মিয়ানমার থেকে জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত হয়ে কক্সবাজারের বিভিন্ন ক্যাম্পে অবস্থানরত প্রায় ১২ লাখ রোহিঙ্গার তথ্য ও ডেটাবেজ বাংলাদেশ সরকারের একটি নতুন সার্ভারে সংরক্ষিত হতে যাচ্ছে। বাংলাদেশ কম্পিউটার কাউন্সিল (বিসিসি) ইতোমধ্যে সার্ভার তৈরির কাজ সম্পন্ন করেছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।

সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ শেষে সার্ভারটি শিগগিরই স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কাছে হস্তান্তর করা হবে। এরপর জাতিসংঘ শরণার্থীবিষয়ক সংস্থা (ইউএনএইচসিআর) ধাপে ধাপে রোহিঙ্গাদের বায়োমেট্রিক ও নিবন্ধনভিত্তিক তথ্য বাংলাদেশি সার্ভারে স্থানান্তর শুরু করবে।

এতদিন রোহিঙ্গা ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার (আরআরআরসি) অফিস কেবল ‘রিড অনলি’ বা দেখা-সংক্রান্ত সীমিত প্রবেশাধিকার পেত। নতুন ব্যবস্থায় বাংলাদেশ সরকার সরাসরি ডেটাবেজ সংরক্ষণ ও ব্যবস্থাপনার সুযোগ পাবে।

সরকার দীর্ঘদিন ধরেই রোহিঙ্গাদের পূর্ণাঙ্গ তথ্যভান্ডার নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রাখার দাবি জানিয়ে আসছিল। সর্বশেষ বিভিন্ন পর্যায়ের বৈঠকের পর এ উদ্যোগে অগ্রগতি এসেছে বলে জানা গেছে। তবে ইউএনএইচসিআরের পক্ষ থেকে ব্যক্তিগত তথ্য সুরক্ষা এবং ডেটা নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ থাকলেও বাংলাদেশ বলছে, দেশের ভূখণ্ডে অবস্থানরত জনগোষ্ঠীর তথ্য সংরক্ষণ রাষ্ট্রের ন্যায্য অধিকার।

বর্তমানে ক্যাম্পে অবস্থানরত সব রোহিঙ্গা নিবন্ধিত এবং বায়োমেট্রিক (আঙুলের ছাপ ও চোখের স্ক্যান) তথ্যভিত্তিক ডেটাবেজে অন্তর্ভুক্ত। তবে এতদিন সেই পূর্ণাঙ্গ তথ্য সরকারের সরাসরি নিয়ন্ত্রণে ছিল না।

ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার মোহাম্মদ মিজানুর রহমান বলেন, নতুন সার্ভার কার্যকর হলে রোহিঙ্গাদের ডেটা ব্যবস্থাপনা আরও নিয়ন্ত্রিত হবে এবং নিরাপত্তা জোরদার হবে। একই সঙ্গে বৈধ সিমকার্ড বিতরণ ও অবৈধ সিম ব্যবহারের বিষয়েও ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব হবে।

তিনি আরও জানান, ইতোমধ্যে কয়েক হাজার রোহিঙ্গাকে পাইলট প্রকল্পের আওতায় সিমকার্ড দেওয়া হয়েছে। ভবিষ্যতে ১৮ বছরের বেশি বয়সীদের বৈধ সিম দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।

এদিকে, জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) ও পাসপোর্ট জালিয়াতি ঠেকাতে নতুন প্রযুক্তিগত উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে। এনআইডি কর্তৃপক্ষ ও আরআরআরসি’র মধ্যে অ্যাপ্লিকেশন প্রোগ্রামিং ইন্টারফেস (এপিআই) সংযোগ স্থাপনের মাধ্যমে ফিঙ্গারপ্রিন্ট যাচাই ব্যবস্থা চালুর পরিকল্পনা চলছে। এতে রোহিঙ্গাদের পরিচয় গোপন করে এনআইডি বা পাসপোর্ট গ্রহণের সুযোগ সীমিত হবে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।

অভিযোগ রয়েছে, অতীতে কিছু রোহিঙ্গা ভুয়া পরিচয়ে বাংলাদেশের পাসপোর্ট গ্রহণ করেছে এবং বিদেশে পাড়ি জমিয়েছে। সম্প্রতি একটি আইনশৃঙ্খলা সংস্থার কাছে এমন ১৭১ জনের একটি তালিকাও পাওয়া গেছে বলে জানা গেছে।

বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (বিটিআরসি) এবং মোবাইল অপারেটরগুলো রোহিঙ্গাদের জন্য নিবন্ধিত সিম বিতরণ কার্যক্রম শুরু করবে বলে জানা গেছে। নতুন ব্যবস্থায় ইউএনএইচসিআর প্রদত্ত রেজিস্ট্রেশন নম্বরের ভিত্তিতে সিম প্রদান করা হবে।

অন্যদিকে, অবৈধ সিম ব্যবহারের কারণে ক্যাম্পগুলোতে মাদক চোরাচালান, অর্থপাচার ও অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড বাড়ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। নতুন ডেটাবেজ ব্যবস্থা চালু হলে এসব নিয়ন্ত্রণ করা সহজ হবে বলে আশা করা হচ্ছে।

বাংলাদেশ কম্পিউটার কাউন্সিলের নির্বাহী পরিচালক এ টি এম জিয়াউল ইসলাম বলেন, ‘সার্ভারটি নিরাপদভাবে তৈরি করা হয়েছে। ডেটা হস্তান্তরের পর রোহিঙ্গা তথ্য ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা ও নিয়ন্ত্রণ আরও শক্তিশালী হবে।’

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, নতুন এই উদ্যোগ রোহিঙ্গা ব্যবস্থাপনা, নিরাপত্তা এবং ডিজিটাল পরিচয় নিয়ন্ত্রণে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।