চট্টগ্রামের পতেঙ্গায় লালদিয়ার চরে বিদেশি বিনিয়োগে দেশের প্রথম কনটেইনার টার্মিনালের নির্মাণকাজ আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয়েছে। রোববার (৩০ আগস্ট) সকালে লালদিয়া কনটেইনার টার্মিনালের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী।
ডেনমার্কভিত্তিক মায়ের্সক গ্রুপের প্রতিষ্ঠান এপিএম টার্মিনালস প্রকল্পটিতে ৭৬ কোটি মার্কিন ডলার বিনিয়োগ করছে। বর্তমান বিনিময় হার অনুযায়ী বাংলাদেশি মুদ্রায় এর পরিমাণ প্রায় ৯ হাজার ৩৪৮ কোটি টাকা।
অনুষ্ঠানে আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, সরকারের এক ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতির লক্ষ্যে লালদিয়া টার্মিনাল নির্মাণ একটি বড় মাইলফলক। চট্টগ্রামকে শুধু বাংলাদেশের নয়, পুরো অঞ্চলের একটি গুরুত্বপূর্ণ লজিস্টিক হাব হিসেবে গড়ে তোলার পরিকল্পনার কথাও জানান তিনি।
গত বছরের ১৭ নভেম্বর চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের সঙ্গে এপিএম টার্মিনালসের এ বিষয়ে চুক্তি হয়। চুক্তি অনুযায়ী, চলতি বছরের ২২ এপ্রিল লালদিয়ার ৪৯ দশমিক ১৫ একর জমি এপিএম টার্মিনালসকে বুঝিয়ে দেয় বন্দর কর্তৃপক্ষ।
সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্বের (পিপিপি) আওতায় ২০২৯ সালের শেষ নাগাদ টার্মিনালের নির্মাণকাজ শেষ করার লক্ষ্য রয়েছে। ২০৩০ সালে এটি চালু হওয়ার কথা। চালুর পর ৩০ বছর টার্মিনালটি পরিচালনা করবে এপিএম টার্মিনালস। চুক্তির শর্ত পূরণ সাপেক্ষে মেয়াদ আরও ১৫ বছর বাড়ানোর সুযোগ রয়েছে। প্রকল্পে স্থানীয় অংশীদার হিসেবে রয়েছে কিউএনএস কনটেইনার সার্ভিসেস লিমিটেড।
বাড়ছে বিনিয়োগ, সক্ষমতাও
চুক্তির সময় প্রকল্পটিতে ৫৫ কোটি ডলারের বেশি বিনিয়োগের কথা জানিয়েছিল এপিএম টার্মিনালস। এখন সেই বিনিয়োগ বেড়ে ৭৬ কোটি ডলারে দাঁড়িয়েছে।
প্রায় ৬১৩ মিটার দীর্ঘ এই টার্মিনালে সাতটি আধুনিক গ্যান্ট্রি ক্রেনসহ প্রায় ৮০ ধরনের যন্ত্রপাতি স্থাপন করা হবে। এসব যন্ত্রপাতির বড় অংশ বিদ্যুৎচালিত করার পরিকল্পনা রয়েছে।
হামবুর্গ পোর্ট কনসাল্টিংয়ের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে চট্টগ্রাম বন্দরের চারটি কনটেইনার টার্মিনালে বছরে প্রায় ৩৫ লাখ একক কনটেইনার ওঠানো-নামানোর সক্ষমতা রয়েছে। লালদিয়া চালু হলে এর সঙ্গে আরও প্রায় ৯ লাখ একক কনটেইনারের সক্ষমতা যুক্ত হবে। ফলে বন্দরের মোট বার্ষিক সক্ষমতা প্রায় ৪৪ লাখ একক কনটেইনারে উন্নীত হবে।
বড় জাহাজ ভেড়ানোর সুবিধা
লালদিয়া টার্মিনালের অন্যতম বড় সুবিধা এর ভৌগোলিক অবস্থান। সাগর থেকে কর্ণফুলী নদী দিয়ে চট্টগ্রাম বন্দরের মূল টার্মিনালে যেতে জাহাজকে কয়েকটি বাঁক অতিক্রম করতে হয়। এর মধ্যে গুপ্ত বাঁককে সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। লালদিয়া এই বাঁকের আগেই, সাগর থেকে প্রায় ছয় কিলোমিটার দূরে অবস্থিত।
