২৫ বছরের অপেক্ষার অবসান। ২০০১ সালে মাইকেল ওয়েনের পর প্রথম ইংলিশ ফুটবলার হিসেবে ব্যালন ডি’অর জিতলেন হ্যারি কেইন। ক্যারিয়ারে প্রথমবারের মতো ফুটবলের ব্যক্তিগত সর্বোচ্চ সম্মানটি জিতে ইতিহাস গড়লেন বায়ার্ন মিউনিখের এই স্ট্রাইকার। মেয়েদের বিভাগে তৃতীয়বারের মতো ব্যালন ডি’অর জিতেছেন স্পেনের অ্যালেক্সিয়া পুতেয়াস। তরুণদের পুরস্কার থেকে শুরু করে কোচ ও গোলকিপার—বিভিন্ন বিভাগে স্প্যানিশদের আধিপত্যও ছিল চোখে পড়ার মতো।

কেইনের হাতে ব্যালন ডি’অর, ২৫ বছর পর ইংল্যান্ডের উৎসব
বর্ষসেরা ফুটবলারের নাম ঘোষণার জন্য মঞ্চে ডাকা হয় ব্রাজিলিয়ান কিংবদন্তি রোনালদো নাজারিওকে। তাঁর হাত থেকেই ব্যালন ডি’অর ট্রফি গ্রহণ করেন কেইন। বিজয়ীর নাম ঘোষণার পর লন্ডনের অনুষ্ঠানস্থল ফেটে পড়ে উল্লাসে।

স্ট্যানলি ম্যাথুস, ববি চার্লটন, কেভিন কিগান ও মাইকেল ওয়েনের পর পঞ্চম ইংলিশ ফুটবলার হিসেবে ব্যালন ডি’অর জিতলেন কেইন। পাশাপাশি ১৯৮১ সালে কার্ল-হাইঞ্জ রুমেনিগের পর বায়ার্ন মিউনিখের প্রথম ফুটবলার হিসেবে এই পুরস্কার জিতলেন তিনি।

গত মৌসুমে ক্লাব ও জাতীয় দলের হয়ে ৬৫ ম্যাচে ৭৩ গোল করেছেন কেইন। এর মধ্যে বায়ার্নের জার্সিতে ৫১ ম্যাচে তাঁর গোল ৬১টি। এক মৌসুমে বায়ার্নের হয়ে এত গোল করতে পারেননি আর কোনো খেলোয়াড়। তাঁর দুর্দান্ত পারফরম্যান্সে বায়ার্ন যেমন ইউরোপীয় প্রতিযোগিতায় সাফল্যের পথে এগিয়েছে, তেমনি ইংল্যান্ডের হয়েও গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছেন এই স্ট্রাইকার।

ব্যালন ডি’অরের লড়াইয়ে কেইনের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন লামিনে ইয়ামাল ও কিলিয়ান এমবাপ্পে। তাঁদের পেছনে ফেলে শেষ পর্যন্ত ব্যক্তিগত শ্রেষ্ঠত্বের মুকুট জিতেছেন ৩৩ বছর বয়সী এই ইংলিশ তারকা।

পুরস্কার গ্রহণের পর আবেগাপ্লুত কেইন বলেন, ‘আমি প্রায় ভাষাহীন। লন্ডনে এটা হওয়ায় আরও বিশেষ হয়ে উঠেছে। আমাকে যাঁরা ভোট দিয়েছেন, তাঁদের সবাইকে ধন্যবাদ। জানি, এ বছরটা অনেক কঠিন ছিল। এই কক্ষে বিশ্বমানের সব খেলোয়াড় রয়েছেন। তাঁদের এবং বিজয়ী ও মনোনয়ন পাওয়া সবাইকে অভিনন্দন।’

মেয়েদের ব্যালন ডি’অর পুতেয়াসের, তৃতীয়বারের কীর্তি
মেয়েদের বিভাগে বর্ষসেরার পুরস্কার জিতেছেন স্পেন ও বার্সেলোনার সাবেক মিডফিল্ডার অ্যালেক্সিয়া পুতেয়াস। ২০২১ ও ২০২২ সালের পর এবার তৃতীয়বারের মতো ব্যালন ডি’অর জিতলেন তিনি।

পুরস্কারটি ঘোষণা করেন ২০০১ সালের ব্যালন ডি’অরজয়ী মাইকেল ওয়েন। পুতেয়াসের নাম ঘোষণার পর অনুষ্ঠানস্থলে উচ্ছ্বাস ছড়িয়ে পড়ে।

গত মৌসুমে বার্সেলোনার হয়ে লিগ ও চ্যাম্পিয়নস লিগের শিরোপা জিতেছেন পুতেয়াস। ক্লাবের হয়ে ৫৩ ম্যাচে ২৬ গোল করার পাশাপাশি সতীর্থদের দিয়ে করিয়েছেন ১৫ গোল। স্পেনের হয়েও জিতেছেন নেশনস লিগ।

