পর্যটন নগরী অপরূপ সাজেককে বলা হয় রাঙামাটির ছাদ। রাঙামাটির বাঘাইছড়ি উপজেলার দুর্গম এ পর্যটন এলাকায় প্রতি বছর দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে বিপুলসংখ্যক পর্যটক আসেন। পাহাড়, মেঘ, সবুজ বন আর আঁকাবাঁকা সড়কের কারণে সাজেক দেশের অন্যতম জনপ্রিয় পর্যটন গন্তব্যে পরিণত হয়েছে।

তবে পর্যটকের সংখ্যা বাড়লেও নানা সমস্যায় বাধাগ্রস্ত হচ্ছে সাজেকের পর্যটন সম্ভাবনা। বিশেষ করে জেএসএস, ইউপিডিএফ ও কেএনএফসহ আঞ্চলিক সশস্ত্র সংগঠনগুলোর সংঘাতকে পর্যটন খাতের অন্যতম বড় বাধা হিসেবে দেখছেন স্থানীয়রা ও পর্যটন সংশ্লিষ্টরা। বিভিন্ন সময়ে সংঘাত ও গোলাগুলির ঘটনায় পর্যটকদের মধ্যে আতঙ্ক তৈরি হয়। পাশাপাশি পর্যটক পরিবহন, সড়ক যোগাযোগ, জরুরি চিকিৎসা ও উদ্ধারসেবা, পানি, পার্কিং এবং অন্যান্য পর্যটন অবকাঠামোর উন্নয়ন জরুরি হয়ে পড়েছে।

সাজেকে পর্যটকদের নিরাপত্তায় সেনাবাহিনী ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী কাজ করছে। নির্দিষ্ট সময়ে নিরাপত্তা স্কটের মাধ্যমে পর্যটকদের যাতায়াতের ব্যবস্থা করা হয়। তবে পর্যটন সংশ্লিষ্টদের মতে, পর্যটকের সংখ্যা বাড়ার সঙ্গে নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনাও আরও সম্প্রসারণ করা প্রয়োজন। বিশেষ করে প্রয়োজন অনুযায়ী সেনাক্যাম্প ও নিরাপত্তা স্কট বাড়ানো গেলে পর্যটকদের চলাচল আরও নির্বিঘ্ন করা সম্ভব হবে।

স্থানীয় সূত্রগুলো বলছে, জেএসএস, ইউপিডিএফ ও কেএনএফসহ আঞ্চলিক সংগঠনগুলোর মধ্যে সংঘাতের কারণে বিভিন্ন সময়ে সাজেক ও এর আশপাশের এলাকায় উত্তেজনাকর পরিস্থিতি তৈরি হয়। এসব ঘটনার খবর ছড়িয়ে পড়লে পর্যটকদের মধ্যে আতঙ্ক দেখা দেয়। ফলে অনেকেই সাজেক ভ্রমণের পরিকল্পনা বাতিল বা স্থগিত করেন বলে পর্যটন সংশ্লিষ্টরা জানান।

সড়ক নিরাপত্তাও সাজেকের অন্যতম বড় সমস্যা। পর্যটক পরিবহনে ব্যবহৃত চাঁদের গাড়ি ও অন্যান্য যানবাহন বিভিন্ন সময়ে দুর্ঘটনার শিকার হয়। আঁকাবাঁকা ও সরু পাহাড়ি সড়কে চালকদের অসতর্কতা, অতিরিক্ত গতি এবং ফিটনেসবিহীন যানবাহন দুর্ঘটনার অন্যতম কারণ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

আবার অনেক পর্যটক নিজেদের গাড়ি নিয়ে সাজেকে যান। পাহাড়ি সড়কে গাড়ি চালানোর অভিজ্ঞতা না থাকায় তাদের কেউ কেউ দুর্ঘটনার কবলে পড়েন। এ কারণে পর্যটক পরিবহনে চালকদের প্রশিক্ষণ, গাড়ির ফিটনেস পরীক্ষা ও নির্ধারিত গতিসীমা নিশ্চিত করার পাশাপাশি পাহাড়ি সড়কে ব্যক্তিগত গাড়ি চলাচলে প্রয়োজনীয় বিধিনিষেধ কার্যকর করার দাবি রয়েছে।

প্রতি বছর বর্ষা মৌসুমে সাজেকের মাচালং সড়কের বিভিন্ন অংশ পানিতে ডুবে যোগাযোগ ব্যবস্থা ব্যাহত হয়। এতে অনেক সময় পর্যটকরা সাজেকে আটকা পড়েন। সংশ্লিষ্টদের মতে, সমীক্ষার মাধ্যমে মাচালং সড়কের ঝুঁকিপূর্ণ অংশগুলো উঁচু করা এবং পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা করা জরুরি।

এদিকে পাহাড় কেটে অপরিকল্পিতভাবে কটেজ, হোটেল-মোটেল নির্মাণের প্রবণতা সাজেকের পরিবেশ ও প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের ওপর চাপ তৈরি করছে। পর্যটকের সংখ্যা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে পার্কিং, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও বিশুদ্ধ পানির সংকটও প্রকট হচ্ছে।

