সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিজ্ঞানী ড. মংসানু মারমার জমি এক বাঙালি ট্রাক ড্রাইভার কর্তৃক দখলের যে অভিযোগ ছড়িয়ে পড়েছে- তা সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন, বিভ্রান্তিকর এবং পরিকল্পিত অপপ্রচারের অংশ বলে দাবি করেছেন সংশ্লিষ্ট একটি পক্ষ। তাদের দাবি, সেপ্টেম্বর মাসকে সামনে রেখে পাহাড়ে পরিকল্পিতভাবে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি সৃষ্টি করার লক্ষ্যে অনলাইন প্ল্যাটফর্মে ড. মংসানু মারমা ও সস্মিত ত্রিপুরাসহ তাদের সহযোগীরা বিষয়টিকে জাতিগত সংঘাত বা জমি দখলের ঘটনা হিসেবে চিত্রায়িত করার অপচেষ্টা করছেন।

সংশ্লিষ্টদের দাবি, প্রকৃতপক্ষে এটি কোনো জমি দখলের ঘটনা নয়, বরং মাটি ভরাটের পাওনা টাকা পরিশোধ না করা কেন্দ্রিক একটি সাধারণ আর্থিক লেনদেনের বিরোধ। তাদের অভিযোগ, প্রকৃত ঘটনাকে আড়াল করে বিষয়টিকে জাতিগত রূপ দিয়ে বিভ্রান্তি ও বিদ্বেষ ছড়ানোর চেষ্টা করা হচ্ছে।

যুক্তরাষ্ট্রের ম্যাসাচুসেটসের বোস্টনে মিলটেনয় বায়োটেক প্রতিষ্ঠানে কর্মরত বিশিষ্ট বিজ্ঞানী এবং বাংলাদেশের জাতীয় মাছ ইলিশের জিন রহস্য উদঘাটনের অন্যতম প্রধান গবেষক ড. মংসানু মারমা ২০০৫ সালে খাগড়াছড়ি সদরের মহিলা কলেজ এলাকায় ৩০ শতাংশ জমি ক্রয় করেন বলে জানা গেছে। তিনি দীর্ঘ সময় বিদেশে অবস্থান করায় জমিটি দীর্ঘদিন পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে ছিল বলে সংশ্লিষ্টদের দাবি।

তাদের ভাষ্য, ড. মংসানু মারমার অনুপস্থিতির সুযোগ নিয়ে এবং পরবর্তীতে স্থানীয় কিছু স্বার্থান্বেষী ব্যক্তির ভুল তথ্যের ওপর ভিত্তি করে একটি অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়, যা পরবর্তীতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অতিরঞ্জিত করে প্রচার করা হচ্ছে।

ঘটনার প্রধান সূত্রপাত ২০২২ সালে বলে দাবি করা হয়েছে। ওই সময় ড. মংসানু মারমার খালাতো বোনের ছেলের বন্ধু অংকেচু মারমা উক্ত জমিতে নতুন একটি ব্যবসায়িক কার্যক্রম পরিচালনার পরিকল্পনা গ্রহণ করেন। জমিটি নিচু হওয়ায় তা মাটি দিয়ে ভরাট করার প্রয়োজন দেখা দেয়।

এ লক্ষ্যে অংকেচু মারমা স্থানীয় বাঙালি ট্রাক্টর ড্রাইভার মইনুল ইসলামের সঙ্গে মোট ৩ লাখ ৫০ হাজার টাকার একটি মৌখিক চুক্তিতে আবদ্ধ হন বলে সংশ্লিষ্টদের দাবি। চুক্তি অনুযায়ী মইনুল ইসলাম নিজ দায়িত্বে মাটি ভরাটের কাজ সম্পন্ন করেন। কাজ চলাকালীন অংকেচু মারমা তাকে দফায় দফায় মোট ২ লাখ ৬৫ হাজার টাকা পরিশোধ করেন।

