৮০ বচ্ছরের মিজো নেতা জোরামথাঙ্গা হলেন দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম বয়োজ্যেষ্ঠ গেরিলা নেতা। ৩ মেয়াদে মিজোরামের মুখ্যমন্ত্রী ছিলেন তিনি। বাংলাদেশে বম সম্প্রদায়ের নাম করে নাথান বমের কুকি-চিন ন্যাশনাল ফ্রন্ট (কেএনএফ) বাংলাদেশে সশস্ত্র আন্দোলনের ঘোষণা দিতে জোরামথাঙ্গার নাম প্রাসঙ্গিক হয়ে ওঠে। সম্প্রতি বাংলাদেশের সংবাদমাধ্যম প্রথম আলো কর্তৃপক্ষ তাদের ডিজিটাল ভার্সনে তার একটি সাক্ষাৎকার প্রকাশ করেন। সাক্ষাৎকারে তিনি তার গেরিলা জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ তুলে ধরার সাথে সাথে বাংলাদেশে বমদের আন্দোলন, রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে মন্তব্য করেন।
২১ জুন (শুক্রবার) প্রকাশিত ওই সাক্ষাৎকারে নিজের জীবনী নিয়ে বই প্রকাশ হচ্ছে জানিয়ে জোরামথাঙ্গা বলেন, এই বই একজন চমকপ্রদ গেরিলার জীবন—যে ২০ বছর জঙ্গলে ছিল, পরে তিনবার মুখ্যমন্ত্রীও হয়েছে। মাও সে–তুং, চৌ এনলাই থেকে শেখ মুজিবুর রহমান ও জুলফিকার আলী ভুট্টো পর্যন্ত অনেক রাজনীতিবিদের সঙ্গে দেখা হয়েছে এই গেরিলাজীবনে। কাহিনিতে এমন অনেক ঘটনা আছে, যা মুভি হওয়ার মতো। কিউবার গেরিলা নেতাদের চেয়ে কম নয় সেসব কাহিনি। মুভি তৈরির পর আমি বই আকারে এটা প্রকাশ করব।
মিজো ন্যাশনাল ফ্রন্ট বা এমএনএফ এর কার্যক্রম নিয়ে তিনি বলেন, এমএনএফ ১৯৬১ থেকে কাজ শুরু করে। ১৯৫৫ সালের দিকে আমরা একটা সাংস্কৃতিক সমিতি আকারে কাজ করতাম। ১৯৬১ সাল থেকে রাজনৈতিক দল আকারে কাজ শুরু করি। 
তিনি বলেন, ব্রিটিশ শাসনামলে আমরা ‘ইন্ডিয়া’র অন্তর্ভুক্ত ছিলাম না। এই এলাকাকে বলা হতো ‘এক্সক্লুডেট এরিয়া’। এটা শাসন করা হতো আসাম থেকে। ১৯৪৬ সাল পর্যন্ত এখানে রাজনৈতিক দলের গঠনও অনুমোদিত ছিল না।
তার দাবি, ব্রিটিশরা যাওয়ার সময় মিজোদের সামনে প্রশ্ন উঠল, আমরা কোন দিকে যাব। একদল বলল, আমরা তো পূর্ব পাকিস্তান–লাগোয়া, তাহলে আমরা এদিকেই থাকি। আরেক দল বলল, ভারতের সঙ্গে থাকা দরকার। কেউ কেউ বার্মার সঙ্গে যেতে চাইল। কেউ আবার ব্রিটিশদের একটা রাজকীয় কলোনি আকারে থেকে যেতে চাইল। কেউ কেউ স্বাধীনও হতে চাইল। এ সময় রাজনৈতিক ঐকমত্যের একটা শূন্যতা ছিল। রাজনৈতিক শূন্যতাও ছিল। সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়ায় শরিক না হয়েও আমরা ভারতভুক্ত হয়ে গেলাম শেষ পর্যন্ত। আমাদের ওপর ভারতীয় সংবিধান আরোপিত হলো।
কুকিদের নিয়ে এই গেরিলা নেতা বলেন, ‘কুকি’ শব্দটা ব্রিটিশরা ব্যবহার করত। এখন কুকি বললে প্রধানত মণিপুরের কুকিদের কথা আসে। মিজোরাও একই জাতি। আগে বলা হতো লুসাই। চিন প্রদেশে একই মানুষদের বলা হচ্ছে চিন। বাংলাদেশেও এরা আছে। সবাই এরা ভাইবোন। ব্রিটিশরা আমাদের বিভিন্ন জায়গায় ভাগ করে গেল। সব কুকি-মিজো-চিন-বমদেরই ইচ্ছা তারা একত্র হোক। কিন্তু আমরা তো এখন অনেকগুলো রাষ্ট্রের ভেতর পড়ে গেছি। চাইলেই তো একত্র হওয়া যাবে না।