পর্যটন সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সাজেককে পরিকল্পিত পর্যটনকেন্দ্র হিসেবে গড়ে তুলতে নিরাপত্তা ব্যবস্থার পাশাপাশি নিরাপদ পর্যটক পরিবহন, আধুনিক পর্যটন তথ্যকেন্দ্র, জরুরি চিকিৎসা ও উদ্ধারসেবা, পর্যাপ্ত পার্কিং, নির্দিষ্ট বর্জ্য ফেলার স্থান, বিশুদ্ধ পানি, উন্নত মোবাইল নেটওয়ার্ক ও ইন্টারনেট সুবিধা বাড়াতে হবে।

সাজেকের আল মদিনা রেস্টুরেন্টের স্বত্বাধিকারী মো. জাফর আলম বলেন, ‘সাজেকে পর্যটকদের জন্য নিরাপত্তার পাশাপাশি নিরাপদ যোগাযোগ ব্যবস্থা সচল রাখা এবং ধসে যাওয়া সড়কগুলো সংস্কার করা অত্যন্ত জরুরি। এরপর বিনোদনের জন্য পার্ক নির্মাণসহ অন্যান্য সুবিধা বাড়াতে হবে। তাহলে সাজেক হবে দেশের পর্যটনের বড় হাব।’

সাজেক রিসোর্ট-কটেজ মালিক সমিতির সাংগঠনিক সম্পাদক রাহুল চাকমা জন বলেন, ‘পর্যটকরা শুধু সকাল ১০টায় এবং বিকেল ৩টায় সাজেকে প্রবেশ ও বের হতে পারে। পর্যটকরা দীর্ঘ সময় আটকে থাকায় হতাশ হয়ে পড়েন। এ সমস্যা দূরীকরণে নিরাপত্তা স্কটের সংখ্যা বাড়াতে হবে।’

তিনি বলেন, ‘পাশাপাশি পর্যটক পরিবহনে চালকদের প্রশিক্ষণ, গাড়ির ফিটনেস পরীক্ষা ও নির্ধারিত গতিসীমা নিশ্চিত করতে হবে। পাহাড়ি সড়কে নিজস্ব গাড়ি চলাচলের ক্ষেত্রেও প্রয়োজনীয় বিধিনিষেধ কার্যকর করা জরুরি।’

রাহুল চাকমা জন আরও বলেন, ‘২০২৫ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি আমাদের অনেকগুলো কটেজ পুড়ে গেছে। এতে আমাদের অর্থনৈতিক ক্ষতির সম্মুখীন হতে হয়েছে। আমাদের যেকোনো সংকটে সরকারকে পাশে থাকতে হবে।’

তিনি বলেন, ‘সাজেকে পানির সংকট চরমে। ব্যবহার ও বিশুদ্ধ পানির ব্যবস্থা করতে হবে। স্থানীয়দের ভাগ্যোন্নয়নে কমিউনিটি ট্যুরিজমের ওপর গুরুত্ব দিতে হবে। প্রয়োজনে স্থানীয়দের প্রশিক্ষণ দিতে হবে। এছাড়াও বিদেশি পর্যটকদের ভ্রমণে সরকার সহজ পদ্ধতি অনুসরণ করলে দেশের বড় পর্যটন হাব হবে সাজেক।’

বাঘাইছড়ি প্রেস ক্লাবের সভাপতি আব্দুল মাবুদ বলেন, ‘সাজেকে পর্যটন খাতের উন্নয়নে বড় বাধা আঞ্চলিক দলগুলোর আধিপত্যের লড়াই ও সংঘাত। বছরের বিভিন্ন সময় সংঘাতের ঘটনা ঘটে। এসব ঘটনা গণমাধ্যমের প্রধান শিরোনাম হয়। সংঘাতের কারণে পর্যটকদের মধ্যেও উদ্বেগ তৈরি হয়।’

তিনি বলেন, ‘আঞ্চলিক সংগঠনগুলোর সংঘাত বন্ধ করা গেলে সাজেকের পর্যটন সম্ভাবনা আরও বিকশিত হবে। পাশাপাশি পুরো সাজেকে নিরাপত্তা জোরদারে প্রয়োজন নিরাপত্তা ক্যাম্প বাড়ানো। এতে পর্যটকদের আস্থা আরও বাড়বে।’

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, পর্যটকদের যাতায়াতে মাচালং সড়কটি সমীক্ষার মাধ্যমে উঁচু করা, পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা, স্থানীয় জনগোষ্ঠীকে পর্যটন ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত করে প্রশিক্ষণ ও কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি, পর্যটকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং যোগাযোগ ও পর্যটকসেবার সমন্বিত উন্নয়ন জরুরি।

আঞ্চলিক সশস্ত্র সংগঠনগুলোর সংঘাতের কারণে পর্যটনে যে বাধা তৈরি হচ্ছে, তা মোকাবিলায় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখার পাশাপাশি পর্যটকদের নিরাপদ চলাচলের জন্য প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা অবকাঠামো বাড়ানো, জরুরি চিকিৎসা ও উদ্ধারসেবা নিশ্চিত করা এবং সড়ক, পানি, পার্কিংসহ অন্যান্য পর্যটন সুবিধার উন্নয়ন করা গেলে সাজেকের পর্যটন সম্ভাবনা আরও বিকশিত হতে পারে।