বাংলাদেশের প্রথম প্রধানমন্ত্রী, মুক্তিযুদ্ধকালীন প্রবাসী সরকারের প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পালনকারী তাজউদ্দিন আহমদের ১০১তম জন্মদিন আজ। ১৯২৫ সালের ২৩ জুলাই গাজীপুর জেলার কাপাসিয়া উপজেলার দরদরিয়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন তিনি।
তাজউদ্দিন আহমদ ছিলেন একজন আইনজীবী, রাজনীতিক ও স্বাধীনতা সংগ্রামের অন্যতম সংগঠক। তার বাবা মৌলবী মুহাম্মদ ইয়াসিন খান এবং মা মেহেরুন্নেসা খানম।
ছাত্রজীবন থেকেই তিনি রাজনীতিতে সক্রিয় ছিলেন। ভাষা আন্দোলনের সময় সর্বদলীয় সংগ্রাম পরিষদের গুরুত্বপূর্ণ সদস্য হিসেবে তিনি আন্দোলনে অংশ নেন এবং কারাবরণ করেন।
১৯৫৪ সালে যুক্তফ্রন্টের প্রার্থী হিসেবে কাপাসিয়া থেকে পূর্ব পাকিস্তান প্রাদেশিক পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হন তাজউদ্দিন আহমদ। তিনি সেসময়ের মুসলিম লীগের সাধারণ সম্পাদক ফকির আবদুল মান্নানকে পরাজিত করেছিলেন। একই বছর তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। ১৯৫৫ সালে তিনি আওয়ামী লীগের সাংস্কৃতিক ও সমাজকল্যাণ সম্পাদক হন। ১৯৫৮ সালে সামরিক শাসন জারির পর আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধ হলে তাকে আবারও গ্রেপ্তার করা হয়।
১৯৬৪ সালে আওয়ামী লীগ পুনর্গঠনের পর তিনি দলের সাংগঠনিক সম্পাদক নির্বাচিত হন। ১৯৬৬ সালে তিনি দলটির সাধারণ সম্পাদক হন এবং ঐতিহাসিক ছয়দফা আন্দোলনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। ১৯৬৯ সালের গণআন্দোলনেও তিনি আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে নেতৃত্ব দেন। ১৯৭০ সালের সাধারণ নির্বাচনে তিনি আওয়ামী লীগের প্রার্থী হিসেবে জাতীয় পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হন।
১৯৭১ সালে পাকিস্তানি বাহিনীর গণহত্যা শুরুর পর তিনি ঢাকা ত্যাগ করে ভারতে যান। ১০ এপ্রিল প্রবাসী বাংলাদেশ সরকার গঠিত হলে তিনি প্রধানমন্ত্রী নিযুক্ত হন। মুক্তিযুদ্ধ পরিচালনা, মুক্তিবাহিনীর জন্য অস্ত্র সংগ্রহ এবং আন্তর্জাতিক সমর্থন আদায়ে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।
মুক্তিযুদ্ধে বিজয়ের পর ১৯৭১ সালের ২২ ডিসেম্বর তিনি দেশে ফিরে স্বাধীন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব গ্রহণ করেন। ১৯৭২ সালে নতুন মন্ত্রিসভায় তিনি প্রথমে অর্থমন্ত্রী এবং পরে অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন। বাংলাদেশের সংবিধান প্রণয়ন কমিটির সদস্য হিসেবেও তিনি গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখেন।
১৯৭৩ সালে তিনি ঢাকা-২২ আসন থেকে জাতীয় সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। তবে ১৯৭৪ সালে প্রধানমন্ত্রী শেখ মুজিবুর রহমানের নির্দেশে তিনি মন্ত্রিত্ব থেকে পদত্যাগ করেন।
১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সপরিবারে নিহত হওয়ার পর তাজউদ্দিন আহমদকে গৃহবন্দী করা হয়। পরে ২২ আগস্ট তাকে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে নেওয়া হয়। একই বছরের ৩ নভেম্বর কারাগারে বন্দি অবস্থায় জাতীয় চার নেতার সঙ্গে তাঁকেও নির্মমভাবে হত্যা করা হয়।
স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয়ে তাজউদ্দিন আহমদের অবদান ইতিহাসে স্মরণীয় হয়ে আছে। অসাম্প্রদায়িক ও প্রগতিশীল রাজনীতির ধারক এই নেতা বাঙালি জাতীয়তাবাদী আন্দোলন এবং মুক্তিযুদ্ধের সংগঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। তিনি ১৯৪২ সাল থেকে আজীবন বয়স্কাউট আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন এবং মানবসেবায় নিজেকে নিয়োজিত রাখেন।


