রোহিঙ্গা সংকটের কারণে কক্সবাজারের টেকনাফে  কর্মহীন হয়ে পড়েছে অন্তত ৭০ হাজার মানুষ। এদের মধ্যে বেশি দুশ্চিন্তায় পড়েছে মধ্যবিত্ত এবং নিম্নবিত্ত পরিবারগুলো। প্রতিনিয়ত খাদ্য মূল্যের উর্ধ্বগতির কারণে হিমসিম খেতে হচ্ছে পরিবারের খরচ যোগাতে, বন্ধ করে দিতে বাধ্য হচ্ছে ছেলে মেয়েদের পড়ালেখা। ফলে এলাকাটিতে বাড়ছে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড বৃদ্ধির প্রবণতা।
মিয়ানমারের সরকারি বাহিনীর সঙ্গে দেশটির স্বাধীনতাকামী সশস্ত্র গোষ্ঠী আরাকান আর্মির সংঘর্ষের কারণে রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশ, মাদকসহ নানা সমস্যার কারণে ২০১৭ সালের দিকে ৩ মাসের জন্য বন্ধ রাখা হয়েছিল নাফ নদীতে মাছ ধরা। কিন্তু ৩ মাস পেরিয়ে গেলেও হাজার হাজার জেলেদের আয়ের উৎস নাফ নদী খুলে দেওয়ার সম্ভাবনা এখনও তৈরী  হয়নি। 
টেকনাফ পৌরসভার ১নং ওয়ার্ড নাইট্যংপাড়া এলাকায় জেলে সরওয়ার আলম পাহাড় সমুদ্র প্রতিবেদককে জানান, আমার পরিবারে ৪ মেয়ে ৪ ছেলেসহ ১০ জন সদস্য। দীর্ঘ সময় নাফ নদীতে মাছ ধরা বন্ধ। আমার পরিবার নাফ নদীর উপর নির্ভরশীল। আমি নদীতে মাছ ধরতে পারলে চাউল ডাল আনতে পারি। নাহলে ছেলে মেয়েদের না খেয়ে থাকতে হয়। আমার ছোট ছোট ছেলে মেয়েদের পড়া লেখা করাতে পারছি না। কত কষ্টে দিনযাপন করছি আল্লাহ ছাড়া কেউ জানেন না। রোহিঙ্গাদের কারণে আমরা অন্য কাজ ও পাচ্ছি না। নাফ নদী খুলে না দেওয়ায় আমাদের ছেলে মেয়েদের ভবিষ্যৎ অন্ধকারে পড়েছে।
জাতীয় মৎস্যজীবী জেলে সমিতির টেকনাফ পৌর শাখার সভাপতি মো. ইব্রাহীম বলেন, তিন মাসের জন্য বন্ধ রাখা নাফ নদী ৭ বছর পেরিয়ে গেলেও নাফ নদী খোলার বিষয়ে এখনও কোনো সিদ্ধান্ত পাইনি। আমরা অনেক কষ্টে দিনযাপন করছি। ৩০ হাজার জেলেদের জীবন যাপন কত কষ্টের বুঝাতে পারছি না, আমরা অনেক মানববন্ধন কর্মসূচি করেছি এবং বিভিন্ন দপ্তরে স্মারকলিপি দিয়েছি, আমাদের জেলেদের কষ্টের কথা বিবেচনা করে দ্রুত খুলে দেওয়ার দাবি জানিয়েছি।
সম্প্রতি রাখাইনে যুদ্ধের তীব্রতা বৃদ্ধি পাওয়ায় চলতি বছরের ১০ ফেব্রুয়ারি টেকনাফ ও সেন্টমার্টিনে পর্যটকবাহী জাহাজ চলাচল বন্ধ রাখা হয়েছে। জাহাজ ঘাটে স্থানীয়সহ প্রায় ২০ হাজার মানুষের কর্মসংস্থান ছিল। এই পেশার সাথে জড়িতদের বেশীরভাগেরই পরিবারের দিন কাটছে চরম অসহায়ত্বের মধ্যে। এ পরিবারগুলোর ছেলে মেয়েদেরও পড়া লেখা বন্ধ করে দিতে হয়েছে।