বর্তমানে চট্টগ্রাম বন্দরের মূল টার্মিনালগুলোতে সর্বোচ্চ প্রায় ৯ দশমিক ৫ মিটার ড্রাফট এবং ২ হাজার ৮০০ একক কনটেইনার ধারণক্ষমতার জাহাজ ভেড়ানো যায়। এপিএম টার্মিনালসের তথ্য অনুযায়ী, লালদিয়ায় প্রায় ১০ দশমিক ৫ মিটার ড্রাফটের এবং প্রায় ৬ হাজার একক কনটেইনার ধারণক্ষমতার জাহাজ ভেড়ানো সম্ভব হবে।
৬১৩ মিটার দীর্ঘ জেটিতে একসঙ্গে তিনটি তুলনামূলক ছোট জাহাজ অথবা দুটি বড় জাহাজ ভেড়ানোর সুবিধা থাকবে। প্রকল্পসংশ্লিষ্টরা বলছেন, নৌপথের অবস্থানের কারণে রাতেও জাহাজ চলাচলের সুবিধা বাড়বে।
রাজস্ব পাবে চট্টগ্রাম বন্দর
লালদিয়া টার্মিনাল নির্মাণে সরাসরি অর্থ বিনিয়োগ করতে হচ্ছে না চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষকে। বরং টার্মিনাল পরিচালনা থেকে চুক্তি অনুযায়ী রাজস্ব পাবে বন্দর।
চুক্তি অনুযায়ী, বছরে প্রথম ৮ লাখ একক কনটেইনার ওঠানো-নামানোর জন্য প্রতিটি কনটেইনারে ২১ ডলার করে পাবে বন্দর কর্তৃপক্ষ। ৮ লাখের বেশি থেকে ৯ লাখ পর্যন্ত প্রতিটি কনটেইনারের জন্য পাবে ২৩ ডলার। এ ছাড়া টার্মিনাল চালুর আগে এককালীন ফি হিসেবে বন্দর কর্তৃপক্ষকে ২৫০ কোটি টাকা দেওয়ার কথা রয়েছে।
তবে বন্দর ব্যবহারকারীরা আর্থিক আয়ের চেয়ে সেবার মান ও প্রতিযোগিতা তৈরির বিষয়টিকে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে দেখছেন। চট্টগ্রাম চেম্বারের সভাপতি আমিরুল হক বলেন, বিশ্বখ্যাত একটি প্রতিষ্ঠান টার্মিনাল পরিচালনায় যুক্ত হলে বন্দরের সেবায় প্রতিযোগিতা তৈরি হবে এবং সেবার মান বাড়ার সুযোগ তৈরি হবে।
বৈশ্বিকভাবে বড় অপারেটর এপিএম টার্মিনালস
কনটেইনার পরিচালনার দিক থেকে বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ প্রতিষ্ঠান এপিএম টার্মিনালস। লয়েডস লিস্টের ২০২৫ সালের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে প্রতিষ্ঠানটি বিশ্বজুড়ে ৫ কোটি ৩২ লাখ একক কনটেইনার ওঠানো-নামানো করেছে, যা বৈশ্বিক কনটেইনার পরিবহনের প্রায় ৫ দশমিক ৭ শতাংশ।
এপিএম টার্মিনালসের মূল প্রতিষ্ঠান মায়ের্সক বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ কনটেইনার শিপিং কোম্পানি। আলফালাইনারের তথ্য অনুযায়ী, মায়ের্সকের বহরে প্রায় ৭৫০টি কনটেইনার জাহাজ রয়েছে।
বিদেশি বিনিয়োগে নতুন দৃষ্টান্ত
বাংলাদেশে কনটেইনার টার্মিনাল পরিচালনায় বিদেশি প্রতিষ্ঠান আগে থেকেই যুক্ত রয়েছে। সৌদি আরবভিত্তিক রেড সি গেটওয়ে টার্মিনাল ইন্টারন্যাশনাল ২০২৪ সাল থেকে পতেঙ্গা কনটেইনার টার্মিনাল পরিচালনা করছে। তবে ওই টার্মিনাল নির্মাণ করেছিল চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ।
লালদিয়া প্রকল্পটি এ ক্ষেত্রে আলাদা। বন্দর কর্তৃপক্ষের দেওয়া জমিতে বিদেশি বিনিয়োগে অবকাঠামো নির্মাণ, আধুনিক যন্ত্রপাতি স্থাপন, টার্মিনাল চালু এবং দীর্ঘমেয়াদে পরিচালনা—সব দায়িত্বই পালন করবে এপিএম টার্মিনালস।
ফলে লালদিয়া কনটেইনার টার্মিনালকে বাংলাদেশে বিদেশি বিনিয়োগে নতুন কনটেইনার টার্মিনাল নির্মাণের প্রথম বড় দৃষ্টান্ত হিসেবে দেখা হচ্ছে।


