নিজ দেশে ফিরতে চান তারা। ফিরতে চান পরিচয়, নাগরিকত্ব, নিরাপত্তা ও মৌলিক অধিকার নিয়ে। কিন্তু সেই প্রত্যাবাসনের অপেক্ষা দীর্ঘ হচ্ছে বছরের পর বছর। কক্সবাজারের উখিয়া ও টেকনাফের আশ্রয়শিবিরে বসবাসরত রোহিঙ্গাদের কাছে তাই আগামী ১৯ নভেম্বর কেবল একটি আদালতের রায় ঘোষণার দিন নয়, বরং দীর্ঘদিনের বঞ্চনা, নিপীড়ন ও ন্যায়বিচারের প্রত্যাশার সঙ্গে জড়িয়ে থাকা একটি গুরুত্বপূর্ণ দিন।
মিয়ানমারের বিরুদ্ধে গণহত্যার অভিযোগে গাম্বিয়ার করা মামলায় আন্তর্জাতিক বিচার আদালতের (আইসিজে) রায় ঘোষণার তারিখ নির্ধারিত হওয়ার পর রোহিঙ্গা আশ্রয়শিবিরগুলোতে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। আদালতের সিদ্ধান্ত কী হবে, মিয়ানমারের ওপর এর প্রভাব কতটা পড়বে, আর সেই সিদ্ধান্তের মধ্য দিয়ে মাতৃভূমিতে ফেরার পথ কতটা সুগম হবে- এসব প্রশ্ন ঘুরছে বাংলাদেশের বিভিন্ন আশ্রয়শিবিরের বাসিন্দাদের মধ্যে।
রোহিঙ্গা নেতাদের প্রত্যাশা, আদালতের রায় তাদের ওপর সংঘটিত নির্যাতন, গণহত্যা ও নিপীড়নের আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি প্রতিষ্ঠায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। একই সঙ্গে মিয়ানমারের ওপর আন্তর্জাতিক চাপ বাড়বে এবং নিরাপদ, স্বেচ্ছামূলক ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসনের দাবির পক্ষে শক্তিশালী ভিত্তি তৈরি হবে।
উখিয়া ও টেকনাফের বিভিন্ন আশ্রয়শিবিরে আশ্রিত রোহিঙ্গাদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, রোহিঙ্গাদের কাছে প্রত্যাবাসন মানে শুধু সীমান্ত পেরিয়ে মিয়ানমারে ফিরে যাওয়া নয়। তারা চান, নিজেদের জন্মভূমিতে নাগরিক হিসেবে স্বীকৃতি, চলাফেরার স্বাধীনতা, শিক্ষা, চিকিৎসা, জীবিকার সুযোগ এবং নিরাপত্তার নিশ্চয়তা। এসব অধিকার নিশ্চিত না হলে ফিরে গিয়েও আবারও নিপীড়নের শিকার হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে তাদের।
রোহিঙ্গা নাগরিক সংগঠন ইউনাইটেড কাউন্সিল অব রোহিঙ্গার (ইউসিআর) প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি সৈয়দ উল্লাহ বলেন, প্রায় এক দশক ধরে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী ন্যায়বিচারের অপেক্ষায় রয়েছে। আইসিজের রায় ঘোষণার তারিখ নির্ধারিত হওয়ায় তাদের মধ্যে নতুন করে প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে।
তিনি বলেন, ‘আমরা আশা করি, আদালতের সিদ্ধান্ত রোহিঙ্গাদের ওপর সংঘটিত অপরাধের আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি নিশ্চিত করবে। একই সঙ্গে আমাদের মাতৃভূমিতে ফেরার দাবিকে আরও শক্তিশালী করবে। তবে রায় ঘোষণার পর সেটি বাস্তবায়নে রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক চ্যালেঞ্জ থাকবে।’
