প্রায় এক হাজার ফুট গভীরে খননের সময় বের হয় গ্যাস, ৩৩ হাজার ভোল্টের বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ; গ্যাস অনুসন্ধানের সম্ভাবনা যাচাইয়ের পরামর্শ বিশেষজ্ঞদের।
কক্সবাজারের উখিয়ার ইনানীতে বাড়ির আঙিনায় গভীর নলকূপ খনন করতে গিয়ে মাটির নিচ থেকে তীব্র গ্যাসের প্রবাহ বের হওয়ার পর আগুন জ্বলে উঠেছে। মঙ্গলবার সকাল সাতটার দিকে ইনানী ছোট খালের উত্তর পাশে মোহাম্মদ আব্দুল্লাহর বাড়ির আঙিনায় এ ঘটনা ঘটে। দুপুর একটা পর্যন্ত প্রায় ছয় ঘণ্টা ধরে আগুন জ্বলছিল। আগুনের তীব্রতা ও গ্যাসের প্রবাহের কারণে তা পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হয়নি। নিরাপত্তার স্বার্থে ঘটনাস্থলের পাশ দিয়ে যাওয়া ৩৩ হাজার ভোল্টের বিদ্যুৎ সঞ্চালন লাইনে সরবরাহ বন্ধ রাখা হয়েছে।
ঘটনাকে ঘিরে স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে চাঞ্চল্য সৃষ্টি হয়েছে। আগুন দেখতে ঘটনাস্থলে উৎসুক মানুষের ভিড় জমতে থাকায় নিরাপত্তা জোরদার করেছে প্রশাসন। ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা আগুন নিয়ন্ত্রণে কাজ করছেন। অন্যদিকে, মাটির নিচ থেকে নির্গত পদার্থটি প্রকৃতপক্ষে প্রাকৃতিক গ্যাস কি না এবং সেখানে ভূগর্ভস্থ গ্যাসের মজুত রয়েছে কি না, তা বৈজ্ঞানিক পরীক্ষার মাধ্যমে নিশ্চিত হওয়ার প্রয়োজন বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, টেকনাফের বাহারছড়া ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান হাবিবউল্লাহর ছেলে মোহাম্মদ আব্দুল্লাহর বাড়ির আঙিনার পাশে প্রায় এক সপ্তাহ ধরে গভীর নলকূপ স্থাপনের কাজ চলছিল। খননকাজ প্রায় এক হাজার ফুট গভীরে পৌঁছানোর পর মঙ্গলবার সকালে হঠাৎ মাটির নিচ থেকে গ্যাসের মতো একটি পদার্থ বের হতে শুরু করে। কিছুক্ষণের মধ্যে সেখানে আগুন জ্বলে ওঠে। এরপর থেকে আগুন জ্বলতে থাকায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে এলাকায়।
বাড়ি ও গরুর খামারের মালিক মোহাম্মদ আব্দুল্লাহ গণমাধ্যমকে বলেন, “আমার আঙ্গিনায় কয়েক দিন ধরে গভীর নলকূপ স্থাপনের কাজ চলছিল। মঙ্গলবার সকাল সাতটার দিকে শ্রমিকেরা কাজ করার সময় হঠাৎ মাটির নিচ থেকে গ্যাস বের হতে থাকে। একপর্যায়ে আগুন ধরে যায়। পরে ফায়ার সার্ভিসকে খবর দিই। তারা এসে আগুন নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করলেও এখনো তা নেভানো সম্ভব হয়নি।”
উখিয়া ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের স্টেশন কর্মকর্তা সাইদুল ইসলাম বলেন, “সকাল সাতটার দিকে বাড়ীর মালিক ফোন করে বিষয়টি জানান। খবর পেয়ে আমাদের দুটি ইউনিট ঘটনাস্থলে গিয়ে আগুন নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা শুরু করে। গ্যাসের প্রবাহ তীব্র হওয়ায় আগুন পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হয়নি। তবে আগুন যাতে আশপাশে ছড়িয়ে পড়তে না পারে, সে জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।”
তিনি আরও বলেন, “ওই এলাকায় মানুষের বসতবাড়ি রয়েছে, পর্যটকদের যাতায়াতও আছে। তাই আগুনের বিস্তার ঠেকানো এবং আশপাশের মানুষকে সতর্ক রাখা জরুরি।”
ঘটনাস্থলের পাশ দিয়ে যাওয়া ৩৩ হাজার ভোল্টের বিদ্যুৎ সঞ্চালন লাইনের নিরাপত্তা নিয়েও উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। আগুনের তীব্রতার কারণে দুর্ঘটনা এড়াতে ওই লাইনে বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ রাখা হয়েছে বলে জানিয়েছে বিদ্যুৎ বিভাগ।
গ্যাস থেকে আগুনের খবর ছড়িয়ে পড়ার পর ঘটনাস্থলে উৎসুক মানুষের ভিড় বাড়তে থাকে। এতে আগুন নিয়ন্ত্রণের কাজে বিঘ্ন ঘটার আশঙ্কা দেখা দেয়। পরিস্থিতি সামাল দিতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী কাজ করছে।
উখিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা পান্না আক্তার বলেন, “ঘটনাস্থলে উৎসুক জনতার ভিড় এড়াতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী কাজ করছে বলে জানিয়েছেন।”
তিনি বলেন, "প্রশাসনের পক্ষ থেকে ঘটনাস্থলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং আগুনের বিস্তার ঠেকাতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। যেহেতু ৩৩ হাজার ভোল্টের বিদ্যুৎ লাইনের নিচে তীব্র আগুন জ্বলতে থাকায় নিরাপত্তার স্বার্থে বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ রাখা হয়েছে। বাপেক্স একটি টিম ঘটনাস্থলে রওনা দিয়েছেন।
গ্যাসের মজুত আছে কি না অনুসন্ধানের পরামর্শ বিশেষজ্ঞদের
ইনানীতে মাটির নিচ থেকে গ্যাসের মতো পদার্থ বের হওয়ার ঘটনাকে সম্ভাব্য ভূতাত্ত্বিক গুরুত্বের দিক থেকে দেখছেন বিশেষজ্ঞরা। তবে কোনো স্থানে গ্যাসের প্রবাহ দেখা গেলেই সেখানে বাণিজ্যিকভাবে উত্তোলনযোগ্য গ্যাসের মজুত রয়েছে, এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায় না। এ জন্য নির্গত পদার্থের রাসায়নিক গঠন, উৎস, চাপ এবং ভূতাত্ত্বিক অবস্থান পরীক্ষা করা প্রয়োজন।
রাঙ্গামাটি বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য ও সমুদ্রবিজ্ঞানী অধ্যাপক ড. মো. শফিকুল ইসলাম বলেন, “বঙ্গোপসাগরে গ্যাসের ২৮ টি ব্লক রয়েছে। অনুসন্ধানের গ্যাসের যথেষ্ট সম্ভাবনা রয়েছে। বাংলাদেশের সমুদ্রসীমায়ও গ্যাস অনুসন্ধানের সুযোগ আছে। সরকার এখন নিজস্ব সক্ষমতা বাড়াতে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম এক্সপ্লোরেশন অ্যান্ড প্রোডাকশন কোম্পানিকে (বাপেক্স) গুরুত্ব দিচ্ছে। কক্সবাজার উপকূলেও এ ধরনের অনুসন্ধানের সুযোগ রয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।”
নিজের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে তিনি বলেন, “বঙ্গোপসাগর ও তার আশপাশের উপকূলের একটি পাহাড়ি এলাকায় একসময় প্রাকৃতিকভাবে গ্যাস বের হতো। পরে গ্যাস অনুসন্ধানের কার্যক্রমের সময় জায়গাটি ঢালাই করে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল। অনেক সময় দুর্ঘটনা এড়াতে এ ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া হয়।”
ইনানীর ঘটনার ভিডিও দেখে সেখানে অনুসন্ধানের সম্ভাবনা থাকতে পারে বলে মনে করেন অধ্যাপক শফিকুল ইসলাম। তাঁর ভাষ্য, “গ্যাসের যে তীব্র প্রবাহ দেখা গেছে, তার ভিডিও দেখে আমার মনে হয়েছে, সেখানে সম্ভাবনা থাকতে পারে। তবে বিষয়টি নিশ্চিত হতে বৈজ্ঞানিক পরীক্ষা-নিরীক্ষা প্রয়োজন। যেহেতু ওই এলাকায় প্রাকৃতিকভাবে গ্যাসের প্রবাহ দেখা গেছে, তাই বাপেক্সের উচিত দ্রুত সেখানে অনুসন্ধান ও প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষার উদ্যোগ নেওয়া। এতে প্রকৃতপক্ষে গ্যাসের মজুত বা উত্তোলনের সম্ভাবনা রয়েছে কি না, তা জানা সম্ভব হবে।”
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও ভূরাজনৈতিক বিশ্লেষক অধ্যাপক আক্কাস আহমদের মতে, বঙ্গোপসাগর ও এর উপকূলীয় অঞ্চলের প্রাকৃতিক সম্পদের সম্ভাবনা যথাযথ বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধানের মাধ্যমে মূল্যায়ন করা প্রয়োজন। ইনানীর ঘটনাটিও সেই দৃষ্টিকোণ থেকে পরীক্ষা করে দেখা যেতে পারে। তবে প্রাথমিক পর্যায়ের কোনো লক্ষণকে নিশ্চিত গ্যাসের মজুত হিসেবে বিবেচনা করা ঠিক হবে না।
এখন পর্যন্ত নির্গত পদার্থটির প্রকৃতি ও উৎস পরীক্ষার মাধ্যমে নিশ্চিত হওয়ার তথ্য পাওয়া যায়নি। সংশ্লিষ্ট জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে দ্রুত নমুনা পরীক্ষা এবং ভূতাত্ত্বিক মূল্যায়ন করা গেলে ঘটনাটির প্রকৃত তাৎপর্য জানা সম্ভব হবে।


