সবুজ পাহাড়, দুর্গম জনপদ, সীমান্তঘেঁষা বসতি আর ভৌগোলিক বিচ্ছিন্নতা-পার্বত্য চট্টগ্রামের বাস্তবতা সমতলের চেয়ে আলাদা। পাহাড়ের অনেক এলাকায় সড়ক যোগাযোগ ও সরকারি সেবার স্বাভাবিক প্রবাহ এখনো কঠিন। এই বাস্তবতায় বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর উপস্থিতিও কেবল নিরাপত্তা দায়িত্বে সীমাবদ্ধ নয়; চিকিৎসা, শিক্ষা, মানবিক সহায়তা, দুর্যোগ মোকাবিলা, পরিবেশ সংরক্ষণ ও স্থানীয় প্রশাসনের সঙ্গে সমন্বিত বিভিন্ন কর্মকাণ্ডেও তাদের সম্পৃক্ততা দেখা যাচ্ছে।
খাগড়াছড়িতে সাম্প্রতিক সময়ের কার্যক্রমগুলো সেই বহুমাত্রিক ভূমিকারই চিত্র তুলে ধরছে।
৮৬১ রোগীর বিনা মূল্যে চিকিৎসা:
সাম্প্রতিক সময়ের সবচেয়ে বড় উদাহরণগুলোর একটি হলো ১২ সেপ্টেম্বর ২০২৬ খাগড়াছড়ি জেলা সদর হাসপাতালে অনুষ্ঠিত বিশেষ চিকিৎসা কার্যক্রম। খাগড়াছড়ি রিজিয়ন ও জেলা সদর হাসপাতালের যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত এ কার্যক্রমে সার্জারি, মেডিসিন, চর্মরোগ, স্ত্রীরোগ ও চক্ষু বিভাগের বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকেরা ৮৬১ জন রোগীকে বিনা মূল্যে চিকিৎসা ও প্রয়োজনীয় পরামর্শ দেন।
এর মাত্র দুই সপ্তাহ পর, ২৯ সেপ্টেম্বর দীঘিনালা উপজেলার দুর্গম মধ্য বানছড়া এলাকায় সেনাবাহিনীর চিকিৎসা ক্যাম্পে তিন শতাধিক পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর মানুষ চিকিৎসা ও বিনামূল্যে ওষুধ পেয়েছেন। নারী, শিশু ও বয়স্করাও এ ক্যাম্পে সেবা নেন। স্থানীয় বাসিন্দা স্নেহ রঞ্জন চাকমা সংবাদমাধ্যমকে বলেন, দুর্গম এলাকায় চিকিৎসাসেবা পাওয়া কঠিন; সেনাবাহিনীর চিকিৎসক এসে সেবা ও ওষুধ দেওয়ায় তারা উপকৃত হয়েছেন।
মে মাসেও দীঘিনালার বাবুছড়া ইউনিয়নের দুর্গম বাঙাল্যা পাড়ায় সেনাবাহিনীর মেডিকেল ক্যাম্প অনুষ্ঠিত হয়। ওই ক্যাম্প পরিদর্শন করেন খাগড়াছড়ি রিজিয়ন কমান্ডার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল কে এম ওবায়দুল হক।
শুধু বর্তমান নয়, আছে বড় পরিসরের ধারাবাহিকতা:
পার্বত্য চট্টগ্রামে সেনাবাহিনীর সামাজিক ও মানবিক কর্মকাণ্ডের পরিসর বোঝাতে ২০১৯ সালের সরকারি হিসাবও গুরুত্বপূর্ণ। ওই বছর তিন পার্বত্য জেলায় সেনাবাহিনীর পক্ষ থেকে ৯৯ হাজার ১৬৬ জনকে বিনামূল্যে চিকিৎসাসেবা দেওয়া হয়। এর মধ্যে ১৩টি বিনামূল্যের চক্ষু শিবিরও ছিল।
একই বছরে ৭০টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নির্মাণ বা পুনর্নির্মাণ, ১২৩টি ধর্মীয় উপাসনালয় নির্মাণ বা পুনর্নির্মাণ, ৪৮টি যাত্রীছাউনি-সেতু নির্মাণ বা পুনর্নির্মাণ এবং ২৭টি গভীর নলকূপ স্থাপনের তথ্য দিয়েছে আইএসপিআর। এছাড়া ১৭ হাজার ৯১০ জনকে শীতবস্ত্র, ১৫ হাজার ৬৮৭ জনকে ত্রাণসামগ্রী এবং ৭ হাজার ২২৪ জনকে আর্থিক সহায়তা দেওয়ার কথাও সরকারি ওই হিসাবে উল্লেখ রয়েছে।
তবে এগুলো ২০১৯ সালের পরিসংখ্যান—সাম্প্রতিক বছরের মোট কার্যক্রমের হিসাব হিসেবে নয়, বরং সেনাবাহিনীর দীর্ঘদিনের সামাজিক কর্মকাণ্ডের একটি সরকারি নথিভুক্ত চিত্র হিসেবে দেখা প্রয়োজন।
উন্নয়নের কেন্দ্রে যোগাযোগ ও স্থানীয় প্রশাসন:
