জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে প্রাণী ও তাদের ওপর নির্ভরশীল বাস্তুতন্ত্রের টিকে থাকা নিয়ে উদ্বেগ বেড়েই চলেছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ক্রমবর্ধমান তাপমাত্রা, দীর্ঘস্থায়ী খরা, ভয়াবহ বন্যা, দাবানল ও বৃষ্টিপাতের ধরন পরিবর্তনের ফলে বন্যপ্রাণী থেকে শুরু করে গৃহপালিত ও খামারের প্রাণী নতুন নতুন ঝুঁকির মুখে পড়ছে।
প্রতি বছরের ন্যায় আজ রোববার (৪ অক্টোবর) বিশ্ব প্রাণী দিবস পালিত হচ্ছে। ২০২৬ সালের বিশ্ব প্রাণী দিবসের বার্তায় প্রাণীদের দৃষ্টিভঙ্গি থেকে পৃথিবীকে দেখার এবং মানুষের কর্মকাণ্ড প্রাণীদের জীবনে কী ধরনের প্রভাব ফেলছে, তা নতুন করে ভাবার আহ্বান জানানো হয়েছে।
আফ্রিকান ক্লাইমেট রিপোর্টার্সের যোগাযোগ ও কৌশল বিভাগের প্রধান ইব্রাহিমা ইয়াকুব এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলেন, জলবায়ু পরিবর্তন বন্যপ্রাণী ও গৃহপালিত প্রাণীর জন্যই ক্রমবর্ধমান গুরুতর হুমকি হয়ে উঠছে। তাপমাত্রা বৃদ্ধি, দীর্ঘস্থায়ী খরা, চরম বন্যা, দাবানল এবং বৃষ্টিপাতের ধরন পরিবর্তনের ফলে প্রাণীদের বেঁচে থাকা ক্রমেই কঠিন হয়ে পড়ছে।
ইব্রাহিমা ইয়াকুব বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব ইতোমধ্যে আফ্রিকার বিভিন্ন বাস্তুতন্ত্রের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করছে। অনেক বন্যপ্রাণী খাদ্য, পানি ও আশ্রয়ের জন্য বন, তৃণভূমি, জলাভূমি, নদীসহ বিভিন্ন প্রাকৃতিক বাস্তুতন্ত্রের ওপর নির্ভরশীল।
তিনি বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে এসব বাস্তুতন্ত্র ক্ষতিগ্রস্ত বা পরিবর্তিত হলে প্রাণীদের খাবার ও পানির সন্ধানে আরও দীর্ঘ দূরত্ব পাড়ি দিতে হচ্ছে। এতে তাদের সামনে নতুন নতুন ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে।
অতিরিক্ত তাপ, খরা ও বন্যার প্রভাব
ইয়াকুবের মতে, অতিরিক্ত তাপ প্রাণীদের মধ্যে হিট স্ট্রেস, পানিশূন্যতা এবং এমনকি মৃত্যুর কারণ হতে পারে। দীর্ঘস্থায়ী খরা উদ্ভিদ ও ঘাসের পরিমাণ কমিয়ে দেয় এবং প্রাণীদের জন্য প্রয়োজনীয় পানির উৎসও সংকুচিত করে।
অন্যদিকে বন্যা ও দাবানল প্রাণীদের প্রজননক্ষেত্র, বাসা ও প্রাকৃতিক আবাসস্থল ধ্বংস করতে পারে। ফলে ঝুঁকিপূর্ণ প্রজাতিগুলোর খাবার সংগ্রহ, প্রজনন এবং বেঁচে থাকার জন্য প্রয়োজনীয় জায়গা আরও কমে যায়।