কক্সবাজার ট্যুর অপারেটর অ্যাসোসিয়েশন (টুয়াক) উপদেষ্টা দিদার হোসেন বলেন, টেকনাফ সেন্টমার্টিন জাহাজ চলাচল বন্ধ করে দেওয়ার কারণে প্রায় ২০ হাজার মানুষ কষ্টে দিনযাপন করছে। যাত্রীবাহী যানবাহনে অনেক নিম্নবিত্ত এবং মধ্যবিত্ত মানুষ কাজ করতেন, আজ অনেক মানুষ একবেলা খেতে পারলেও আরেক বেলা খেতে পারছে না। 
সাধারণ এই মানুষদের কথা বিবেচনা করে টেকনাফ সেন্টমার্টিন নৌরুটে জাহাজ চলাচলের অনুমতি দেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
টেকনাফ শাহপরীর করিডোরে মিয়ানমার থেকে গবাদি পশু আমদানির সাথে  প্রায় ২০ হাজার শ্রমিক কাজ করতেন। কিন্তু ২০২১ সালের দিকে করিডোর বন্ধ করে দেওয়া কারণে  শ্রমিকরা বিপাকে পড়েছেন, পারছেন না ভালো করে সংসার চালাতে। মানুষের আয়ের উৎস বন্ধ থাকায় দিন দিন অবৈধ কাজে জড়িয়ে পড়ছে বলে জানান সচেতন মহল।

টেকনাফ শাহ পরীর দ্বীপ করিডোরের আমদানিকারক সমিতির সভাপতি আবদুল্লাহ মনির জানান, টেকনাফ শাহপরীর দ্বীপ করিডোরে মিয়ানমার থেকে গবাদি পশু আসা শুরু হয়েছিলো ২০০৩ সাল থেকে, করিডোর চালু হওয়ার পর থেকে সরকার কোটি কোটি টাকার রাজস্ব পেয়েছেন। কিন্তু ২০২১ সালে এই করিডোর বন্ধ করে দেওয়ার কারণে ২০ হাজার শ্রমিক এখন  বেকার হয়ে পড়েছে।
তিনি বলেন, রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশ ও মাদক রোধে দীর্ঘদিন ধরে নাফ নদীতে মাছ শিকার বন্ধ, করিডোর বন্ধ, সাধারণ মানুষ কি করবে? বিভিন্ন পন্থায় ঘুমঘুম এর বিভিন্ন জায়গায় থেকে অবৈধভাবে চোরাইপথে গবাদিপশু ঢুকে পড়েছে দেশে। এদিকে সরকার কোটি কোটি টাকা রাজস্ব হারাচ্ছে । ব্যবসায়ীরা অনেক ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছে। দ্রুত খুলে দেওয়ার ব্যবস্থা করলে সাধারণ মানুষসহ এবং সরকার কোটি কোটি টাকার রাজস্ব পাবে।
টেকনাফের সচেতন মহলের দাবি, টেকনাফে বৈধ আয়ের উৎস যা ছিল সব বন্ধ হয়ে যাওয়ার কারণে প্রায় ৭০ হাজার সাধারণ মানুষ বেকার হয়ে অনেক কষ্টে দিনযাপন করছে।  কর্মহীন এই মানুষগুলোর মধ্যে অপরাধ-প্রবণতা বাড়ছে। তাদের সকলের দাবি, দ্রুত মানুষের আয়ের উৎসগুলো খুলে দিয়ে শ্রমিকদের কাজে ফেরাতে হবে। তা সম্ভব না হলে এর বড় প্রভাব সমাজে পড়বে।

-পার্বত্য সময়