তিনটি ব্যালন ডি’অর জিতে আইতানা বোনমাতির সমান কীর্তিতে ভাগ বসিয়েছেন পুতেয়াস। গত জুলাইয়ে লন্ডন সিটি লায়নেসে যোগ দেওয়া এই স্প্যানিশ তারকা ক্লাবটির হয়েও গড়েছেন নতুন ইতিহাস।

বার্সেলোনার উত্তরে ছোট্ট মোলেত দেল ভালেসের রাস্তায় ফুটবল খেলত এক ছোট্ট মেয়ে। বাড়িতে টেলিভিশনে ফুটবল চলত প্রায় সারাক্ষণ। মেয়েটি মুগ্ধ হয়ে দেখত আন্দ্রেস ইনিয়েস্তার পায়ের জাদু। রিভালদো আর রোনালদিনহোর ফুটবলও তাকে টানত চুম্বকের মতো। সুযোগ পেলেই ছুটে যেত ক্যাম্প ন্যুতে। বার্সেলোনার খেলা দেখতে। সেই মেয়েটি একদিন বার্সেলোনারই রানি হয়ে গেল। আলেক্সিয়া পুতেয়াস। ফুটবল বিশ্ব তাকে ডাকে ‘লা রেইনা’ নামে। স্প্যানিশ ভাষায় যার অর্থ ‘রানি’।

সেরা স্ট্রাইকার কেইন ও শার্লিন কোরাল
ছেলেদের বিভাগে বর্ষসেরা স্ট্রাইকারের পুরস্কারও জিতেছেন হ্যারি কেইন। ইংল্যান্ডের কিংবদন্তি স্ট্রাইকার অ্যালান শিয়ারার ও অভিনেত্রী সোফি টার্নার তাঁর হাতে পুরস্কার তুলে দেন।

গত মৌসুমে ৬৫ ম্যাচে ৭৩ গোলের অসাধারণ পরিসংখ্যানই এই স্বীকৃতির পেছনে বড় ভূমিকা রেখেছে। বর্ষসেরা ফুটবলারের পুরস্কার জয়ের আগেই স্ট্রাইকার বিভাগে স্বীকৃতি পেয়ে কেইন বুঝিয়ে দেন, কেন তিনি এবারের ব্যালন ডি’অরের অন্যতম বড় দাবিদার ছিলেন।

মেয়েদের বিভাগে সেরা স্ট্রাইকার নির্বাচিত হয়েছেন মেক্সিকান ক্লাব পাচুয়ার নারী দলের ফরোয়ার্ড শার্লিন কোরাল।

টানা দ্বিতীয়বার ছেলেদের সেরা ক্লাব পিএসজি
ছেলেদের বর্ষসেরা ক্লাবের পুরস্কার জিতেছে প্যারিস সেন্ট-জার্মেই (পিএসজি)। ম্যাচের ব্যস্ততার কারণে ক্লাবটির প্রতিনিধিদল অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকতে পারেনি। তাদের হয়ে পুরস্কার গ্রহণ করেন গতবারের ব্যালন ডি’অরজয়ী উসমান দেম্বেলে।

লুইস এনরিকের অধীনে গত মৌসুমে চ্যাম্পিয়নস লিগ ও ঘরোয়া লিগের শিরোপা ধরে রেখেছে পিএসজি। এর মধ্য দিয়ে টানা দ্বিতীয়বারের মতো ছেলেদের সেরা ক্লাবের পুরস্কার জিতল ফরাসি জায়ান্টরা।

সক্রেটিস ট্রফি পেলেন বুকায়ো সাকা
মানবহিতকর কাজে অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে দেওয়া সক্রেটিস ট্রফি জিতেছেন ইংল্যান্ড ও আর্সেনালের তারকা বুকায়ো সাকা। ব্রাজিলিয়ান কিংবদন্তি সক্রেটিসের নামে ২০২২ সালে চালু হওয়া এই পুরস্কার তাঁর হাতে তুলে দেন নাইজেরিয়ান সংগীতশিল্পী বার্না বয়।

মঞ্চে উঠে রুয়ান্ডার ১৪ বছর বয়সী এক শিশুর চিঠি পড়ে শোনান সাকা। চিঠিতে শিশুটি ভবিষ্যতে ইংরেজির শিক্ষক হওয়ার স্বপ্নের কথা জানিয়েছে।

ছেলে ও মেয়েদের সেরা গোলকিপার স্পেনের
গোলকিপার বিভাগেও স্পেনের জয়জয়কার। মেয়েদের সেরা গোলকিপারের পুরস্কার জিতেছেন কাতা কোল। ছেলেদের বিভাগে সেরা গোলকিপার নির্বাচিত হয়েছেন স্পেনের উনাই সিমোন।