খাগড়াছড়ি রিজিয়ন কমান্ডার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল কে এম ওবায়দুল হক সম্প্রতি পাহাড়ের উন্নয়নের জন্য যোগাযোগব্যবস্থা ও স্থানীয় প্রশাসনকে শক্তিশালী করার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন।
সম্প্রতি সময়ে বক্তব্যে তিনি বলেন, “পাহাড়ের দুর্গম অঞ্চলের মানুষের জীবনমান উন্নয়নে যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন এবং স্থানীয় প্রশাসনকে আরও শক্তিশালী করতে হবে।” তাঁর বক্তব্যে শিক্ষা, চিকিৎসা ও যোগাযোগব্যবস্থার উন্নয়নের প্রয়োজনীয়তাও উঠে আসে।
অর্থাৎ, পাহাড়ের উন্নয়নকে শুধু অবকাঠামো নির্মাণের মধ্যে না দেখে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, যোগাযোগ ও প্রশাসনিক সক্ষমতার সমন্বিত উন্নয়নের প্রয়োজনীয়তার কথাই উঠে এসেছে সেনা রিজিয়নের নেতৃত্বের বক্তব্যে।
দুর্যোগে মানুষের পাশে:
প্রাকৃতিক দুর্যোগেও খাগড়াছড়িতে সেনাবাহিনীর ভূমিকা দৃশ্যমান হয়েছে। ২০২৪ সালের ভয়াবহ বন্যায় জেলার বিভিন্ন এলাকায় পানি ও যোগাযোগ বিচ্ছিন্নতার মধ্যে উদ্ধার ও ত্রাণ কার্যক্রম চালানো হয়। ওই বন্যায় সাজেক পর্যটনকেন্দ্রে আটকা পড়া ২৬০ পর্যটককে ৭৩টি যানবাহনের মাধ্যমে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া হয়।
বন্যার সময় খাগড়াছড়িসহ বিভিন্ন এলাকায় সেনাবাহিনী জল ও স্থলপথে উদ্ধার, ত্রাণ এবং মানবিক সহায়তায় অংশ নেয়। বিভিন্ন সময় খাগড়াছড়ির বন্যা পরিস্থিতিতে সেনাবাহিনীর তৎপরতা উল্লেখযোগ্য।
এই ধরনের তৎপরতা পাহাড়ের ভৌগোলিক বাস্তবতায় বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। কারণ পাহাড়ি ঢল, পাহাড়ধস কিংবা অতিবৃষ্টির সময় অনেক এলাকায় সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে গেলে দ্রুত উদ্ধার ও ত্রাণ পৌঁছানো বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায়।
সম্প্রীতি ও সামাজিক কর্মকাণ্ড:
পাহাড়ে নিরাপত্তার পাশাপাশি বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর মধ্যে সম্প্রীতি বজায় রাখতেও সেনাবাহিনীসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বিভিন্ন কর্মসূচির কথা সাম্প্রতিক সময়ে উঠে এসেছে। সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, ক্রীড়া আয়োজন, সম্প্রীতি সভা ও বিভিন্ন সামাজিক কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মধ্যে যোগাযোগ বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে বলে জানানো হয়।
খাগড়াছড়ির জেলা প্রশাসক মো. আনোয়ার সাদাত বলেন, প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মানুষের আন্তরিক প্রচেষ্টায় সম্প্রীতি বজায় রয়েছে।
পর্যটন নিরাপত্তায় সমন্বিত ব্যবস্থা:
খাগড়াছড়ির পর্যটন খাতেও নিরাপত্তা গুরুত্বপূর্ণ। পাহাড়, ঝরনা ও বৈচিত্র্যময় প্রকৃতির কারণে পর্যটকদের কাছে খাগড়াছড়ি আকর্ষণীয় হলেও দুর্গম পর্যটনকেন্দ্রে নিরাপত্তা ও যোগাযোগ বড় বিষয়।