জলবায়ু পরিবর্তন প্রাণীদের অভিবাসন, প্রজনন ও খাদ্য সংগ্রহের স্বাভাবিক ধরনেও পরিবর্তন আনছে বলে জানান ইয়াকুব। তাপমাত্রা ও ঋতুভিত্তিক পরিস্থিতির পরিবর্তনের কারণে কখন প্রাণীরা স্থানান্তরিত হবে, কখন প্রজনন করবে এবং কখন খাবারের সন্ধানে বের হবে-েএসব আচরণেও পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে।
তিনি সতর্ক করে বলেন, যেসব প্রজাতি এরই মধ্যে আবাসস্থল ধ্বংস, অবৈধ শিকার, দূষণ এবং অন্যান্য মানবসৃষ্ট কর্মকাণ্ডের কারণে হুমকির মুখে রয়েছে, জলবায়ু পরিবর্তন তাদের বিলুপ্তির আরও কাছাকাছি ঠেলে দিতে পারে।
গৃহপালিত ও খামারের প্রাণীও ঝুঁকিতে
জলবায়ু পরিবর্তনের হুমকি শুধু বন্যপ্রাণীর মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। গবাদিপশু ও অন্যান্য গৃহপালিত প্রাণীও ক্রমবর্ধমান তাপমাত্রা, পানির সংকট, চারণভূমি কমে যাওয়া এবং জলবায়ু-সংবেদনশীল রোগের কারণে ঝুঁকিতে পড়ছে।
ইয়াকুব বলেন, এসব প্রভাব এমন সব জনগোষ্ঠীর জীবিকাকেও হুমকির মুখে ফেলতে পারে, যারা খাদ্য ও আয়ের জন্য প্রাণীর ওপর নির্ভরশীল।
তিনি জলবায়ু ও পরিবেশবিষয়ক সাংবাদিকতা আরও শক্তিশালী করার আহ্বান জানান। তার মতে, জলবায়ু পরিবর্তন, প্রাণীর বেঁচে থাকা এবং বাস্তুতন্ত্র সংরক্ষণের মধ্যকার সম্পর্ক সম্পর্কে জনসচেতনতা বাড়াতে গণমাধ্যম গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
সাংবাদিকদের প্রাণীদের হারিয়ে যাওয়া আবাসস্থল, কমে যাওয়া পানির উৎস, বন্যপ্রাণীর আচরণে পরিবর্তন এবং অন্যান্য জলবায়ুজনিত হুমকি তুলে ধরার পাশাপাশি ঝুঁকিপূর্ণ প্রজাতি রক্ষায় কার্যকর সমাধানও সামনে আনা উচিত বলে মনে করেন তিনি।
সরকার, সংরক্ষণ সংস্থা, স্থানীয় জনগোষ্ঠী ও পরিবেশবাদী সংগঠনগুলোকে ক্ষতিগ্রস্ত বাস্তুতন্ত্র পুনরুদ্ধার, বন ও জলাভূমি সংরক্ষণ, পানি ব্যবস্থাপনা উন্নত করা এবং জলবায়ু পরিবর্তনে ভূমিকা রাখা কর্মকাণ্ড কমানোর প্রচেষ্টা আরও জোরদার করার আহ্বান জানিয়েছেন ইয়াকুব।
তিনি বলেন, প্রাণীদের জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব থেকে রক্ষা করার অর্থ তাদের আবাসস্থল ও বাস্তুতন্ত্র রক্ষা করা; একই সঙ্গে তা পৃথিবীতে জীবনের ভবিষ্যৎ রক্ষার সঙ্গেও সম্পর্কিত।
‘তাদের চোখে পৃথিবী দেখুন’
এদিকে ২০২৬ সালের বিশ্ব প্রাণী দিবসে বৈশ্বিক প্রাণী কল্যাণ সংস্থা ফোর পজ, ‘তাদের চোখে পৃথিবী দেখুন’ এই বার্তাকে সামনে এনেছে।
৪ অক্টোবর বিশ্ব প্রাণী দিবসকে সামনে রেখে সংস্থাটি মানুষকে প্রাণীদের দৃষ্টিকোণ থেকে পৃথিবীকে দেখার এবং মানুষের দৈনন্দিন সিদ্ধান্ত প্রাণীদের জীবনে কী প্রভাব ফেলছে, তা নতুন করে ভাবার আহ্বান জানিয়েছে।
