পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির প্রায় ২৭ বছর পেরিয়ে গেছে। সময়ের ব্যবধানে ইতিহাসের পাতায় হয়তো অনেক কিছুই ধূসর হয়ে গেছে, কিন্তু পাহাড়ি অঞ্চলের মাটি এখনও বারবার ভিজছে রক্তে। এক সময় যেখানে আশা ছিল শান্তি আসবে, সেখানেই আজও আধিপত্যের লড়াই, অপহরণ, চাঁদাবাজি আর মুক্তিপণের বিভীষিকাময় চিত্র চোখে পড়ে।
প্রসীত বিকাশ খীসার নেতৃত্বে গড়ে ওঠা ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট (ইউপিডিএফ) সেই বিভাজনেরই এক বড় উদাহরণ। ১৯৯৭ সালের ২ ডিসেম্বর চুক্তি স্বাক্ষরের পর যখন পাহাড়ে স্থিতিশীলতার স্বপ্ন বোনা হচ্ছিল, ঠিক তখনই চুক্তি প্রত্যাখ্যান করে প্রসীত খীসা কালো পতাকা হাতে নতুন সশস্ত্র সংগ্রামের সূচনা করেন। ১৯৯৮ সালের ২৬ ডিসেম্বর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ইউপিডিএফ গঠনের মাধ্যমে সেই প্রতিরোধ আনুষ্ঠানিক রূপ নেয়।
প্রথম থেকেই ইউপিডিএফ নিজেকে “স্বাধীন পার্বত্য চট্টগ্রাম” প্রতিষ্ঠার স্বপ্নবাজ সংগঠন হিসেবে প্রচার করলেও বাস্তবে তারা জড়িয়ে পড়ে অপহরণ, মুক্তিপণ আদায়, চাঁদাবাজি এবং আধিপত্যের জন্য সহিংস লড়াইয়ে। ডেনমার্কের উন্নয়ন সংস্থা ড্যানিডার তিন কর্মকর্তাকে অপহরণ থেকে শুরু করে, সাম্প্রতিক খাগড়াছড়িতে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঁচ শিক্ষার্থী অপহরণ প্রতিটি ঘটনায় বারবার ইউপিডিএফ প্রসীত গ্রুপের নাম উঠে আসে। পিছিয়ে নেই পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি -পিসিজেএসএস (সন্তু)- এর নামও।
পাহাড়ে আজ সক্রিয় ছয়টিরও বেশি সশস্ত্র সংগঠন- পিসিজেএসএস (সন্তু), পিসিজেএসএস (এমএন), ইউপিডিএফ (প্রসীত), ইউপিডিএফ (গণতান্ত্রিক), মগ পার্টি এবং কুকি-চিন ন্যাশনাল ফ্রন্ট। তাদের মধ্যে প্রথম চারটি মূলত খাগড়াছড়িতে সক্রিয়, আর বাকিরা রাঙামাটি ও বান্দরবানে। প্রত্যেকটি সংগঠন নিজেদের শক্তি প্রতিষ্ঠা করতে গিয়ে পাহাড়ের সাধারণ মানুষের জীবনে নেমে এসেছে নরকযন্ত্রণা। খুনোখুনি, অপহরণ, মুক্তিপণ আদায় এখন পাহাড়ের নিত্যদিনের বাস্তবতা। প্রায় ১৮ লাখ পাহাড়বাসী আজ এই সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলোর হাতে জিম্মি।
চুক্তির আগে সন্তু লারমার নেতৃত্বাধীন শান্তিবাহিনীর সশস্ত্র কর্মকাণ্ডে প্রাণ হারিয়েছেন প্রায় ত্রিশ হাজার বাঙালি, নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্য ও সাধারণ পাহাড়ি। চুক্তির মাধ্যমে সংঘাতের অবসানের স্বপ্ন দেখানো হলেও বাস্তবে চুক্তির পরবর্তী সময়ে বিভক্তি, নতুন নতুন সংগঠনের জন্ম, এবং আধিপত্য বিস্তারের সহিংস প্রতিযোগিতা পাহাড়ের নিরাপত্তা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।
