মহান মুক্তিযুদ্ধের সর্বাধিনায়ক, মুক্তিবাহিনীর প্রধান সেনাপতি এবং স্বাধীন বাংলাদেশের সামরিক ইতিহাসের অন্যতম প্রধান ব্যক্তিত্ব বঙ্গবীর জেনারেল মুহম্মদ আতাউল গণি ওসমানীর ১০৮তম জন্মবার্ষিকী আজ। ১৯১৮ সালের ১ সেপ্টেম্বর তৎকালীন সুনামগঞ্জে জন্মগ্রহণ করেন এই বীর সেনানায়ক। ১৯৮৪ সালের ১৬ ফেব্রুয়ারি লন্ডনে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি মৃত্যুবরণ করেন।

বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের নয় মাসে মুক্তিবাহিনীর সামরিক নেতৃত্বে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন জেনারেল ওসমানী। তার নেতৃত্ব ও সাংগঠনিক দক্ষতায় মুক্তিযুদ্ধের সামরিক কাঠামো সুসংগঠিত হয় এবং দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে যুদ্ধ পরিচালনা আরও কার্যকরভাবে এগিয়ে যায়।

১৯৭১ সালের ১১ এপ্রিল প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রে দেওয়া ভাষণে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর অবকাঠামো গঠনের কথা উল্লেখ করেন এবং এম এ জি ওসমানীকে মুক্তিবাহিনীর প্রধান সেনাপতি হিসেবে ঘোষণা দেন।

১৭ এপ্রিল মুজিবনগর সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে গঠিত হলে ওসমানী মুক্তিবাহিনীর সর্বাধিনায়কের দায়িত্ব পান। তার পরিকল্পনা ও নেতৃত্বে সমগ্র বাংলাদেশকে ১১টি সেক্টরে ভাগ করে মুক্তিযুদ্ধ পরিচালনা করা হয়। মুক্তিযুদ্ধের পুরো সময় তাঁর সামরিক অভিজ্ঞতা, শৃঙ্খলা ও সাংগঠনিক দক্ষতা মুক্তিবাহিনীকে ঐক্যবদ্ধ রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

১৬ ডিসেম্বর পাকিস্তানি বাহিনীর আত্মসমর্পণের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ চূড়ান্ত বিজয় অর্জন করে। স্বাধীনতার পর ২৬ ডিসেম্বর ওসমানীকে জেনারেল পদে উন্নীত করে স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম সেনাপ্রধান নিয়োগ দেওয়া হয়। ১৯৭২ সালের ১২ এপ্রিল তিনি সামরিক বাহিনী থেকে অবসর গ্রহণ করেন।

জেনারেল ওসমানীর পৈতৃক নিবাস ছিল সিলেটের বালাগঞ্জের দয়ামীর এলাকায়, যা বর্তমানে ওসমানীনগর নামে পরিচিত। তাঁর পিতা খান বাহাদুর মফিজুর রহমান ছিলেন সরকারি কর্মকর্তা এবং মা জোবেদা খাতুন।

সিলেট সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ে পড়াশোনা শেষে তিনি আলীগড় মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয়ে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করেন। শিক্ষাজীবন শেষে সামরিক পেশায় যোগ দেন। ব্রিটিশ-ভারতীয় সেনাবাহিনীতে কর্মজীবনের শুরু থেকেই তাঁর মেধা, শৃঙ্খলা, সাহস ও নেতৃত্বের পরিচয় পাওয়া যায়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় তিনি বার্মা রণাঙ্গনেও দায়িত্ব পালন করেন। পরবর্তীতে পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করে ১৯৬৭ সালে অবসর গ্রহণ করেন।

মুক্তিযুদ্ধের পর স্বাধীন বাংলাদেশের সামরিক বাহিনীর প্রাথমিক কাঠামো গড়ে তোলার ক্ষেত্রেও ওসমানী গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন। সেনাপ্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি তিনি নবগঠিত রাষ্ট্রের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ কর্মকাণ্ডেও যুক্ত ছিলেন।

পরবর্তীতে তিনি মন্ত্রিসভায় যোগ দেন এবং অভ্যন্তরীণ নৌ-যোগাযোগ, জাহাজ ও বিমান মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৭৫ সালে বাকশাল গঠনের প্রতিবাদে তিনি সংসদ সদস্য পদ থেকে পদত্যাগ করেন।

এরপর তিনি সক্রিয়ভাবে রাজনীতিতে যুক্ত হন। ১৯৭৬ সালে জাতীয় জনতা পার্টি গঠন করে এর সভাপতি হন। ১৯৭৮ ও ১৯৮১ সালের রাষ্ট্রপতি নির্বাচনেও তিনি প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন।

জেনারেল ওসমানী ছিলেন আজীবন অবিবাহিত। জীবনের শেষদিকে তিনি ক্যান্সারে আক্রান্ত হন। চিকিৎসাধীন অবস্থায় ১৯৮৪ সালের ১৬ ফেব্রুয়ারি লন্ডনে তাঁর মৃত্যু হয়। পরে সিলেটে হযরত শাহজালাল (রহ.)-এর মাজারসংলগ্ন গোরস্থানে তাঁকে সমাহিত করা হয়।

বাংলাদেশের স্বাধীনতার ইতিহাসে জেনারেল এম এ জি ওসমানীর নাম গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে উচ্চারিত হয়। তার স্মৃতিকে ধারণ করে সিলেটে ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর, ওসমানী মেডিকেল কলেজ, ওসমানী জাদুঘরসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও স্থাপনা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।