রোহিঙ্গাদের নিয়ে তার পর্যবেক্ষণে জোরামথাঙ্গা বলেন, এত দিন রোহিঙ্গা সমস্যার সমাধান নেপিডো সরকারের ওপর নির্ভর করছিল। আরাকান ছিল ইউনিয়নের একটা প্রদেশমাত্র। এখন পরিস্থিতি ভিন্ন। আরাকান আর্মি  শক্তিশালী একটি গেরিলা দল। তারা প্রদেশের বিরাট এলাকা নিয়ন্ত্রণ করছে। তারা এখন ইউনিয়নে থাকতে চাইবে কি না বলা মুশকিল। নতুন পরিস্থিতিতে তারা আরাকানকে স্বাধীন দেখতে চাইবে কি না, সেটাও বলা মুশকিল। সুতরাং রোহিঙ্গা সমস্যার সমাধান নির্ভর করছে আরাকান আর্মি ও মিয়ানমার সরকারের যুদ্ধের ফলাফলের ওপর। মিয়ানমারের গৃহযুদ্ধের একটা ফয়সালা ছাড়া আরাকানের রোহিঙ্গাদের সমস্যা আলাদাভাবে সমাধানযোগ্য নয়।
রাখাইন ও রোহিঙ্গাদের মধ্যে পারস্পরিক অবিশ্বাস নিয়ে মিজোরামের সাবেক এ মুখ্যমন্ত্রী বলেন, একসময় এই দুই গোষ্ঠী শান্তিপূর্ণভাবেই থাকত। আমরা যখন আরাকান জঙ্গলে থাকতাম, রোহিঙ্গারা আমাদের বন্ধু ছিল। সেই বন্ধুরা আমাদের কাছে নিজেদের পরিচয় দিত কমিউনিস্ট পার্টি অব বার্মার কর্মী হিসেবে। বহু বছর আমরা তাদের অতিথি ছিলাম। ১৯৭১ সালে তারাই আমাদের সাহায্য করেছিল আরাকান হয়ে করাচি পৌঁছাতে। পরে রাখাইন, রোহিঙ্গা ও বামাররা পরস্পরকে বহিরাগত বলে পারস্পরিক দূরত্ব তৈরি করতে শুরু করে। এরও সমাধান আছে। কিন্তু মিয়ানমারের মূল রাজনৈতিক সমস্যার সমাধান ছাড়া এর বাস্তবায়ন সম্ভব নয়।
তিনি মিয়ানমারের সমস্যা সমাধানে চীনের চেয়ে ভারতের ভূমিকা বেশি কার্যকর হবে বলে মনে করেন। যদিও এ গেরিলা যোদ্ধা স্বিকার করেছেন মিয়ানমারের জন্য চীনই বেশি গুরুত্বপূর্ণ দেশ।
কেএনএফ প্রসঙ্গ তুলতে তিনি বলেন, বান্দরবান থেকে আমাদের এদিকে শরণার্থী আসছে। চিন ও মণিপুর থেকেও আমাদের শরণার্থী গ্রহণ করতে হয়েছে। চারদিকের এসব সমস্যায় আমরা জড়িয়ে যাচ্ছি। বমরা তো হাজার দশেক মানুষ বা তার চেয়ে কম হবে। তাদের মধ্যে কিছু তরুণ অস্ত্র হাতে নিয়েছে। পার্বত্য চট্টগ্রামে অনেক পুরোনো সমস্যা আছে। আমার বিবেচনায় এত অল্পসংখ্যক মানুষের বম সমাজের ভেতর থেকে সেখানে নতুন করে কোনো সশস্ত্র আন্দোলন হওয়া ঠিক হবে না।
তিনি বলেন, এই যুদ্ধ থেকে ভালো কোনো ফল বয়ে আসবে বলে মনে হয় না। তাদের এই কাজের জন্য বম এলাকায় অনেক সমস্যা হচ্ছে। অনেকে গ্রামে থাকতে পারছে না। আমি এসব কেএনএফের ছেলেদের বলেছি। ওখানে শান্তি প্রতিষ্ঠায় নিশ্চয়ই আরও কিছু করব। অন্তত চেষ্টা করে দেখব কেএনএফের ছেলেদের বোঝাতে পারি কি না।
১৯৬৯–৭০ সালে বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে ধানমন্ডিতে দেখা হওয়ার ছলের কয়েকটি বৈঠকও হয়েছিল বলে তিনি দাবি করেন। এছাড়া বাংলাদেশের মেননের সাথে ওই সময়ে যোগাযোগ ছিল বলে ওই সাক্ষাতকারে উল্লেখ করেন। বাংলাদেশের আমের ভূয়সী প্রশংসা করে এই গেরিলা নেতা।