জেলা প্রশাসক মো. আনোয়ার সাদাত জানান, পর্যটকদের নিরাপত্তায় ট্যুরিস্ট পুলিশ, সেনাবাহিনী, বিজিবি ও প্রশাসনের সমন্বিত কার্যক্রম রয়েছে। পর্যটনকে আরও সহজ ও নিরাপদ করতে তথ্যসমৃদ্ধ সাইনবোর্ড, লিফলেট ও ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের উদ্যোগের কথাও তিনি জানান।
নিরাপত্তার মূল দায়িত্বও বহাল:
পাহাড়ে সেনাবাহিনীর অন্যতম প্রধান দায়িত্ব এখনো নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। পার্বত্য চট্টগ্রামের দুর্গম এলাকায় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ, সীমান্ত নিরাপত্তা এবং বিভিন্ন সশস্ত্র তৎপরতা মোকাবিলায় সেনাবাহিনী অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে কাজ করছে।
সম্প্রতি খাগড়াছড়ি জেলা প্রশাসক মো. আনোয়ার সাদাত বলেন, যেকোনো পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে নিরাপত্তা বাহিনী সচেতন ও সতর্ক রয়েছে। সেখানে সেনাবাহিনী, বিজিবি, পুলিশ, আনসার ও অন্যান্য সংস্থার সমন্বিত তৎপরতা চোখে পড়ার মতো।
ফলে পাহাড়ে সেনাবাহিনীর বর্তমান অবস্থানকে একদিকে যেমন নিরাপত্তা দায়িত্বের আলোকে দেখতে হয়, অন্যদিকে দুর্গম মানুষের জীবনমান উন্নয়নে তাদের মানবিক ও সামাজিক কর্মকাণ্ডও বিবেচনায় নিতে হয়।
শান্তিচুক্তির প্রেক্ষাপট:
১৯৯৭ সালের ২ ডিসেম্বর সরকার ও পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির মধ্যে পার্বত্য চট্টগ্রাম শান্তিচুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। জাতিসংঘের Peace Agreements Database-এ সংরক্ষিত চুক্তিতে পার্বত্য অঞ্চলের রাজনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক, শিক্ষাগত ও অর্থনৈতিক অধিকার সংরক্ষণ এবং আর্থ-সামাজিক উন্নয়নের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
চুক্তির পর পার্বত্য অঞ্চলের প্রশাসনিক কাঠামো, নিরাপত্তা ও উন্নয়ন নিয়ে বিভিন্ন পর্যায়ে আলোচনা ও বাস্তবায়ন কার্যক্রম চলমান রয়েছে। এই দীর্ঘ প্রেক্ষাপটে পাহাড়ে সেনাবাহিনীর ভূমিকা শুধু নিরাপত্তা দিয়ে ব্যাখ্যা করলে পুরো চিত্রটি ধরা পড়ে না।
পাহাড়ে সেনাবাহিনীর ভূমিকার বিস্তৃত চিত্র:
খাগড়াছড়ির সাম্প্রতিক চিত্র বলছে, পাহাড়ে সেনাবাহিনীর ভূমিকা এখন কয়েকটি স্তরে বিস্তৃত—নিরাপত্তা ও আইনশৃঙ্খলা, দুর্গম এলাকায় চিকিৎসা, দুর্যোগে উদ্ধার ও ত্রাণ, শিক্ষা ও সামাজিক সহায়তা, পরিবেশ ও জনসচেতনতা এবং পর্যটন নিরাপত্তায় প্রশাসনের সঙ্গে সমন্বয়।
রিজিয়ন কমান্ডার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল কে এম ওবায়দুল হকের বক্তব্যে যোগাযোগ, শিক্ষা ও চিকিৎসার মতো মৌলিক সেবার উন্নয়নের প্রয়োজনীয়তা যেমন উঠে এসেছে, তেমনি জেলা প্রশাসক মো. আনোয়ার সাদাতের বক্তব্যে প্রশাসন ও নিরাপত্তা বাহিনীর সমন্বিত ভূমিকার বিষয়টি সামনে এসেছে।
পাহাড়ের মানুষের জন্য টেকসই উন্নয়নের অর্থ শুধু নতুন রাস্তা বা স্থাপনা নয়; প্রয়োজন নিরাপদ জীবন, চিকিৎসা, শিক্ষা, কর্মসংস্থান, যোগাযোগ এবং শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান। আর সেই বৃহত্তর বাস্তবতায় খাগড়াছড়িতে সেনাবাহিনীর সাম্প্রতিক কার্যক্রম নিরাপত্তার পাশাপাশি মানবিক সহায়তা ও সামাজিক উন্নয়নেও একটি দৃশ্যমান উপস্থিতির চিত্র তুলে ধরছে।


