প্রয়াত সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও সাবেক বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার ৮২তম জন্মদিন আজ শনিবার (১৫ আগস্ট)। ১৯৪৫ সালের ১৫ আগস্ট দিনাজপুরে জন্ম নেওয়া খালেদা জিয়া বাংলাদেশের রাজনীতিতে দীর্ঘ চার দশকেরও বেশি সময় ধরে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন। স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন, গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের সংগ্রাম, রাজপথের আন্দোলন এবং রাষ্ট্র পরিচালনা—সব মিলিয়ে দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে তাঁর রয়েছে একটি দীর্ঘ ও ঘটনাবহুল অধ্যায়।

দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে তিনি তিন দফায় বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন। ছিলেন দেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী এবং মুসলিম বিশ্বের দ্বিতীয় নারী সরকারপ্রধান হিসেবে পরিচিত। ১৯৯০-এর স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে তাঁর নেতৃত্ব তাঁকে ‘আপসহীন নেত্রী’ হিসেবে ব্যাপক পরিচিতি এনে দেয়।

গৃহবধূ থেকে রাজনীতির শীর্ষে

বেগম খালেদা জিয়ার রাজনীতিতে সরাসরি প্রবেশ ঘটে ১৯৮১ সালের ৩০ মে স্বামী ও তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান নিহত হওয়ার পর। দেশের রাজনীতিতে তখন গভীর অনিশ্চয়তা। সেই সংকটময় সময়ে বিএনপির নেতাকর্মীদের আহ্বানে ১৯৮২ সালের ২ জানুয়ারি তিনি দলের প্রাথমিক সদস্য হিসেবে রাজনীতিতে যোগ দেন। অল্প সময়ের মধ্যেই দলের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে উঠে আসেন এবং ১৯৮৪ সালে বিএনপির চেয়ারপারসন নির্বাচিত হন।

এর আগে তাঁর রাজনৈতিক পরিচয় ছিল না। কিন্তু স্বামীর মৃত্যুর পর দল ও দেশের রাজনৈতিক সংকট তাঁকে রাজনীতির ময়দানে নিয়ে আসে। সেখান থেকেই শুরু হয় তাঁর দীর্ঘ রাজনৈতিক পথচলা।

এরশাদবিরোধী আন্দোলনে আপসহীন নেতৃত্ব

১৯৮২ সালের ২৪ মার্চ তৎকালীন সেনাপ্রধান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করার পর দেশে সামরিক শাসন জারি হয়। বিএনপির নেতৃত্ব গ্রহণের পর খালেদা জিয়া সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে আন্দোলনে সক্রিয় হয়ে ওঠেন।

১৯৮৩ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর দলীয় কার্যালয়ের সামনে এক জনসভায় প্রথমবারের মতো বড় পরিসরে জনসমক্ষে আসেন তিনি। একই বছরের ২৮ অক্টোবর সচিবালয় ঘেরাও কর্মসূচিতেও নেতৃত্ব দেন। আন্দোলন দমনে তাঁকে গৃহবন্দী করা হয়।

পরবর্তী বছরগুলোতে সাত-দলীয় জোটের নেতৃত্বে এরশাদবিরোধী আন্দোলন আরও জোরদার হয়। হরতাল, ঘেরাও, গণপ্রতিরোধসহ বিভিন্ন কর্মসূচিতে তিনি সরাসরি নেতৃত্ব দেন। বারবার গ্রেপ্তার ও গৃহবন্দিত্বের মধ্যেও আন্দোলন থেকে সরে দাঁড়াননি।

১৯৮৬ সালের নির্বাচন বিএনপির নেতৃত্বাধীন জোট বর্জন করে। নির্বাচনের আগে খালেদা জিয়াকে আবারও গৃহবন্দী করা হয়। এরশাদবিরোধী আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় ১৯৯০ সালের গণআন্দোলন চূড়ান্ত রূপ নেয়। ৬ ডিসেম্বর এরশাদের পতনের মধ্য দিয়ে সামরিক শাসনের অবসান ঘটে। এই আন্দোলনেই খালেদা জিয়া ‘আপসহীন নেত্রী’ হিসেবে রাজনৈতিকভাবে প্রতিষ্ঠিত হন।

বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী

এরশাদের পতনের পর বিচারপতি শাহাবুদ্দিন আহমেদের নেতৃত্বে তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠিত হয়। ১৯৯১ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি সংখ্যাগরিষ্ঠ দল হিসেবে আবির্ভূত হয়। এরপর ২০ মার্চ খালেদা জিয়া প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। তিনি বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হন।

তাঁর নেতৃত্বাধীন সরকার বাংলাদেশের শাসনব্যবস্থায় একটি বড় পরিবর্তন আনে। দ্বাদশ সংবিধান সংশোধনীর মাধ্যমে রাষ্ট্রপতিশাসিত ব্যবস্থা থেকে সংসদীয় সরকারব্যবস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হয়।

১৯৯১ সালের সরকারের সময় অর্থনৈতিক সংস্কার, শিক্ষা খাতে বিভিন্ন উদ্যোগ, বাধ্যতামূলক প্রাথমিক শিক্ষা এবং নারী শিক্ষার প্রসারে পদক্ষেপ নেওয়া হয়। বিশেষ করে মেয়েদের শিক্ষায় অংশগ্রহণ বাড়াতে নেওয়া বিভিন্ন উদ্যোগ তাঁর সরকারের অন্যতম আলোচিত কর্মসূচি হয়ে ওঠে।

