পর্যটকশূন্য সাজেক। রিসোর্ট-কটেজে নেই অতিথি, দোকানপাটে কমছে নিত্যপণ্যের মজুত। বন্ধ আয়-রোজগার, অন্যদিকে খাদ্য ও জরুরি ওষুধের সরবরাহ নিয়ে বাড়ছে উদ্বেগ। রাঙামাটির বাঘাইছড়ি উপজেলার সাজেকে সড়ক অবরোধের সপ্তম দিনে এসে পর্যটননির্ভর ব্যবসায়ী, শ্রমিক ও স্থানীয় বাসিন্দারা পড়েছেন বহুমুখী সংকটে। দীর্ঘস্থায়ী অচলাবস্থায় একদিকে জীবিকা হারানোর শঙ্কা, অন্যদিকে দুর্গম পাহাড়ি জনপদে প্রয়োজনীয় খাদ্য ও চিকিৎসাসামগ্রী পাওয়া নিয়েও দেখা দিয়েছে অনিশ্চয়তা।
স্থানীয় ব্যবসায়ী ও জনপ্রতিনিধিদের বরাতে জানা গেছে, পণ্যবাহী যান চলাচল বন্ধ থাকায় সাজেকের বিভিন্ন এলাকায় চাল, চিনি, ডাল, সয়াবিন তেলসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মজুত কমছে। একই সঙ্গে জীবনরক্ষাকারী ওষুধ ও চিকিৎসা-সামগ্রীর সরবরাহ ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে শিশু, বয়স্ক ও অসুস্থ ব্যক্তিদের চিকিৎসা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে।
দোকানে ফুরিয়ে যাচ্ছে নিত্যপণ্য
সাজেকের মুদি দোকানি জনসিম চাকমা জানান, তাঁর দোকানে চাল ও চিনি শেষ হয়ে গেছে। আশপাশের দোকানগুলোতেও ডাল, সয়াবিন তেল, চিনি এবং ডিজেল-অকটেনের মজুত ফুরিয়ে আসছে। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, পরিস্থিতি এতটা জটিল হবে, তা আগে ধারণা করতে পারেননি ব্যবসায়ীরা। গত ২১ অক্টোবরের পর পণ্যবাহী গাড়ি না আসায় সংকট আরও বেড়েছে।
সাজেক ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান অতুলাল চাকমা জানান, কিছু এলাকায় পণ্যবাহী গাড়ি না পৌঁছানোয় স্থানীয়দের মধ্যে খাদ্যসংকটের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। ফার্মেসিতে কিছু ওষুধ থাকলেও জরুরি জীবনরক্ষাকারী ওষুধ ও চিকিৎসা-সামগ্রীর ঘাটতি রয়েছে বলে তিনি উদ্বেগ প্রকাশ করেন। কোনো রোগী বা দুর্ঘটনায় আহত ব্যক্তিকে হাসপাতালে নেওয়ার জন্য যানবাহন ও যোগাযোগব্যবস্থা সচল না থাকাও বড় সমস্যা হয়ে উঠেছে।
কর্মচারীদের বেতন, ব্যবসায়ীদের লোকসান
সাজেকের অর্থনীতির বড় অংশ পর্যটননির্ভর। পর্যটকদের যাতায়াত বন্ধ থাকায় রিসোর্ট, কটেজ, রেস্তোরাঁ, মুদি দোকান ও পরিবহন খাতের আয় থমকে গেছে। অথচ ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান রক্ষণাবেক্ষণ, দোকানভাড়া, কর্মচারীদের বেতন ও পরিবারের খরচ বহন করতে হচ্ছে।
সাজেকের রেস্তোরাঁ ব্যবসায়ী আব্দুর রাজ্জাক বলেন, তাঁর রেস্তোরাঁয় আটজন কর্মচারী কাজ করেন। অবরোধের কারণে তাঁরা কর্মহীন হয়ে পড়েছেন। রেস্তোরাঁর জন্য কেনা খাদ্যসামগ্রীও পড়ে থেকে নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
স্থানীয় পর্যটন ব্যবসায়ী জিয়াউল হক যুবরাজ জানান, পর্যটক না থাকলেও রিসোর্ট ও কটেজে অনেক কর্মচারী অবস্থান করছেন। যানবাহন চলাচল বন্ধ থাকায় সেখানে প্রয়োজনীয় পণ্য পৌঁছানো যাচ্ছে না। এতে কর্মচারীদের পাশাপাশি স্থানীয় বাসিন্দারাও খাদ্যসংকটে পড়ছেন।