দক্ষিণ আফ্রিকার প্রেক্ষাপটে এই বার্তা বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছে সংস্থাটি। দেশটির বিভিন্ন প্রাণী আশ্রয়কেন্দ্রে পরিত্যক্ত ও অবহেলিত পোষা প্রাণীর যত্ন নেওয়া হচ্ছে। একই সঙ্গে খামারের প্রাণীদের কল্যাণ এবং বন্যপ্রাণীর ওপর বিভিন্ন ধরনের চাপও দেশটির প্রাণী সুরক্ষার আলোচনার অংশ হয়ে আছে।
মানুষ ও প্রাণী পৃথিবীকে ভিন্নভাবে অনুভব করলেও প্রাণীরাও ব্যথা, ভয়, মানসিক চাপ এবং স্বস্তি অনুভব করতে পারে। তাই প্রাণী কল্যাণ শুধু প্রকাশ্য নিষ্ঠুরতা থেকে তাদের রক্ষা করার বিষয় নয়; তাদের সুস্থ ও পরিপূর্ণ জীবনযাপনের জন্য প্রয়োজনীয় পরিবেশ নিশ্চিত করাও এর অংশ।
প্রাণীর প্রয়োজন প্রজাতিভেদে ভিন্ন
একটি কুকুরের ক্ষেত্রে খাবার, নিরাপদ আশ্রয়, নিরাপত্তা, সঙ্গ এবং দায়িত্বশীল যত্ন নিশ্চিত করা প্রাণী কল্যাণের মৌলিক অংশ।
খামারের প্রাণীদের ক্ষেত্রে উপযুক্ত পরিবেশ, পর্যাপ্ত জায়গা, মানবিক আচরণ এবং স্বাভাবিক আচরণ প্রকাশের সুযোগ নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
বন্যপ্রাণীর প্রয়োজন আবার ভিন্ন। ফোর পজের মতে, বন্যপ্রাণীর কল্যাণ নিশ্চিত করতে তাদের শোষণ থেকে মুক্ত রাখা এবং স্বাভাবিক আচরণ অনুযায়ী জীবনযাপনের সুযোগ দেওয়া জরুরি।
অর্থাৎ, সব প্রাণীর জন্য ভালো যত্নের একই সংজ্ঞা প্রযোজ্য নয়। প্রাণীর ধরন ও জীবনযাপনের ওপর নির্ভর করে তাদের প্রয়োজনও ভিন্ন।
প্রাণী কল্যাণের শুরু বাড়ি থেকেই
মানুষের দৈনন্দিন জীবনে প্রাণী কল্যাণে অবদান রাখার অন্যতম সহজ জায়গা হলো পোষা প্রাণীর যত্ন।
ফোর পজের মতে, আশ্রয়কেন্দ্র থেকে প্রাণী দত্তক নেওয়ার মাধ্যমে একটি পরিত্যক্ত প্রাণীকে নিরাপদ ঘর দেওয়া সম্ভব। একই সঙ্গে পোষা প্রাণীর বন্ধ্যাকরণ করলে অনাকাঙ্ক্ষিত বংশবৃদ্ধি এবং পরিত্যক্ত প্রাণীর সংখ্যা কমাতে সহায়তা করতে পারে।
স্থানীয় প্রাণী কল্যাণ সংস্থাগুলোকে সহযোগিতাও একটি কার্যকর উদ্যোগ। অনুদান ও স্বেচ্ছাসেবী কাজের মাধ্যমে এসব সংগঠনকে সহায়তা করা যায়, যারা নিয়মিত অসহায় প্রাণীদের যত্ন নেয়।
এ ছাড়া ভোক্তাদের উদ্ভিদভিত্তিক পণ্য বিবেচনা করা এবং বিনোদনের জন্য বন্যপ্রাণীকে শোষণ করে এমন কর্মকাণ্ড এড়িয়ে চলার আহ্বান জানিয়েছে ফোর পজ।
পরিবারভেদে এসব সিদ্ধান্তের ধরন ভিন্ন হতে পারে। তবে এর মূল বিষয় এক—মানুষের সিদ্ধান্ত প্রাণীদের জীবনে প্রভাব ফেলে।
শুধু পোষা প্রাণী নয়
প্রাণী কল্যাণের বিষয়টি অনেক সময় বিড়াল ও কুকুরের মতো পোষা প্রাণীর মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে। কারণ আশ্রয়কেন্দ্র ও উদ্ধারকারী সংগঠনগুলো মানুষের কাছে দৃশ্যমান। তবে বিশ্ব প্রাণী দিবসের বার্তা এর চেয়ে অনেক বিস্তৃত।