সৈয়দ উল্লাহর মতে, জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী সদস্যদের ভেটো ক্ষমতাসহ আন্তর্জাতিক রাজনীতির নানা সমীকরণ আদালতের সিদ্ধান্ত কার্যকর করার ক্ষেত্রে প্রভাব ফেলতে পারে। তারপরও রোহিঙ্গা সংকটের প্রতি আন্তর্জাতিক মনোযোগ ধরে রাখতে এ রায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে তিনি প্রত্যাশা করেন।

ইউসিআরের বর্তমান সভাপতি খিং মংয়ের কাছে জানতে চাওয়া হয় আইসিজের রায় ঘিরে রোহিঙ্গারা কি ভাবছে? উত্তরে প্রথমেই তিনি বাংলাদেশ সরকার ও সাধারণ মানুষের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানান। তার কণ্ঠেও একই প্রত্যশা।
তিনি প্রতিবেদককে বলেন, ‘বাংলাদেশের সরকার ও সাধারণ মানুষের মানবিকতায় কয়েক লাখ রোহিঙ্গার জীবন রক্ষা পেয়েছে। আমরা বাংলাদেশের কাছে আজীবন কৃতজ্ঞ থাকব, মিয়ানমার ফিরে গেলেও ঋণি হয়ে থাকতে হবে সারা জীবন। রোহিঙ্গারা থ্রিপলের নিচে চিরস্থায়ীভাবে থাকতে আসেনি। শিগগিরই নিজেদের মাতৃভূমিতে ফিরে যেতে চাই।’
আইসিজের রায় নিয়ে আশাবাদ ব্যক্ত করে খিং মং বলেন, ‘পৃথিবী যে সব দেশে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী রয়েছে সকলেই পুরোপুরি আশাবাদী, আদালত গাম্বিয়ার পক্ষে রায় দেবেন। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের মাধ্যমে আরাকানের (রাখাইন) নির্যাতিত মুসলিম জনগোষ্ঠীর জন্য ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা হবে বলে প্রত্যাশা করছি। যারা আরাকানে (রাখাইন) মুসলিমদের ওপর গণহত্যা, নির্যাতন ও নিপীড়ন চালিয়েছে এবং এখনো চালাচ্ছে তারা যেন বিচারের মুখোমুখি হয়- এটাই রোহিঙ্গাদের চাওয়া। আর নিজ মাতৃভূমিতে টেকসই প্রত্যাবাসন করা।’
টেকনাফের লেদা রোহিঙ্গা আশ্রয়শিবিরের ই-ব্লকের হেড মাঝি নবী হোসেনের কাছেও ১৯ নভেম্বরের রায় ঘিরে রয়েছে প্রত্যাশা ও আবেগ। তিনি বলছেন, ‘আন্তর্জাতিক আদালতের রায়ের দিকে পুরো রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী তাকিয়ে আছে। আমরা আশা করছি, এ রায় নির্যাতিত আরাকানবাসীর পক্ষে আসবে গাম্বিয়ার পক্ষে আসবে।’
নিজেদের বাস্তুচ্যুত জীবনের কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘রোহিঙ্গারা নিজ দেশে ফিরে যেতে বুক বেঁধে আন্তর্জাতিক মহলের দিকে তাকিয়ে আছেন। আমরা ত্রিপলের নিচে আর একটি মুহূর্তও থাকতে চাই না। নানা ষড়যন্ত্র, নির্যাতন, নিপীড়ন ও গণহত্যার মাধ্যমে আরাকানের মুসলিম রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর কয়েকটি প্রজন্মকে শেষ করে দেওয়া হয়েছে। আমরা চাই না, ভবিষ্যৎ প্রজন্মও এভাবে শেষ হয়ে যাক। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে আমাদের দাবি, রোহিঙ্গাদের নিজ দেশে ফেরার পরিবেশ তৈরি করে দিন। ফেরার মতো পরবেশ তৈরি হলে আমরা নিজেরাই আরাকানে ফিরে যাব।’