তবে মাটি ভরাটের সম্পূর্ণ কাজ শেষ হওয়ার পর অংকেচু মারমা ব্যক্তিগত ও পারিবারিক নানা জটিলতার কারণে সেখানে ব্যবসায়িক কার্যক্রম পরিচালনা থেকে বিরত থাকেন বলে দাবি করা হয়েছে। একই সঙ্গে মাটি ভরাটের কাজের চুক্তি অনুযায়ী ট্রাক্টর ড্রাইভার মইনুল ইসলামের বাকি ৮৫ হাজার টাকা বকেয়া থেকে যায়।

সংশ্লিষ্টদের দাবি, ওই টাকা আর পরিশোধ করা হয়নি। ড্রাইভার মইনুল ইসলাম দীর্ঘদিন ধরে অংকেচু মারমার কাছে তার কষ্টার্জিত পাওনা টাকা দাবি করে আসছিলেন। কিন্তু বারবার তা এড়িয়ে যাওয়া এবং পাওনা টাকা পরিশোধে গড়িমসি করায় মইনুল ইসলাম নিজের মেহনতের টাকা আদায়ের লক্ষ্যে জমিটিতে গাড়ি রেখে সাময়িক বাধার সৃষ্টি করেন বলে দাবি করা হয়েছে।

সম্প্রতি ২-৩ মাস পূর্বে সদর উপজেলার ২নং কমলছড়ি ইউনিয়নের ভূয়াছড়ি এলাকার স্থায়ী বাসিন্দা মংশিতু মারমা ওই খালি জমিতে একটি নার্সারি গড়ে তোলার জন্য আমেরিকায় অবস্থানরত ড. মংসানু মারমার সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ করেন বলে সংশ্লিষ্টদের দাবি।

বিজ্ঞাপনী প্রস্তাবে ড. মংসানু মারমা সম্মতি প্রকাশ করেন এবং জমিতে কাজ শুরু করার আগে মাটি ভরাটসহ আনুষঙ্গিক অন্যান্য কাজের খরচ কত হতে পারে তা তাকে জানাতে বলেন বলে দাবি করা হয়েছে।

পরবর্তীতে মংশিতু মারমা জমিতে প্রাথমিক কাজ ও মাটি ভরাট করতে গেলে পূর্বের বকেয়া পাওনা টাকার দাবিতে ড্রাইভার মইনুল ইসলাম তাকে কাজে বাধা প্রদান করেন বলে সংশ্লিষ্টদের দাবি।

এই পরিস্থিতিতে মংশিতু মারমা কৌশলে প্রকৃত ঘটনা আড়াল করার সিদ্ধান্ত নেন বলে অভিযোগ করা হয়েছে। সংশ্লিষ্টদের দাবি, তিনি এক ব্যক্তির সহযোগিতায় ওই এলাকার একটি অস্পষ্ট ভিডিও ধারণ করেন, যাতে মনে হয় বাঙালি ট্রাক ড্রাইভার মইনুল ইসলাম জমিটি অবৈধভাবে নিজের দাবি করে দখল করে রেখেছেন।

ওই ভিডিওটি পরবর্তীতে প্রবাসে থাকা জমির মালিক ড. মংসানু মারমার কাছে পাঠিয়ে দেওয়া হয় বলে দাবি করা হয়েছে। সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, সাধারণ পাওনা আদায়ের একটি ঘটনাকে জমি দখলের ঘটনা হিসেবে উপস্থাপন করে প্রবাসী বিজ্ঞানীর মনে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করা হয়।

মংশিতু মারমার পাঠানো ভিডিওর ওপর বিশ্বাস স্থাপন করে প্রবাসে থাকা ড. মংসানু মারমা ক্ষুব্ধ হন বলে দাবি করা হয়েছে। তিনি প্রকৃত ঘটনার সত্যতা এবং এর পেছনের কারণ যাচাই না করেই ফেসবুক পোস্টে নিজের ক্ষোভ প্রকাশ করেন এবং অনুসারীদের কাছে পরামর্শ চান বলে সংশ্লিষ্টদের ভাষ্য।

সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, ড. মংসানু মারমার ওই পোস্টকে কাজে লাগিয়ে সস্মিত ত্রিপুরাসহ নির্দিষ্ট কিছু ব্যক্তি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিষয়টি ছড়িয়ে দেন। তাদের দাবি, উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে একজন খেটে খাওয়া বাঙালি ট্রাক ড্রাইভারের বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালিয়ে জাতিগত উস্কানি দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে।

ঘটনার সঙ্গে জড়িত মংশিতু মারমার অতীত রেকর্ড নিয়েও বিতর্ক রয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে। সংশ্লিষ্টদের ভাষ্য অনুযায়ী, পূর্বেও তিনি সদর উপজেলার কমলছড়ি ইউনিয়নের ভূয়াছড়ি এলাকায় জমি সংক্রান্ত স্পর্শকাতর বিষয় নিয়ে পার্বত্য অঞ্চলের সাধারণ জনগোষ্ঠী ও বাঙালিদের মধ্যে দাঙ্গা এবং সাম্প্রদায়িক অস্থিরতা সৃষ্টির উস্কানিমূলক কর্মকাণ্ডে সক্রিয়ভাবে জড়িত ছিলেন বলে জানা যায়।

তাদের আরও দাবি, এবারও তিনি সেই পুরোনো কৌশলে পাওনা টাকার একটি সাধারণ বিরোধকে ভিত্তিহীন জমি দখলের অভিযোগে রূপান্তরিত করে নিজের স্বার্থ হাসিল এবং এলাকায় নতুন করে উত্তেজনা সৃষ্টির অপচেষ্টা চালিয়েছেন।

তবে মংশিতু মারমার বিরুদ্ধে করা এসব অভিযোগের বিষয়ে তাঁর বক্তব্য বা স্বাধীনভাবে যাচাই করা প্রমাণ এই প্রতিবেদনের কাছে নেই।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া জমি দখলের অভিযোগের পেছনে কোনো বস্তুগত তথ্য-প্রমাণ বা আইনি সত্যতা পাওয়া যায়নি বলেও দাবি করেছেন সংশ্লিষ্টরা।

তাদের দাবি, অনুসন্ধানে দেখা গেছে, বর্ণিত বিতর্কিত জায়গাটি বর্তমানে সম্পূর্ণ ফাঁকা এবং পরিত্যক্ত অবস্থায় রয়েছে। ট্রাক্টর ড্রাইভার মইনুল ইসলাম কখনোই জমিটি স্থায়ীভাবে দখল করার কোনো চেষ্টা করেননি কিংবা জায়গাটি নিজের বলে দাবিও জানাননি।

তাদের ভাষ্য, মইনুল ইসলাম কেবল অংকেচু মারমার কাছে নিজের বকেয়া পাওনা টাকা পাওয়ার জন্য দাবি জানিয়ে আসছিলেন। পরবর্তীতে সেই ঘটনাকেই সম্পূর্ণ বিকৃত করে জমি দখলের তকমা দেওয়া হয়েছে।

সংশ্লিষ্টদের দাবি, অংকেচু মারমা কর্তৃক মাটি ভরাটের বকেয়া টাকা পরিশোধ না করা এবং মংশিতু মারমার কথিত চক্রান্তের কারণে একজন মেহনতি মানুষের পাওনা আদায়ের বিষয়টি শেষ পর্যন্ত জমি দখলের ঘটনায় রূপ দেওয়া হয়েছে।

তাদের আরও অভিযোগ, ড. মংসানু মারমা, সস্মিত ত্রিপুরা ও তাদের সহযোগীরা উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে তথ্য বিকৃত করে এই অপপ্রচার চালিয়ে আসছেন।

তবে এসব অভিযোগের স্বাধীন যাচাই প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। একই সঙ্গে পাহাড়ের সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বিনষ্ট হওয়ার আশঙ্কা এড়াতে একটি সাধারণ দেনা-পাওনার ঘটনাকে জাতিগত রূপ দেওয়ার আগে প্রকৃত ঘটনা নিরপেক্ষভাবে তদন্তের দাবি উঠেছে।