মানবাধিকার সংগঠন ও জাতিসংঘের উদ্বেগের মধ্যেই মিয়ানমারের ১ হাজার ৪৭৬ জন নাগরিককে দেশে ফেরত পাঠানোর কার্যক্রম শুরু করেছে মালয়েশিয়া। মঙ্গলবার (২৯ সেপ্টেম্বর) শুরু হওয়া এই প্রত্যাবাসন কর্মসূচি দেশটির আটককেন্দ্রে থাকা মিয়ানমারের প্রায় পাঁচ হাজার নাগরিককে ফেরত পাঠানোর বৃহত্তর পরিকল্পনার প্রথম ধাপ।

মালয়েশিয়ার স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, মিয়ানমার সরকারের দেওয়া তালিকার ভিত্তিতে ১ হাজার ৪৭৬ জনকে মঙ্গলবার প্রথম ধাপে ফেরত পাঠানো হচ্ছে। দেশটির সরকারের দাবি, এসব ব্যক্তি স্বেচ্ছায় নিজ দেশে ফিরে যেতে সম্মত হয়েছেন।

তবে জাতিসংঘের শরণার্থীবিষয়ক সংস্থা ইউএনএইচসিআর বলছে, মিয়ানমারের বর্তমান পরিস্থিতি আশ্রয়প্রার্থীদের নিরাপদ ও টেকসই প্রত্যাবাসনের জন্য উপযোগী নয়। সংস্থাটি আরও জানিয়েছে, যাদের ফেরত পাঠানো হচ্ছে, তাদের শনাক্তকরণ প্রক্রিয়ায় তারা যুক্ত ছিল না।

মঙ্গলবার সকালে মালয়েশিয়ার পেরাক রাজ্যের লুমুত নৌঘাঁটির কাছে একটি স্টেডিয়ামে নিরাপত্তা বাহিনীর গাড়িবহরসহ কয়েক ডজন বাস দেখা যায়। পরে বাসগুলো বন্দরে নেওয়া হয়। সেখানে মিয়ানমারের নৌবাহিনীর দুটি জাহাজ ও একটি ভাসমান হাসপাতাল নোঙর করে ছিল।

এএফপির সাংবাদিকেরা জানান, মঙ্গলবার বিকেল পাঁচটার দিকে লুমুত নৌঘাঁটি থেকে মিয়ানমারের নৌবাহিনীর তিনটি জাহাজ ছেড়ে যায়। এগুলোর মধ্যে ছিল সহায়তা ও হাসপাতাল জাহাজ ‘থান লুইন’ এবং উভচর ল্যান্ডিং প্ল্যাটফর্ম ‘মোয়াত্তামা’। এর আগে মিয়ানমারের নাগরিকদের প্রত্যাবাসনেও এসব জাহাজ ব্যবহার করা হয়েছে।

মালয়েশিয়ার স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলেছে, দেশটিতে আশ্রয়প্রার্থীদের ‘পুরোনো সমস্যা’ সমাধানে সরকারের পরিকল্পনার অংশ হিসেবে এই প্রত্যাবাসন করা হচ্ছে। মন্ত্রণালয়ের দাবি, মালয়েশিয়ায় থাকা আশ্রয়প্রার্থীদের প্রায় ৯৫ শতাংশই মিয়ানমারের নাগরিক।

তবে প্রত্যাবাসনের প্রথম দলে কতজন রোহিঙ্গা রয়েছেন, তা মালয়েশিয়া বা মিয়ানমার আনুষ্ঠানিকভাবে জানায়নি। মালয়েশিয়ায় মিয়ানমারের প্রায় ১ লাখ ৯৩ হাজার আশ্রয়প্রার্থী রয়েছেন বলে ইউএনএইচসিআরের তথ্য। তাদের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ রোহিঙ্গা।

মালয়েশিয়ায় মিয়ানমারের চিন সম্প্রদায়ের আশ্রয়প্রার্থীদের প্রতিনিধি জেমস বাউই থাং বিক দাবি করেছেন, ফেরত পাঠানো ব্যক্তিদের মধ্যে কয়েকজন আশ্রয়প্রার্থী রয়েছেন। তাদের মধ্যে ইউএনএইচসিআরের কার্ডধারী একজনও আছেন বলে তিনি জানিয়েছেন। তার আশঙ্কা, দেশে ফেরার পর তাদের কেউ কেউ মিয়ানমারের সামরিক বাহিনীতে জোরপূর্বক নিয়োগ বা আটকের শিকার হতে পারেন।

২০২১ সালে সামরিক অভ্যুত্থানের পর থেকে মিয়ানমারে সশস্ত্র সংঘাত চলছে। দেশটির সামরিক বাহিনীর সঙ্গে সশস্ত্র গোষ্ঠীর লড়াইয়ের কারণে নিরাপত্তা পরিস্থিতির অবনতি হয়েছে।

জেনেভায় ইউএনএইচসিআরের মুখপাত্র ম্যাথিউ সল্টমার্শ বলেছেন, মিয়ানমার থেকে আসা প্রায় দেড় হাজার ব্যক্তিকে দেশে ফেরত পাঠানোর খবরে সংস্থাটি উদ্বিগ্ন। আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী, কোনো ব্যক্তিকে এমন দেশে ফেরত পাঠানো উচিত নয়, যেখানে তিনি নির্যাতন, নিপীড়ন, গুরুতর ক্ষতি কিংবা জীবন, স্বাধীনতা ও নিরাপত্তার হুমকির মুখে পড়তে পারেন।

মালয়েশিয়ায় সাম্প্রতিক বছরগুলোতে অভিবাসনবিষয়ক আইন প্রয়োগ আরও কঠোর হয়েছে। একই সঙ্গে মিয়ানমারের নাগরিকদের, বিশেষ করে রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে স্থানীয় পর্যায়ে বিদ্বেষ ও অনলাইনে ঘৃণামূলক বক্তব্য ছড়ানোর ঘটনাও বেড়েছে।

মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিম গত জুলাইয়ে জানিয়েছিলেন, মিয়ানমার সর্বোচ্চ পাঁচ হাজার রোহিঙ্গা আশ্রয়প্রার্থীকে ফেরত নিতে সম্মত হয়েছে। তবে মঙ্গলবার ফেরত পাঠানো প্রথম দলটিতে কতজন রোহিঙ্গা আছে, তা মালয়েশিয়া বা মিয়ানমার কোনো দেশই আনুষ্ঠানিকভাবে স্পষ্ট করেনি।