পাহাড়, বঙ্গোপসাগর, নদী-খাল আর হ্রদেঘেরা দেশের বাণিজ্যিক রাজধানী বন্দরনগরী চট্টগ্রাম। চট্টগ্রামকে প্রাচ্যের রানীও বলা হয়। প্রাচীনকাল থেকেই অনেকগুলো খাল ও ছরা এই নগরীতে জালের মতো ছড়িয়ে আছে। প্রতিটি খাল ছরা চট্টগ্রামের শিরা-উপশিরা। কিন্তু নগরীর কোনো একটি খালও এখন আর ভালো নেই। দখল, ভরাট ও দূষণে খালের প্রাণ ওষ্ঠাগত। স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে চট্টগ্রামে শতাধিক নদী ও খাল থাকলেও বর্তমানে তা কমে এসে দাঁড়িয়েছে ৩০ টির মতো।

চট্টগ্রাম নগরের জলাবদ্ধতা নিরসনে বিভিন্ন স্থানে চলছে এ–সংক্রান্ত প্রকল্পের কাজ। বেশ কিছু স্থানে খালের ওপর অবৈধভাবে তৈরি করা স্থাপনা ভেঙে ফেলা হয়েছে। তবে কোথাও কোথাও এখনো রয়ে গেছে বেশ কিছু অবৈধ স্থাপনা। আবার কোনো কোনো খালে জমে আছে পলি। ময়লা, আবর্জনা আর পলিথিন জমে শক্ত হয়ে গেছে খালের মাটি। এতে অনায়াসে খাল দিয়ে হেঁটে পারাপার হতে পারে লোকজন। তাই বর্ষার আগে এই খালগুলো সংস্কার ও রক্ষা করা না হলে প্রতিবছরের মতো এ বছরও বর্ষার সময় জলাবদ্ধতার কারণে ভোগান্তিতে পড়তে হবে লোকজনকে।

দীর্ঘ ৮০ বছরের মধ্যে গত বছর চট্টগ্রামে বন্যা পরিস্থিতি দেখা দিয়েছে যা স্মরণকালের কেউ চাক্ষুষ করেনি। ভারি বৃষ্টি ও নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে সৃষ্ট বন্যায় চট্টগ্রামে প্রাথমিকভাবে ১৩৫ কোটি ১৫ লাখ টাকার ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। নগরের পাঁচলাইশ, ডবলমুরিং ও পতেঙ্গা এলাকা এবং জেলার ১৪ উপজেলায় ৫ হাজার ৬৭ হেক্টর জমিতে আবাদ হওয়া শরৎকালীন সবজিসহ চট্টগ্রামে বন্যার পানির নিচে তলিয়ে গেছে প্রায় ২৭ হাজার হেক্টর জমির ফসল। সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয়েছে সবজি ক্ষেতের। বৈরি আবহাওয়া ও পানির নিচে তলিয়ে গিয়ে সবজির শতভাগ ক্ষতি হয়েছে। বন্যার পানিতে ডুবে চট্টগ্রামে ১৫ জনের মৃত্যু হয়েছে। ধসে পড়েছে শত শত ঘরবাড়ি।

অন্যদিকে, চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডে শিল্প কারখানার বিষাক্ত কেমিক্যাল ছড়িয়ে পড়ে কুমিরা খালের পানি মারাত্মকভাবে দূষিত হয়ে পড়েছে। এতে একদিকে ওই খালের ওপর নির্ভর কৃষির চরম সর্বনাশ হচ্ছে আর অন্যদিকে পানি ও পরিবেশ দূষণের কারণে রোগ বালাই ছড়িয়ে পড়ে অসুস্থ হয়ে পড়ছেন গ্রামবাসী। সীতাকুণ্ডের বড় কুমিরায় পাহাড় থেকে সৃষ্ট প্রায় ৩ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যের খালটি বঙ্গোপসাগরে গিয়ে পড়েছে। এই খালের দুই পাশে রয়েছে কয়েকটি গ্রাম এবং হাজার হাজার একর কৃষিজমি। দীর্ঘদিন ধরে এলাকার কৃষকরা এই খালের পানি ব্যবহার করে সবজি উৎপাদন করছেন। অন্যদিকে খালের উভয় পাশের বাসিন্দারাও খালের পানি ব্যবহার করছেন গৃহস্থালির নানান কাজে। কিন্তু খালের পাশে বিগত তিন দশকে একাধিক শিল্প কারখানা স্থাপিত হওয়ায় খালটিতে কারখানার বিষাক্ত কেমিক্যাল ও বর্জ্য ফেলা হচ্ছে প্রায়ই। ফলে এর পানি ক্রমশ ভয়াবহ দূষিত হয়ে পড়েছে। বড় কুমিরা এলাকায় মহাসড়কের পাশে গিয়ে দেখা যায়, খালটির পুরো পানি এখন গাঢ় হলদে-লাল বর্ণ ধারণ করেছে। খালের পাড়ে দাঁড়ালেই ঝাঁজালো দুর্গন্ধ নাকে আসায় নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে আসতে চায়।

বিজ্ঞানীদের গবেষণা অনুযায়ী জলবায়ু পরিবর্তনের নেতিবাচক প্রভাবে আগামী ২০৫০ সালের মধ্যে বাংলাদেশের এক-তৃতীয়াংশ জেলা পানির নিচে তলিয়ে যাবে যার নিদর্শন চট্টগ্রামের এই বন্যা পরিস্থিতি। এ অবস্থা থেকে উত্তরণের জন্য অতি দ্রুত সমুদ্রের গভীরতা বৃদ্ধিতে কাজ করতে হবে। পাশাপাশি শহরের মধ্যে যে সকল খাল দখল হয়েছে তা পুনরুদ্ধারে সর্বাত্মক প্রচেষ্টা চালাতে হবে। কিন্তু নদী ও খাল পুনরুদ্ধারে প্রশাসনের উদাসীনতা রয়েছে। অবৈধ দখলকারীরা প্রশাসনকে বৃদ্ধাঙুলি দেখিয়ে তাদের দখল বাণিজ্য চালিয়ে যাচ্ছে।


রাশেদুল ইসলাম ইমন 
-পার্বত্য সময়