ভারতে স্বাধীনতা দিবসের দিন থেকে দেশে নতুন আন্দোলনের ডাক দিয়েছে ককরোচ জনতা পার্টি (সিজেপি)। আন্দোলনের নাম ‘স্কুল ঠিক করো’। দেশের গ্রাম–গঞ্জের সরকারি স্কুলগুলোর বেহাল অবস্থা ফেরাতে রাজ্যে রাজ্যে সিজেপি যে কর্মসূচি গ্রহণ করেছে, তাতে উজ্জীবিত হয়ে উঠেছে জেন–আলফাও।

সোমবার (১৭ আগস্ট) সকালে ‘ডিএমকে ডাকুন’, ‘মুখ্যমন্ত্রীকে ডাকুন’, ‘আমাদের দাবি পূরণ করতে হবে’—এমন স্লোগানে উত্তরপ্রদেশের লখনৌয়ের দুবাগ্গা-কানপুর বাইপাস সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করেছে একদল স্কুলছাত্রী। প্রবল বৃষ্টির মধ্যেও তারা লখনউয়ের পারা এলাকার স্কুল থেকে প্রায় আড়াই কিলোমিটার হেঁটে বিক্ষোভস্থলে পৌঁছায়। খবর দ্য প্রিন্টের।

শিক্ষার্থীরা নিজেদের এই আন্দোলনকে ‘জেন আলফা আন্দোলন’ হিসেবে অভিহিত করেছে। ২০১০ সাল থেকে ২০২০-এর দশকের মাঝামাঝি সময়ে জন্ম নেওয়া প্রজন্মকে সাধারণত ‘জেন আলফা’ বলা হয়। গত ২০ দিনে উত্তরপ্রদেশে এ ধরনের অন্তত ছয়টি ছাত্রবিক্ষোভের ঘটনা সামনে এসেছে।

লখনউয়ের উত্তরপ্রদেশ সরকারের পরিচালিত আবাসিক বিদ্যালয় জয়প্রকাশ নারায়ণ সর্বোদয় বিদ্যালয়ের ছাত্রীরা অভিযোগ করেছে, স্কুলে পর্যাপ্ত শিক্ষক নেই। বিশেষ করে পদার্থবিদ্যা ও রসায়নের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে শিক্ষক সংকট রয়েছে, যা বোর্ড পরীক্ষার প্রস্তুতিতে প্রভাব ফেলছে। নিম্নমানের খাবার, অসুস্থ হলে পর্যাপ্ত চিকিৎসা না পাওয়া এবং অন্যান্য মৌলিক সমস্যার কথাও জানিয়েছে তারা।

পুলিশ ও প্রশাসনের কর্মকর্তারা ঘটনাস্থলে গিয়ে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা বলেন এবং তাদের দাবিগুলো সরকারের কাছে পৌঁছে দেওয়ার আশ্বাস দেন। পরে ছাত্রীরা মুখ্যমন্ত্রীর বাসভবনের দিকে যাওয়ার চেষ্টা করলে বালাগঞ্জ মোড়ে তাদের আটকে দেওয়া হয়। কর্মকর্তাদের আশ্বাসের পর সকাল ১০টার দিকে তারা বিক্ষোভ শেষ করে। এরপর যান চলাচল স্বাভাবিক হয়।

তবে কয়েক দিন আগেও একই স্কুলের শিক্ষার্থীরা একই ধরনের অভিযোগে পারা এলাকায় বিক্ষোভ করেছিল। উত্তরপ্রদেশের সমাজকল্যাণমন্ত্রী অসীম অরুণ এবং বিভাগের পরিচালক অনুরাগ যাদব ঘটনাস্থলে গিয়ে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা বলে সমস্যা সমাধানের আশ্বাস দিয়েছিলেন। শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, সেই আশ্বাস বাস্তবায়িত না হওয়ায় ফের রাস্তায় নামতে বাধ্য হয়েছে তারা।

এদিকে ‘স্কুল ঠিক করো’ আন্দোলন শুরুর সময় সিজেপির আহ্বায়ক অভিজিৎ দিপকে এক ভিডিও প্রকাশ করেন। তাতে দেখা যায়, মহারাষ্ট্রে তার জেলা সদর ছত্রপতি শম্ভাজিনগরের প্রতিটি রাস্তা মুখ্যমন্ত্রী দেবেন্দ্র ফাডনবিশের বিজ্ঞাপনী হোর্ডিংয়ে বোঝাই।

