন্য একটি দূরদর্শী, সমন্বিত এবং কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ এখন অপরিহার্য। অন্যথায়, এই অঞ্চলের ভবিষ্যৎ আবারও অন্ধকার এক আবর্তে নিক্ষিপ্ত হতে পারে।
 

লেখক: দক্ষিণ এশীয় ভূরাজনীতি ও নিরাপত্তা বিষয়ক বিশ্লেষক