সাজেক রিসোর্ট-কটেজ মালিক সমিতির তথ্য অনুযায়ী, পর্যটক না থাকায় ব্যবসায়ীরা প্রতিদিন উল্লেখযোগ্য আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়ছেন। পর্যটনকেন্দ্রিক রিসোর্ট-কটেজ, রেস্তোরাঁ ও ক্ষুদ্র দোকানগুলোর কার্যক্রম বন্ধ থাকায় এর প্রভাব পড়েছে স্থানীয় কর্মসংস্থানেও।
বৈঠকেও কাটেনি অচলাবস্থা
সাজেকের সংকট নিরসনে গত ২৬ অক্টোবর উজো বাজারে প্রশাসনের প্রতিনিধি ও অবরোধকারীদের মধ্যে বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। এতে খাগড়াছড়ির সংসদ সদস্য ও পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি আব্দুল ওয়াদুদ ভূঁইয়া, রাঙামাটির সংসদ সদস্য দীপেন দেওয়ান, দুই জেলার জেলা প্রশাসক এবং পুলিশ কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
বৈঠকে অবরোধকারীদের পাঁচ দফা দাবি নিয়ে আলোচনা হয়। খাগড়াছড়ির সংসদ সদস্য আব্দুল ওয়াদুদ ভূঁইয়া বৈঠক-পরবর্তী বক্তব্যে জানান, পাঁচটি দাবির মধ্যে চারটি বিষয়ে সমঝোতা হয়েছে; বাকি দাবিটি নিয়ে আরও আলোচনার প্রয়োজন রয়েছে। তবে অবরোধকারীরা মূল দাবি নিয়ে চূড়ান্ত সমঝোতা না হওয়ায় অবরোধ চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দেন। ফলে সড়ক যোগাযোগ স্বাভাবিক করার বিষয়ে তাৎক্ষণিক কোনো সমাধান আসেনি।
জরুরি সরবরাহ নিশ্চিতের দাবি
বাঘাইছড়ি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আমেনা মারজান সংবাদমাধ্যমকে জানিয়েছেন, খাদ্যসংকটের বিষয়ে স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, হেডম্যান বা কারবারিদের কাছ থেকে আনুষ্ঠানিক তথ্য পাওয়া গেলে প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
অন্যদিকে রাঙামাটির সংসদ সদস্য দীপেন দেওয়ান বলেছেন, সাজেকে খাদ্যসংকটের খবর পাওয়া গেলে প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবে।
এ অবস্থায় অবরোধের রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক সমাধানের পাশাপাশি সাধারণ মানুষের জীবন-জীবিকা সুরক্ষায় জরুরি পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি জোরালো হচ্ছে। বিশেষ করে খাদ্যপণ্য, জীবনরক্ষাকারী ওষুধ ও চিকিৎসাসামগ্রী পৌঁছাতে মানবিক বিবেচনায় কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি।
সাজেকের ব্যবসায়ীরা চান দ্রুত স্বাভাবিক হোক পর্যটন ও পরিবহনব্যবস্থা। আর স্থানীয় বাসিন্দাদের প্রধান উদ্বেগ—দীর্ঘস্থায়ী অচলাবস্থায় নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য ও জরুরি চিকিৎসা থেকে যেন তাঁরা বঞ্চিত না হন। সংকট দীর্ঘায়িত হলে আর্থিক ক্ষতির পাশাপাশি জনস্বাস্থ্য ও জনজীবনেও এর প্রভাব আরও গভীর হতে পারে।


