মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যের একটি বাজারে দেশটির সামরিক বাহিনীর বিমান হামলার তীব্র নিন্দা জানিয়েছেন জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনার ভলকার তুর্ক। সোমবার (২৮ সেপ্টেম্বর) কিয়াউকতাও শহরের ওই হামলায় ক্রেতা-বিক্রেতা, পরিবহনশ্রমিকসহ অন্তত ৫০ জন নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন আরও অন্তত ৫৮ জন।

মঙ্গলবার (২৯ সেপ্টেম্বর) জাতিসংঘের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত এক বিবৃতিতে এ হামলার নিন্দা জানান তুর্ক।

জাতিসংঘ জানিয়েছে, ২০২১ সালের ফেব্রুয়ারিতে মিয়ানমারে সামরিক অভ্যুত্থানের পর রাখাইনে চালানো সবচেয়ে প্রাণঘাতী হামলাগুলোর মধ্যে এটি অন্যতম। সোমবার দুপুরে ব্যস্ত সময়ে বাজারটিতে হামলা চালানো হয়। তখন সেখানে ২০০টির বেশি দোকান খোলা ছিল এবং বাজার ও আশপাশের এলাকায় বিপুলসংখ্যক মানুষ ছিলেন। নিহতদের মধ্যে নারী ও শিশুও রয়েছে। হতাহতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

বাজারটির দোকানগুলোতে রাখাইন, রোহিঙ্গা, হিন্দু ও দেইংনেটসহ বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মানুষ ব্যবসা করেন। বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মানুষ সেখানে কেনাকাটাও করেন।

হামলার নিন্দা জানিয়ে ভলকার তুর্ক বলেন, সর্বশেষ এই হামলা যুদ্ধে আন্তর্জাতিক মানবিক আইন মেনে চলার বিষয়ে গুরুতর উদ্বেগ তৈরি করেছে। সংঘাতে জড়িত পক্ষগুলোকে হামলার ক্ষেত্রে লক্ষ্যবস্তু নির্ধারণ, আনুপাতিকতা ও সতর্কতার নীতি মেনে চলতে হবে বলেও উল্লেখ করেন তিনি।

তুর্ক বলেন, এসব হামলা মিয়ানমারজুড়ে বেসামরিক মানুষের ভয়াবহ দুর্দশার চিত্র তুলে ধরছে। তবে রাখাইন রাজ্যের মানুষের পরিস্থিতি দেশটির অন্য যেকোনো এলাকার চেয়ে বেশি ভয়াবহ।

মিয়ানমারে দীর্ঘদিন ধরে চলা সহিংসতা ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের কথাও বিবৃতিতে তুলে ধরেন জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনার। তিনি বলেন, দেশটিতে গ্রেপ্তার, নির্যাতন, যৌন ও লিঙ্গভিত্তিক সহিংসতা, গুম, জোরপূর্বক শ্রম এবং জোর করে সেনাবাহিনীতে নিয়োগের মতো গুরুতর অভিযোগ রয়েছে।

এসব সহিংসতার প্রভাব বিশেষ করে রোহিঙ্গাদের ওপর পড়ছে বলে উল্লেখ করেন তিনি। মিয়ানমারের সামরিক বাহিনী ও আরাকান আর্মি-উভয় পক্ষের বিরুদ্ধেই মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ রয়েছে।

এদিকে মালয়েশিয়া মিয়ানমারের প্রায় পাঁচ হাজার নাগরিককে দেশে ফেরত পাঠানোর পরিকল্পনা বাস্তবায়ন শুরুর কয়েক ঘণ্টা আগে কিয়াউকতাওয়ে এই হামলা হয়। এর পরিপ্রেক্ষিতে মিয়ানমারে ফেরত পাঠানোর প্রক্রিয়া অবিলম্বে বন্ধ করতে মালয়েশিয়ার প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন তুর্ক।

তিনি বলেন, গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘন ও নির্যাতনে জর্জরিত একটি দেশে কাউকে জোর করে ফেরত পাঠানোর সময় এখন নয়। মিয়ানমারে ফিরে গেলে অনেকেই আবারও সহিংসতার শিকার হওয়ার বাস্তব ঝুঁকিতে পড়বেন।

আন্তর্জাতিক আইনের ‘নন-রিফাউলমেন্ট’ নীতি অনুযায়ী, কোনো ব্যক্তিকে এমন দেশে ফেরত পাঠানো যাবে না, যেখানে তিনি নিপীড়ন, নির্যাতন, গুরুতর ক্ষতি বা অন্য কোনো গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঝুঁকিতে রয়েছেন।

ভলকার তুর্ক বলেন, মিয়ানমারে ফিরে যাওয়া মানুষের জন্য কী অপেক্ষা করছে, তা নিয়ে খুব বেশি সন্দেহের অবকাশ নেই। দেশটির পরিস্থিতি নিরাপদ বা স্থিতিশীল-কোনোটিই নয়। এমন অবস্থায় কাউকে ফেরত পাঠানোর সিদ্ধান্তকে সত্যিকার অর্থে স্বেচ্ছায় নেওয়া সিদ্ধান্ত বলা যায় কি না, তা নিয়েও গুরুতর প্রশ্ন রয়েছে।

মিয়ানমার থেকে পালিয়ে যাওয়া মানুষদের আশ্রয় দেওয়া বাংলাদেশ ও মালয়েশিয়ার মতো দেশগুলোকে সহায়তায় অন্য দেশগুলোর এগিয়ে আসার আহ্বানও জানিয়েছেন তিনি।

তুর্ক বলেন, জীবনের ভয়ে মিয়ানমার থেকে পালিয়ে আসা লাখ লাখ মানুষকে সুরক্ষা দিতে হবে। আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী, বিদেশে আশ্রয় ও নিরাপত্তা চাওয়ার ক্ষেত্রে তাদের মৌলিক মানবাধিকার যথাযথভাবে বিবেচনা করা প্রয়োজন।