সাম্প্রতিক সময়ে ইউপিডিএফ প্রসীত গ্রুপের অপহরণকাণ্ড আবারও প্রমাণ করলো- এই সংগঠনের মূল উদ্দেশ্য পাহাড়ি জনগণের অধিকার আদায় নয়, বরং নিজেরা এলাকায় চাঁদাবাজি ও আধিপত্য বজায় রাখা। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী দিব্যি চাকমা ও অন্যান্য শিক্ষার্থীদের অপহরণ এ সত্যকেই নগ্নভাবে প্রকাশ করেছে। সেনাবাহিনীর দক্ষ কৌশলগত অভিযানে তাদের উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে।
যে শান্তিচুক্তিকে কেন্দ্র করে পার্বত্য চট্টগ্রামে নতুন ভোরের সূচনা হয়েছিল, তার বাস্তবায়ন বাধাগ্রস্ত হয়েছে মূলত এইসব সশস্ত্র সংগঠনের কারণে। চুক্তি অনুসারে পাহাড়ে শান্তি প্রতিষ্ঠার প্রথম শর্ত ছিল অস্ত্র পরিহার করে রাজনীতির পথে ফেরা। কিন্তু বাস্তবে দেখা গেছে, সংগঠনগুলো চুক্তিকে অবজ্ঞা করে অস্ত্রধারী রাজনীতির ধারায় এগিয়েছে। নিজেদের মধ্যে আধিপত্যের জন্য প্রতিদ্বন্দ্বিতায় লিপ্ত হয়ে পুরো অঞ্চলকে পরিণত করেছে সংঘাতের মঞ্চে।
প্রশ্ন উঠেছে, কাদের স্বার্থে এই সংঘাত? সাধারণ পাহাড়ি জনগণের তো নয়। সাধারণ পাহাড়ি জনগণের স্বপ্ন ছিল নিরাপদ জীবন, মৌলিক অধিকার, উন্নয়ন। অথচ সেই স্বপ্নকে ব্যবহার করে কিছু নেতারা নিজেদের আখের গোছানোর খেলায় মত্ত হয়েছে। রাজনৈতিক অধিকার বা স্বায়ত্তশাসনের দাবি আজ ফিকে হয়ে গেছে। তার বদলে জায়গা করে নিয়েছে চাঁদাবাজি, খুনোখুনি আর অপরাধের রাজত্ব।
সরকার ও নিরাপত্তা বাহিনী সময় সময় অভিযান চালালেও দীর্ঘস্থায়ী সমাধান এখনও অধরা। কারণ, সমস্যা শুধু আইনশৃঙ্খলার নয়, রাজনৈতিকও। পাহাড়ে টেকসই শান্তি আনতে হলে চুক্তির পূর্ণ বাস্তবায়নের পাশাপাশি, এইসব সশস্ত্র গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। 
এছাড়া, সাধারণ পাহাড়ি জনগণের আস্থা পুনরুদ্ধার করতে হবে। উন্নয়ন কার্যক্রমের গতি বাড়াতে হবে। পাহাড়ি-বাঙালি বিভাজন না করে সবার জন্য সমান সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে। মনে রাখতে হবে — অস্ত্রের মুখে অধিকার আসে না। অধিকার আসে ন্যায়বিচার, উন্নয়ন আর শান্তির মাধ্যমে।
পার্বত্য চট্টগ্রামের জনগণ আর রক্ত দেখতে চায় না। তারা চায় শিক্ষা, চিকিৎসা, কর্মসংস্থান। তারা চায় নিরাপত্তা, সম্মান আর মানবিক জীবন। ২৭ বছরের চুক্তির অভিজ্ঞতা আমাদের শিখিয়েছে, আপসের পথ ছাড়া শান্তির বিকল্প নেই। আর অস্ত্র হাতে যারা পাহাড়কে জিম্মি করে রেখেছে, তাদের বিরুদ্ধে এখনই ঐক্যবদ্ধ প্রতিরোধ গড়ে তোলা দরকার।
পাহাড়ের শান্তির জন্য, উন্নয়নের জন্য, মানুষের স্বাভাবিক জীবনের জন্য সন্ত্রাসের অবসান জরুরি।

-গোলাম যাকারিয়া, সাংবাদিক ও কলামিস্ট