রায়কে কেন্দ্র করে প্রত্যাবাসনের প্রত্যাশা রোহিঙ্গাদের
২০১৭ সালে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে দেশটির সামরিক বাহিনীর দমন-পীড়ন, নির্যাতন ও গণহত্যার মুখে বাংলাদেশে পালিয়ে আসে সাত লাখের বেশি রোহিঙ্গা। এর আগে থেকেই বাংলাদেশে আশ্রিত রোহিঙ্গাদের নিয়ে বর্তমানে কক্সবাজারের উখিয়া ও টেকনাফ এবং নোয়াখালীর ভাসানচরে প্রায় ১৩ লাখের বেশি বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী বসবাস করছেন। দীর্ঘদিন ধরে তাদের প্রত্যাবাসনের উদ্যোগ নেওয়া হলেও নাগরিকত্ব, নিরাপত্তা ও অধিকার নানা বিষয় নিশ্চিত করার প্রশ্নে তা কার্যকর হয়নি।
এই পরিস্থিতিতে আন্তর্জাতিক বিচার আদালতের মামলাটি রোহিঙ্গাদের ন্যায়বিচারের দাবিতে গুরুত্বপূর্ণ একটি আন্তর্জাতিক প্রক্রিয়া হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
২০১৯ সালের ১১ নভেম্বর পশ্চিম আফ্রিকার দেশ গাম্বিয়া মিয়ানমারের বিরুদ্ধে আইসিজেতে গণহত্যার মামলা দায়ের করে। গাম্বিয়ার অভিযোগ, রাখাইন রাজ্যে রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে সংঘটিত কর্মকাণ্ড ১৯৪৮ সালের গণহত্যা সনদের লঙ্ঘন। মামলায় মিয়ানমারের আন্তর্জাতিক দায় নির্ধারণ, গণহত্যামূলক কর্মকাণ্ড বন্ধ, ক্ষতিগ্রস্তদের ক্ষতিপূরণ এবং ভবিষ্যতে এ ধরনের অপরাধ প্রতিরোধের নিশ্চয়তা চাওয়া হয়েছে।
২০২০ সালের ২৩ জানুয়ারি আদালত অন্তর্বর্তী আদেশে মিয়ানমারকে গণহত্যা সনদে উল্লেখিত কর্মকাণ্ড প্রতিরোধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে নির্দেশ দেন। একই সঙ্গে দেশটির সামরিক বাহিনীসহ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের গণহত্যামূলক কর্মকাণ্ড থেকে বিরত রাখা এবং মামলার সঙ্গে সম্পর্কিত প্রমাণ সংরক্ষণের নির্দেশ দেওয়া হয়।
পরবর্তী সময়ে মিয়ানমার আদালতের এখতিয়ার ও মামলার গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে আপত্তি জানালেও ২০২২ সালের ২২ জুলাই আইসিজে সেই আপত্তি খারিজ করে দেন। আদালত জানান, গণহত্যা সনদের নবম অনুচ্ছেদের ভিত্তিতে মামলাটি বিচার করার এখতিয়ার তাদের রয়েছে।
মামলাটিতে আন্তর্জাতিক সম্পৃক্ততাও বেড়েছে। কানাডা, ডেনমার্ক, ফ্রান্স, জার্মানি, নেদারল্যান্ডস, যুক্তরাজ্য, মালদ্বীপ, স্লোভেনিয়া, কঙ্গো গণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্র, বেলজিয়াম ও আয়ারল্যান্ডসহ ১১টি রাষ্ট্র মামলায় হস্তক্ষেপের উদ্যোগ নিয়েছে।
কূটনৈতিক চাপ বাড়ানোর দাবি
বাংলাদেশও রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসনকে সংকটের টেকসই সমাধান হিসেবে বিবেচনা করে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে কূটনৈতিক তৎপরতা চালিয়ে যাচ্ছে। গত ২৭ আগস্ট ২৩তম ওআইসি পররাষ্ট্রমন্ত্রী পরিষদ সম্মেলনের পার্শ্ববৈঠকে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির গাম্বিয়ার অ্যাটর্নি জেনারেল ও বিচারমন্ত্রী দাউদা এ জালোর সঙ্গে বৈঠক করেন।