চেক প্রজাতন্ত্রের কিংবদন্তি গোলকিপার পিটার স্মাইকেলের হাত থেকে পুরস্কার গ্রহণ করেন দুই স্প্যানিশ তারকা। তাঁদের সাফল্যে এবারের আসরে স্পেনের প্রতিনিধিত্ব আরও উজ্জ্বল হয়েছে।

ছেলেদের সেরা কোচ লুইস দে লা ফুয়েন্তে
ছেলেদের বিভাগে বর্ষসেরা কোচ নির্বাচিত হয়েছেন স্পেনের জাতীয় দলের কোচ লুইস দে লা ফুয়েন্তে। সাবেক লিভারপুল কোচ রাফা বেনিতেজের কাছ থেকে পুরস্কার গ্রহণ করেন তিনি।

স্পেনের হয়ে ইউরো ও বিশ্বকাপ জয়ের কৃতিত্বের স্বীকৃতি পেয়েছেন দে লা ফুয়েন্তে। পুরস্কার গ্রহণের পর তিনি বলেন, ‘এই পুরস্কার সম্মানের। মনোনয়ন পাওয়াটাই ছিল একটা পুরস্কার। মনোনয়ন পাওয়া বাকিদেরও অভিবাদন জানাই। আমার এই পুরস্কার গোটা দলের জন্য, দুনিয়ার সেরা কোচিং স্টাফের জন্য।’

কোচদের মনোনয়ন তালিকাতেও ছিল স্পেনের আধিপত্য। পাঁচজন মনোনীত কোচের মধ্যে চারজনই ছিলেন স্প্যানিশ।

মেয়েদের সেরা কোচ বার্সেলোনার পেরে রোমেউ
মেয়েদের বিভাগে বর্ষসেরা কোচের পুরস্কার জিতেছেন বার্সেলোনা নারী দলের কোচ পেরে রোমেউ। রাফা বেনিতেজের হাত থেকে পুরস্কার গ্রহণ করেন তিনি।

এবারের আসরে তরুণ খেলোয়াড়, কোচ ও গোলকিপারদের বিভিন্ন বিভাগে স্প্যানিশদের সাফল্য ছিল উল্লেখযোগ্য। বিশেষ করে বার্সেলোনার খেলোয়াড় ও কোচদের একের পর এক পুরস্কার জয় ক্লাবটির শক্তিমত্তারই প্রতিফলন।

তরুণদের বিভাগেও স্পেনের দাপট
ছেলেদের বিভাগে সেরা উদীয়মান তরুণ খেলোয়াড়ের পুরস্কার জিতেছেন বার্সেলোনার লামিনে ইয়ামাল। ইউক্রেনের কিংবদন্তি আন্দ্রে শেভচেঙ্কোর হাত থেকে পুরস্কার নেন ১৯ বছর বয়সী এই তারকা।

পুরস্কার গ্রহণের পর ইয়ামাল সংক্ষিপ্ত বক্তব্য দেন। এরপর ফ্রান্সের কিংবদন্তি থিয়েরি অঁরি তাঁকে প্রশ্ন করেন, ‘এই পুরস্কারটা সত্যিই চেয়েছিলে?’ ইয়ামালের লাজুক প্রতিক্রিয়ায় যেন স্পষ্ট হয়ে ওঠে, তাঁর লক্ষ্য আরও বড়—ব্যালন ডি’অর।

মেয়েদের বিভাগে সেরা উদীয়মান খেলোয়াড় নির্বাচিত হয়েছেন বার্সেলোনার ২০ বছর বয়সী অ্যাটাকিং মিডফিল্ডার ভিকি লোপেজ। ইংল্যান্ডের লুসি ব্রোঞ্জের হাত থেকে পুরস্কার গ্রহণ করেন তিনি।

একনজরে ২০২৬ ব্যালন ডি’অরের বিজয়ীরা

* ছেলেদের ব্যালন ডি’অর: হ্যারি কেইন
* মেয়েদের ব্যালন ডি’অর: অ্যালেক্সিয়া পুতেয়াস
* ছেলেদের সেরা স্ট্রাইকার: হ্যারি কেইন
* মেয়েদের সেরা স্ট্রাইকার: শার্লিন কোরাল
* ছেলেদের সেরা ক্লাব: পিএসজি
* সক্রেটিস ট্রফি: বুকায়ো সাকা
* ছেলেদের সেরা গোলকিপার: উনাই সিমোন
* মেয়েদের সেরা গোলকিপার: কাতা কোল
* ছেলেদের সেরা কোচ: লুইস দে লা ফুয়েন্তে
* মেয়েদের সেরা কোচ: পেরে রোমেউ
* ছেলেদের সেরা উদীয়মান খেলোয়াড়: লামিনে ইয়ামাল
* মেয়েদের সেরা উদীয়মান খেলোয়াড়: ভিকি লোপেজ