খামারের প্রাণীরাও তাদের জীবনযাপন ও চিকিৎসার জন্য মানুষের ওপর নির্ভরশীল। ফোর পজের মতে, তাদের জন্য উপযুক্ত পরিবেশ, পর্যাপ্ত জায়গা, মানবিক আচরণ এবং স্বাভাবিক আচরণ প্রকাশের সুযোগ থাকা উচিত।
বন্যপ্রাণীর ক্ষেত্রে আবার শোষণ, বন্দিত্ব এবং প্রাকৃতিক আবাসস্থলের ওপর ক্রমবর্ধমান চাপসহ ভিন্ন ধরনের সমস্যা রয়েছে।
এই বিস্তৃত দৃষ্টিভঙ্গি গুরুত্বপূর্ণ। কারণ প্রাণী কল্যাণ শুধু মানুষের বাড়িতে থাকা প্রাণীদের বিষয় নয়। খাদ্য উৎপাদন, বিনোদন এবং বৃহত্তর পরিবেশে মানুষের কর্মকাণ্ডের কারণে যেসব প্রাণীর জীবন প্রভাবিত হয়, তাদের কল্যাণও এর অন্তর্ভুক্ত।
শিশুদেরও শেখাতে হবে প্রাণীর প্রতি সহমর্মিতা
প্রাণী কল্যাণ শিশুদের জীবন্ত প্রাণীর প্রতি সম্মান ও সহমর্মিতা শেখানোর একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হতে পারে।
ফোর পজ পরিবার ও সমাজকে শিশুদের প্রাণীর প্রতি সহমর্মিতা ও সম্মান শেখাতে উৎসাহিত করছে।
এই শিক্ষা দৈনন্দিন ছোট ছোট আচরণ থেকেই শুরু হতে পারে—প্রাণীর প্রয়োজন বোঝা, তারা কখন ভয় বা মানসিক চাপে রয়েছে তা শনাক্ত করা এবং দায়িত্বশীল আচরণ যে শুধু প্রাণীর সঙ্গ উপভোগ করার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, তা বোঝানো।
পোষা প্রাণী, খামারের প্রাণী বা বন্যপ্রাণীর কাছাকাছি বেড়ে ওঠা শিশুদের এসব প্রাথমিক শিক্ষা ভবিষ্যতে প্রাণীদের সম্পর্কে তাদের দৃষ্টিভঙ্গি গড়ে তুলতে ভূমিকা রাখতে পারে।
ছোট সিদ্ধান্তে বড় পরিবর্তন
বিশ্ব প্রাণী দিবস উপলক্ষে ফোর পজের আহ্বান মূলত বাস্তব ও দৈনন্দিন কর্মকাণ্ডকেন্দ্রিক।
দায়িত্বশীলভাবে প্রাণী দত্তক নেওয়া, পোষা প্রাণীর বন্ধ্যাকরণ করা, আশ্রয়কেন্দ্র ও প্রাণী কল্যাণ সংগঠনকে সহায়তা করা, উদ্ভিদভিত্তিক পণ্য বিবেচনা করা, বন্দি বন্যপ্রাণীর সঙ্গে বিনোদনমূলক কর্মকাণ্ড এড়িয়ে চলা এবং নৈতিক বন্যপ্রাণী অভিজ্ঞতা বেছে নেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
এসব উদ্যোগের কোনোটিই বাস্তবায়নের জন্য প্রাণী কল্যাণ বিষয়ে বিশেষজ্ঞ হওয়া প্রয়োজন নেই। মূল বিষয় হলো, সচেতনতা যেন মানুষের দৈনন্দিন সিদ্ধান্তে প্রভাব ফেলে- পরিবারের পরবর্তী পোষা প্রাণী কোথা থেকে নেওয়া হবে কিংবা বন্যপ্রাণীভিত্তিক বিনোদনে অংশ নেওয়া হবে কি না, সেই সিদ্ধান্তেও।
ফোর পজ দক্ষিণ আফ্রিকার পরিচালক ফিওনা মাইলসের মতে, প্রাণী কল্যাণের উন্নতি শুরু হয় প্রাণীদের শারীরিক, মানসিক ও আচরণগত প্রয়োজনকে স্বীকৃতি দেওয়ার মাধ্যমে।


