মূল্যস্ফীতির চাপ কমিয়ে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায় স্বস্তি ফিরিয়ে আনা, বিনিয়োগ ও ব্যবসা সম্প্রসারণের মাধ্যমে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির আওতা বাড়ানোর লক্ষ্য নিয়ে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার জাতীয় বাজেট প্রস্তাব করেছেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী।
বৃহস্পতিবার জাতীয় সংসদে উপস্থাপিত এই বাজেট দেশের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় বাজেট। ‘অর্থনৈতিক গণতান্ত্রিকীকরণ ও বিকেন্দ্রীকরণ: ট্রিলিয়ন ডলার অর্থনীতির পথে বাংলাদেশ’ প্রতিপাদ্যে প্রণীত বাজেটের আকার দেশের মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) ১৩ দশমিক ৭ শতাংশ। গত অর্থবছরের তুলনায় বাজেটের আকার বেড়েছে ১ লাখ ৪৮ হাজার কোটি টাকা।
এটি অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর প্রথম বাজেট এবং প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকারেরও প্রথম জাতীয় বাজেট। ফলে অর্থনৈতিক গুরুত্বের পাশাপাশি রাজনৈতিকভাবেও বাজেটটি বিশেষ তাৎপর্য বহন করছে।
প্রায় ২৩৪ পৃষ্ঠার বাজেট বক্তব্যে অর্থমন্ত্রী বলেন, দেশের বিদ্যমান অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ ও বৈশ্বিক অনিশ্চয়তার বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়েই এবারের বাজেট প্রণয়ন করা হয়েছে। তিনি জানান, স্থিতিশীলতা, বিনিয়োগ, উৎপাদন, কর্মসংস্থান ও ন্যায্যতাকে কেন্দ্র করে সরকারের সামষ্টিক অর্থনৈতিক কৌশল নির্ধারণ করা হয়েছে।
মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে সর্বোচ্চ গুরুত্ব
সরকার আগামী অর্থবছরে মূল্যস্ফীতি ৭ দশমিক ৫ শতাংশে নামিয়ে আনার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি, সরবরাহ ব্যবস্থার উন্নয়ন, বাজার তদারকি জোরদার এবং নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য সামাজিক সহায়তা কর্মসূচি সম্প্রসারণের মাধ্যমে এই লক্ষ্য অর্জনের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
এ ছাড়া জীবনরক্ষাকারী চিকিৎসাসামগ্রীসহ বিভিন্ন নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যে কর ও শুল্ক ছাড় দেওয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে, যাতে ভোক্তারা মূল্যস্ফীতির চাপ থেকে কিছুটা স্বস্তি পান।
বিনিয়োগ বাড়িয়ে কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্য
বাজেটে বিনিয়োগ ও ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ তৈরির ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। কর ও শুল্ক কাঠামো সহজীকরণ, সরকারি সেবার ডিজিটালাইজেশন, লাইসেন্স ও অনুমোদন প্রক্রিয়া সরলীকরণ এবং অনলাইনভিত্তিক সেবা সম্প্রসারণের পরিকল্পনা তুলে ধরা হয়েছে।
সরকারের আশা, এসব পদক্ষেপ দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকে উৎসাহিত করবে এবং নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি করবে। অর্থমন্ত্রীর বক্তব্যেও কর্মসংস্থানকে টেকসই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির অন্যতম প্রধান শর্ত হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
রাজস্ব আহরণে উচ্চাভিলাষী লক্ষ্য
আগামী অর্থবছরে মোট রাজস্ব আয়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) থেকে ৬ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকা এবং অন্যান্য উৎস থেকে ৯১ হাজার কোটি টাকা সংগ্রহের পরিকল্পনা রয়েছে।
করদাতাদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন হিসেবে সারা বছর আয়কর রিটার্ন জমা দেওয়ার সুযোগ রাখা হয়েছে। নির্ধারিত সময়ের আগেই রিটার্ন জমা দিলে কর ছাড়ের সুবিধাও দেওয়া হবে।
উন্নয়ন ও সামাজিক সুরক্ষায় বাড়তি বরাদ্দ
মোট উন্নয়ন ব্যয় ধরা হয়েছে ৩ লাখ ১৬ হাজার ৭৫ কোটি টাকা, যার মধ্যে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) জন্য বরাদ্দ রাখা হয়েছে ৩ লাখ কোটি টাকা। উন্নয়ন ব্যয়ের অংশ বাড়িয়ে ৩৩ দশমিক ৭০ শতাংশ এবং পরিচালন ব্যয়ের অংশ কমিয়ে ৬৬ দশমিক ৩০ শতাংশ করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।
সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির আওতা বাড়াতে ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ডসহ নতুন উদ্যোগ যুক্ত করা হয়েছে। পাশাপাশি স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও মানবসম্পদ উন্নয়ন খাতকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে।
ঘাটতি ২ লাখ ৪৩ হাজার কোটি টাকা
প্রস্তাবিত বাজেটে মোট ঘাটতি ধরা হয়েছে ২ লাখ ৪৩ হাজার কোটি টাকা, যা জিডিপির ৩ দশমিক ৬ শতাংশ। এই ঘাটতি পূরণে ১ লাখ ২৭ হাজার কোটি টাকা অভ্যন্তরীণ এবং ১ লাখ ১৬ হাজার কোটি টাকা বৈদেশিক উৎস থেকে সংগ্রহের পরিকল্পনা রয়েছে। ব্যাংকিং খাত থেকে ঋণ নেওয়ার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ১ লাখ ১২ হাজার কোটি টাকা।
‘জনগণের শক্তিই সবচেয়ে বড় সম্পদ’
বাজেট বক্তব্যের শেষাংশে অর্থমন্ত্রী দেশের কৃষক, শ্রমিক, উদ্যোক্তা, শিক্ষার্থী, নারী, তরুণ, পেশাজীবী ও প্রবাসীদের সহযোগিতা কামনা করেন। তিনি বলেন, জনগণের শক্তি, সৃজনশীলতা ও উদ্যোগই বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় সম্পদ। সেই শক্তিকে কাজে লাগিয়ে একটি স্বনির্ভর, মর্যাদাবান ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ে তোলাই সরকারের লক্ষ্য।
সংখ্যার বিচারে এটি দেশের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় বাজেট হলেও এর মূল বার্তা মানুষের জীবনযাত্রায় স্বস্তি ফিরিয়ে আনা, বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান বৃদ্ধি, ব্যবসা সহজ করা এবং উন্নয়নের সুফলকে আরও বিস্তৃত জনগোষ্ঠীর কাছে পৌঁছে দেওয়ার অঙ্গীকার। নতুন সরকারের প্রথম বাজেট হিসেবে এটি আগামী কয়েক বছরের অর্থনৈতিক পথচলার গুরুত্বপূর্ণ রূপরেখা হয়ে উঠতে পারে।