১৯৯৬: স্বল্পস্থায়ী সরকার ও ক্ষমতার পালাবদল

১৯৯৬ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা নিয়ে রাজনৈতিক সংকট তৈরি হয়। বিরোধী দলগুলোর দাবির মুখে ১৫ ফেব্রুয়ারি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। প্রধান বিরোধী দলগুলো সেই নির্বাচন বর্জন করে। নির্বাচনের পর খালেদা জিয়া সরকার গঠন করলেও রাজনৈতিক সংকটের কারণে সেই সরকার বেশিদিন স্থায়ী হয়নি।

পরবর্তীতে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে ১২ জুন নতুন নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। ওই নির্বাচনে আওয়ামী লীগ জয়ী হলে খালেদা জিয়া বিরোধীদলীয় নেতার দায়িত্ব গ্রহণ করেন। ১৯৯৬ থেকে ২০০১ সাল পর্যন্ত তিনি সংসদে বিরোধীদলীয় নেতার ভূমিকা পালন করেন।

২০০১-২০০৬: আবারও প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্বে

২০০১ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোট বিজয়ী হলে খালেদা জিয়া দ্বিতীয়বারের মতো নির্বাচিত সরকারপ্রধান হন। ২০০১ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত তিনি সরকার পরিচালনা করেন। এই মেয়াদ শেষে ২০০৬ সালের ২৯ অক্টোবর সাংবিধানিক প্রক্রিয়ায় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করেন।

এরপর দেশে তীব্র রাজনৈতিক সংকট তৈরি হয়। ২০০৭ সালের ১১ জানুয়ারি জরুরি অবস্থা জারি হয়, যা বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে ‘১/১১’ নামে পরিচিত। সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রায় দুই বছর দেশ পরিচালনা করে।

কারাবন্দিত্ব ও দীর্ঘ রাজনৈতিক প্রতিকূলতা

২০০৭ সালের ৩ সেপ্টেম্বর খালেদা জিয়াকে গ্রেপ্তার করা হয়। পরের বছর সেপ্টেম্বর পর্যন্ত তিনি কারাগারে ছিলেন। পরবর্তী সময়ে ২০১৮ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি দুর্নীতির মামলায় তাঁর কারাদণ্ড হয়। করোনাভাইরাস মহামারির সময় ২০২০ সালের ২৫ মার্চ সরকারের নির্বাহী আদেশে শর্তসাপেক্ষে মুক্তি পাওয়ার পর তিনি গুলশানের বাসভবন ফিরোজায় থেকে চিকিৎসা নেন। দীর্ঘদিন ধরে নানা শারীরিক জটিলতায় ভুগে দেশে-বিদেশে চিকিৎসা নিয়েছেন তিনি।

দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে মামলা, গ্রেপ্তার, কারাবাস, গৃহবন্দিত্ব ও রাজনৈতিক প্রতিকূলতার মধ্যেও তিনি বিএনপির নেতৃত্ব ধরে রাখেন।

জীবনের শেষ অধ্যায়

দীর্ঘদিন অসুস্থ থাকার পর ২০২৫ সালের ৩০ ডিসেম্বর ঢাকায় চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যুবরণ করেন বেগম খালেদা জিয়া। মৃত্যুর পরদিন তাঁর জানাজায় বিপুলসংখ্যক মানুষ অংশ নেন। পরে স্বামী জিয়াউর রহমানের কবরের পাশে তাঁকে দাফন করা হয়।

তাঁর মৃত্যুর পর আজই প্রথম জন্মদিন। এ উপলক্ষে বিএনপির পক্ষ থেকে ঢাকাসহ সারা দেশে দলীয় কার্যালয় ও মসজিদে মিলাদ ও দোয়া মাহফিলের কর্মসূচি নেওয়া হয়েছে। দলীয় নেতাকর্মীরা তাঁর রুহের মাগফিরাত কামনা করে দোয়া করছেন।

রাজনৈতিক উত্তরাধিকার

বেগম খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক জীবন ছিল উত্থান-পতন, আন্দোলন-সংগ্রাম এবং রাষ্ট্র পরিচালনার নানা অধ্যায়ে সমৃদ্ধ। একজন সাধারণ গৃহবধূ হিসেবে জীবন শুরু করে বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হওয়া, স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে নেতৃত্ব দেওয়া এবং তিন দফায় সরকারপ্রধানের দায়িত্ব পালন—সব মিলিয়ে তিনি দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি স্বতন্ত্র অবস্থান তৈরি করেন।

তাঁর দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনের সঙ্গে বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক আন্দোলন, সামরিক শাসনের অবসান, সংসদীয় সরকারব্যবস্থার পুনঃপ্রতিষ্ঠা এবং পরবর্তী রাজনৈতিক সংঘাতের নানা অধ্যায় ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে।

খালেদা জিয়ার মৃত্যুর পর তাঁর রাজনৈতিক উত্তরাধিকার বহন করছেন তাঁর জ্যেষ্ঠ সন্তান তারেক রহমান। ২০২৬ সালের জাতীয় নির্বাচনে বিএনপির বিজয়ের পর তিনি বর্তমানে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী।

আজকের এই দিনে তাই রাজনৈতিক বিভাজনের ঊর্ধ্বে ইতিহাসের একটি দীর্ঘ অধ্যায় হিসেবে স্মরণ করা হচ্ছে বেগম খালেদা জিয়াকে—একজন নারী নেত্রী হিসেবে, একজন সাবেক প্রধানমন্ত্রী হিসেবে এবং বাংলাদেশের রাজনীতির দীর্ঘ সময়ের অন্যতম প্রভাবশালী চরিত্র হিসেবে।