অভিজিতের দাবি, আত্মপ্রচারে ওই অর্থহীন অপচয় না করে ওই টাকায় সরকারি স্কুলের অবকাঠামো ঠিক করা হোক। শিক্ষক নিয়োগ করা হোক। এই আন্দোলনই তেলাপোকারা এখন শুরু করেছে। উত্তর প্রদেশ, মহারাষ্ট্র, মধ্যপ্রদেশ, রাজস্থানসহ বিভিন্ন রাজ্যে আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ছে।

জেন–জিদের এই আন্দোলন ঠেকাতে রাজস্থান সরকার উঠেপড়ে লেগেছে। বিজেপিশাসিত এই রাজ্যের সরকার সম্প্রতি এক নির্দেশিকা জারি করেছে। তাতে বলা হয়েছে, কর্তৃপক্ষের অনুমতি ছাড়া কোনো সরকারি স্কুলে বহিরাগতরা ঢুকতে পারবে না। ছবি তুলতে বা ভিডিও করতে পারবে না। স্কুল নিয়ে কোনো রকম প্রচার করতে পারবে না। ছাত্র–ছাত্রীদের নিরাপত্তা ও ব্যক্তিগত পরিসর অক্ষুণ্ন রাখা সরকারের দায়িত্ব।

রাজস্থান সরকারের ওই নির্দেশিকা অন্যান্য রাজ্যেও বলবৎ হলে সিজেপি কী করবে, তা এখনো জানা যায়নি। যদিও সিজেপির মুখপাত্র আশুতোষ রাঙ্কা বলেছেন, স্কুল বন্ধ না করে রাজ্য সরকার বরং স্কুল মেরামতের দিকে নজর দিক। নইলে স্কুল পড়ুয়ারাই তাদের দুরবস্থার ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দেবে। তারাই জনমত গড়ে তুলবে।

লখনৌয়ে জেন–আলফা যা করেছে, রাজ্যের বিভিন্ন শহরে কয়েক দিন ধরে সরকারি স্কুলের পড়ুয়ারা তা করে চলেছে। রাজস্থানের সরকারি স্কুলের পড়ুয়ারাও তেমনই করবে বলে সিজেপির দাবি।

আজমগড়ে শিক্ষক সংকট নিয়ে বিক্ষোভ
মঙ্গলবার আজমগড়ের স্মিথ ইন্টার কলেজে প্রায় দুই ঘণ্টা অবস্থান বিক্ষোভ করেছে শিক্ষার্থীরা। পদার্থবিদ্যা, রসায়ন ও গণিতের জন্য নিয়মিত শিক্ষক নিয়োগের দাবি জানায় তারা।

শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, প্রায় ২৬ বছর ধরে স্কুলে নিয়মিত রসায়ন ও পদার্থবিদ্যার শিক্ষক নেই। এর ফলে তাদের পড়াশোনা ব্যাহত হচ্ছে এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।

মাদক বিক্রির অভিযোগে থানায় শিশুরা
এর এক দিন আগে মীরাটের সারধানায় ১২ ও ১৩ বছর বয়সী কয়েকজন শিশু স্থানীয় নারীদের সঙ্গে নিয়ে থানায় গিয়ে অভিযোগ জানায়, খেওয়ান এলাকায় প্রকাশ্যে মাদক বিক্রি হচ্ছে।

তাদের অভিযোগ, এলাকায় অবৈধ মদ, গাঁজা, সুলফাসহ বিভিন্ন নেশাজাতীয় দ্রব্য বিক্রি করা হচ্ছে। ‘আমাদের ভবিষ্যৎ রক্ষা করুন’ এবং ‘মাদকবিরোধী ব্যবস্থা নিন’—এমন বার্তা লেখা পোস্টার হাতে নিয়ে শিশুরা পুলিশের কাছে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানায়।

স্থানীয় বাসিন্দাদের দাবি, এর আগেও মাদক বিক্রির বিষয়ে অভিযোগ করা হয়েছিল, কিন্তু কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। পুলিশ অভিযোগ গুরুত্ব দিয়ে তদন্তের আশ্বাস দিয়েছে।