বৈঠকে রোহিঙ্গা সংকট এবং আইসিজেতে চলমান গণহত্যা মামলার অগ্রগতি নিয়ে আলোচনা হয়। রোহিঙ্গাদের ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে গাম্বিয়ার ভূমিকার প্রশংসা করেন বাংলাদেশের পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী। পাশাপাশি মিয়ানমারে রোহিঙ্গাদের নিরাপদ, মর্যাদাপূর্ণ ও স্বেচ্ছামূলক প্রত্যাবাসন নিশ্চিত করতে সমন্বিত কূটনৈতিক উদ্যোগের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।
শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার (আরআরআরসি) মোহাম্মদ মিজানুর রহমান মনে করছেন, আইসিজের রায় রোহিঙ্গাদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ নৈতিক ও কূটনৈতিক তাৎপর্য বহন করবে। তার মতে, আদালতের সিদ্ধান্তের মাধ্যমে মিয়ানমারের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃতি পাওয়ার সুযোগ তৈরি হতে পারে।

তিনি বলেন, ‘যদি রায়ে স্বীকৃতি দেওয়া হয় যে রোহিঙ্গারা ঐতিহাসিকভাবে মিয়ানমারে বসবাস করে আসছেন অথবা তারা দেশটির নাগরিক, তাহলে মিয়ানমারের দীর্ঘদিনের এই দাবি যে রোহিঙ্গারা বহিরাগত- তার বিরুদ্ধে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ দলিল হয়ে উঠবে।’
তবে রায়ের পরপরই প্রত্যাবাসন শুরু হওয়ার সম্ভাবনা দেখছেন না তিনি। আরআরআরসি কমিশনার বলেন, ‘রায়ের সরাসরি ফল হিসেবে হয়তো তাৎক্ষণিকভাবে প্রত্যাবাসন শুরু হবে না। তবে এটি রোহিঙ্গাদের অবস্থানকে আরও শক্তিশালী করতে পারে এবং তাদের প্রত্যাবাসনের জন্য আন্তর্জাতিক চাপ বাড়াতে পারে।’
এদিকে রাখাইন রাজ্যে মিয়ানমারের জান্তা বাহিনী ও আরাকান আর্মির মধ্যে চলমান সংঘাতের কারণে প্রত্যাবাসনের পরিবেশ নিয়েও অনিশ্চয়তা রয়েছে। ফলে আদালতের রায় যাই হোক, বাস্তবে রোহিঙ্গাদের নিরাপদে ফিরিয়ে নেওয়ার জন্য রাজনৈতিক সমাধান, কার্যকর আন্তর্জাতিক উদ্যোগ এবং মিয়ানমারে তাদের অধিকার ও নিরাপত্তার নিশ্চয়তা জরুরি।
রোহিঙ্গাদের কাছে তাই ১৯ নভেম্বরের রায় কেবল আইনি লড়াইয়ের পরিণতি নয়; এটি প্রায় এক দশক ধরে বহন করে চলা অপেক্ষা, হারানো পরিচয় ফিরে পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা এবং পরবর্তী প্রজন্মের জন্য নিরাপদ ভবিষ্যতের স্বপ্নের সঙ্গে জড়িয়ে আছে। আদালতের সিদ্ধান্ত তাদের প্রত্যাবাসনের পথ কতটা এগিয়ে দেবে, তা সময়ই বলে দেবে। তবে আশ্রয়শিবিরের বাসিন্দাদের চাওয়া একটাই-আর শরণার্থী হিসেবে নয়, নিজ মাতৃভূমি মিয়ানমারের আরাকানের (রাখাইন) নাগরিকত্বের মর্যাদা নিয়ে ফিরতে চান তাঁরা।


