রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধে এবার পরোক্ষভাবে জড়িয়ে পড়লেন ভারতীয় শিল্পপতি লক্ষ্মী মিত্তল। ইউক্রেনের ক্রিভিই রিহ্ শহরে দেশটির অন্যতম বৃহৎ ইস্পাত কারখানা ‘আরকেলরমিত্তল’-এ ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে রাশিয়া। কারখানাটি ভারতীয় শিল্পপতি লক্ষ্মী মিত্তলের মালিকানাধীন।
স্থানীয় সময় রোববারের ওই হামলায় অন্তত দুজন নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন কারখানাটির ১০ শ্রমিক। হামলার পর কারখানাটির কার্যক্রম সাময়িকভাবে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। কারখানার ভেতরে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতিও হয়েছে বলে জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ।
ভারত ও রাশিয়ার মধ্যে দীর্ঘদিনের ঘনিষ্ঠ রাজনৈতিক ও কৌশলগত সম্পর্ক রয়েছে। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ও রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের ব্যক্তিগত সম্পর্কও দুই দেশের ঘনিষ্ঠতার অন্যতম প্রতীক হিসেবে বিবেচিত হয়। তবে ইউক্রেনে ভারতীয় মালিকানাধীন একটি গুরুত্বপূর্ণ শিল্পপ্রতিষ্ঠানে রুশ ক্ষেপণাস্ত্র হামলা সেই সম্পর্কের বাস্তব সীমাবদ্ধতাকেই সামনে নিয়ে এসেছে।
কারখানা কর্তৃপক্ষ ইউক্রেনের স্থানীয় সংবাদমাধ্যমকে জানিয়েছে, হামলায় শ্রমিকদের হতাহতের পাশাপাশি কারখানার বিভিন্ন স্থাপনায় ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। পরিস্থিতি বিবেচনায় হামলার পরপরই সেখানে উৎপাদন কার্যক্রম বন্ধ করে দেওয়া হয়।
ক্রিভিই রিহ্ ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কির জন্মস্থান হওয়ায় শহরটির ওপর রুশ হামলার রাজনৈতিক তাৎপর্যও রয়েছে। তবে কারখানাটি কেন হামলার লক্ষ্যবস্তু হয়েছে, সে বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য তাৎক্ষণিকভাবে পাওয়া যায়নি।
শুধু ক্রিভিই রিহ্ নয়, রোববার ইউক্রেনের দক্ষিণাঞ্চলীয় জাপোরিঝঝিয়াতেও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে রাশিয়া। ওই হামলায় আরও দুজন নিহত হয়েছেন।
পাল্টাপাল্টি হামলায় উত্তপ্ত যুদ্ধক্ষেত্র
সাম্প্রতিক কয়েক দিনে রাশিয়ার বিভিন্ন এলাকায় ব্যাপক ড্রোন হামলা চালিয়েছে ইউক্রেন। এর মধ্যে একটি বড় হামলায় রাশিয়ায় ছয়জন নিহত হয়েছেন। মস্কো অঞ্চলের গভর্নর জানিয়েছেন, সাম্প্রতিক সময়ে এটিই ছিল রাশিয়ার সবচেয়ে বড় ড্রোন হামলাগুলোর একটি।
এর পাল্টা জবাব হিসেবেই ইউক্রেনের বিভিন্ন এলাকায় রাশিয়া নতুন করে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
রাশিয়ার প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের দাবি, শনিবার রাতে তারা ইউক্রেনের ৮২২টি ড্রোন প্রতিহত করেছে। বিপুলসংখ্যক ড্রোন হামলার পর ইউক্রেনের গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো ও শিল্পাঞ্চলগুলোতে রুশ হামলার মাত্রা আরও বেড়েছে।
এরই ধারাবাহিকতায় ক্রিভিই রিহ্ শহরের আরকেলরমিত্তল কারখানায় হামলার ঘটনা ঘটল।
ভারতীয় শিল্পপতির মালিকানাধীন একটি গুরুত্বপূর্ণ শিল্পপ্রতিষ্ঠান যুদ্ধের সরাসরি ক্ষতির মুখে পড়ায় ঘটনাটি নয়াদিল্লির জন্যও অস্বস্তিকর। কারণ, একদিকে ভারত রাশিয়ার সঙ্গে ঐতিহাসিক ও কৌশলগত সম্পর্ক বজায় রেখে চলেছে, অন্যদিকে ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে সেই সম্পর্কের অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক ঝুঁকিও ক্রমেই স্পষ্ট হয়ে উঠছে।
লক্ষ্মী মিত্তলের মালিকানাধীন আরকেলরমিত্তল ইউক্রেনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ইস্পাত উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান। যুদ্ধের মধ্যে এর কার্যক্রম বারবার নিরাপত্তা ঝুঁকির মুখে পড়েছে।
ক্রিভিই রিহ্-তে সাম্প্রতিক রুশ ক্ষেপণাস্ত্র হামলা তাই শুধু ইউক্রেনের একটি শিল্পনগরীতে আরেকটি হামলা নয়। এটি একই সঙ্গে দেখিয়ে দিল—মস্কো ও নয়াদিল্লির রাজনৈতিক বন্ধুত্ব যতই ঘনিষ্ঠ হোক, ইউক্রেনের যুদ্ধক্ষেত্রে ভারতীয় স্বার্থও রুশ হামলার আওতার বাইরে নয়।
মোদি-পুতিনের ঘনিষ্ঠতার রাজনৈতিক উষ্ণতার বিপরীতে ইউক্রেনের মাটিতে ভারতীয় মালিকানাধীন কারখানায় ক্ষেপণাস্ত্র হামলা সেই সম্পর্কের বাস্তব সীমা নিয়ে নতুন প্রশ্নও তৈরি করেছে।