বেহাল রাস্তার প্রতিবাদে হামিরপুরে পড়ুয়ারা
১৪ আগস্ট হামিরপুরে আরও একটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা ঘটে। প্রথম থেকে দ্বাদশ শ্রেণির শিক্ষার্থীরা অভিভাবকদের সঙ্গে জাতীয় পতাকা হাতে জেলা কালেক্টরেটে পৌঁছায়। গ্রামের রাস্তার বেহাল দশার কারণে স্কুলে যেতে সমস্যার কথা জানায় তারা।

শিশুদের বক্তব্য, তারাও পড়াশোনা করে ভবিষ্যৎ গড়তে চায়। কিন্তু রাস্তার খারাপ অবস্থার কারণে স্কুলে পৌঁছানোই কঠিন হয়ে পড়েছে।

খাবারের মান নিয়ে কান্নৌজে বিক্ষোভ
১৩ আগস্ট কান্নৌজের জওহর নবোদয় বিদ্যালয়ের দশম, একাদশ ও দ্বাদশ শ্রেণির শিক্ষার্থীরা খাবারের মান নিয়ে প্রতিবাদ করে। তারা স্কুলের খাবার বয়কট করে এবং নিজেদের হোস্টেল কক্ষে অবস্থান নেয়।

শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, মেসে নিম্নমানের খাবার দেওয়া হচ্ছে। একাধিকবার অভিযোগ জানিয়েও কোনো ব্যবস্থা না নেওয়ায় ১২ আগস্ট সন্ধ্যা থেকে তারা মেসের খাবার খাওয়া বন্ধ করে দেয়।

জেন জি আন্দোলন থেকে অনুপ্রেরণা
উত্তরপ্রদেশে জেন আলফা শিক্ষার্থীদের এই প্রতিবাদের ধারা স্পষ্টভাবে দেখা দিতে শুরু করে ২৮ জুলাই থেকে। ফতেহপুরে স্কুলের মৌলিক সুযোগ-সুবিধার দাবিতে শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভ প্রশাসনের ওপর চাপ তৈরি করে এবং কর্তৃপক্ষ তাদের দাবির বিষয়ে পদক্ষেপ নিতে বাধ্য হয়।

এই আন্দোলনের নেতৃত্বে ছিল দ্বাদশ শ্রেণির ছাত্র অঙ্কুর সোনকর ও তার তিন সহপাঠী। তারা নয়াদিল্লির যন্তর মন্তরে জাতীয় যোগ্যতা ও প্রবেশিকা পরীক্ষা—স্নাতক বা এনইইটি-ইউজি প্রশ্নপত্র ফাঁসের প্রতিবাদে হওয়া আন্দোলনে অংশ নিয়েছিল। সেই অভিজ্ঞতা থেকেই নিজেদের স্কুলের দীর্ঘদিনের সমস্যাগুলো নিয়ে একই ধরনের আন্দোলনের উদ্যোগ নেয় তারা।

উত্তরপ্রদেশের শিক্ষাবিদ ও অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক এ কে তিওয়ারি বলেন, এসব ঘটনা শিক্ষার্থীদের নিজেদের দাবি তুলে ধরার পদ্ধতিতে বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে। আগে যেখানে তারা শ্রেণিকক্ষ, স্কুল কর্তৃপক্ষ বা অভিভাবকদের কাছে অভিযোগ জানাত, এখন তারা সরাসরি রাস্তায়, থানায় এবং সরকারি দপ্তরের সামনে গিয়ে প্রতিবাদ করছে।

তার মতে, এসব বিক্ষোভ প্রশাসনের কাছে আলাদা গুরুত্ব বহন করে। কারণ শিশুরা এমন বিষয় নিয়ে সরাসরি কথা বলছে, যেগুলো তাদের শিক্ষা, নিরাপত্তা, স্বাস্থ্য ও ভবিষ্যতের সঙ্গে সম্পর্কিত।

এ কে তিওয়ারির ভাষায়, রাস্তায় স্কুলপড়ুয়াদের অবস্থান, হাতে জাতীয় পতাকা নিয়ে সরকারি দপ্তরে যাওয়া কিংবা থানায় অভিযোগ জানানো হয়তো অস্বাভাবিক দৃশ্য। কিন্তু তাদের বার্তা স্পষ্ট—বড়রা বারবার অভিযোগ করেও যেসব সমস্যার সমাধান করতে পারেননি, সেগুলো সমাধানের জন্য শিশুরাই এখন সরাসরি প্রশাসনের দ্বারস্থ হচ্ছে।