প্রাকৃতিক দুর্যোগ বাংলাদেশের জন্য নতুন কিছু নয়। কিন্তু প্রতিবারই আমরা যেন নতুন করে ভাসি, কাঁদি, আশ্রয়হীন হই- আর ঘুরে ফিরে একই প্রশ্ন উঁকি দেয়: আমাদের প্রস্তুতি কি যথেষ্ট ছিল? গত কয়েকদিনের টানা বৃষ্টিপাত ও উপকূলীয় নিম্নচাপ ফের সেই প্রশ্নটিকেই সামনে এনেছে। সমুদ্রের উত্তাল ঢেউ আর পাহাড়ের অসংলগ্ন ভূমিচ্যুতি আবারও প্রমাণ করেছে, বাংলাদেশের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা এখনো বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই প্রতিক্রিয়াশীল, পরিকল্পনাভিত্তিক নয়।
উপকূলীয় এলাকায় বাঁধ ভেঙে জনপদ প্লাবিত হওয়া, ঘরবাড়ি ডুবে যাওয়া, সড়ক ও রেলপথ অচল হয়ে পড়া কিংবা সেন্টমার্টিন, হাতিয়া ও সন্দ্বীপের মতো দ্বীপাঞ্চলগুলো কার্যত বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়া—এসব দৃশ্য কেবল আবহাওয়ার কারণে ঘটছে না। দীর্ঘদিনের অব্যবস্থাপনা, রক্ষণাবেক্ষণের অভাব, এবং দুর্নীতির দায়ভারও এ বিপর্যয়ের পেছনে রয়েছে। ষাটের দশকের বেড়িবাঁধগুলো আজ কেবল কাগজে আছে; বাস্তবে তারা ভঙ্গুর, নিচু, উপেক্ষিত।
উপকূলীয় বনায়নকে দীর্ঘদিন ধরে একটি ‘প্রকল্প’ হিসেবেই বিবেচনা করা হয়েছে, বাস্তব সংকট নয়। অথচ বনভূমি শুধু পরিবেশ রক্ষায় নয়, প্রাকৃতিক দুর্যোগের ঢাল হিসেবেও কাজ করে। সুন্দরবন আজও দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলকে ঘূর্ণিঝড়ের তাণ্ডব থেকে অনেকখানি রক্ষা করে। কিন্তু সরকারের প্রকল্পপত্রে যত বনাঞ্চল আছে, বাস্তব মাটিতে তার ছায়া মেলে না। প্রকৃতির বিপর্যয় আমরা কেবল রিপোর্টে গুনে রাখি, বন ধ্বংসের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলি না।
আরেক ভয়াবহ বাস্তবতা হলো পাহাড়ধস। এটি এখন আর নিছক প্রাকৃতিক দুর্যোগ নয়, বরং মানুষের হাতেই সৃষ্ট বিপদ। চট্টগ্রাম ও পার্বত্য চট্টগ্রামের পাহাড় কেটে বসতি গড়ে তোলা, পাহাড়ের মাটি বিক্রি, নির্মাণ প্রকল্পের নামে সরকারি অনুমোদনে পাহাড় ধ্বংস- এসব যেন অঘোষিত ‘উন্নয়ন সংস্কৃতি’। প্রতিবছরই বর্ষার শুরুতেই ‘পাহাড়ধসের শঙ্কা’ শিরোনামে খবর আসে, মৃত্যুর মিছিল গড়ে, তবু পরিবর্তন আসে না।
যেসব এলাকায় বাস করা মানুষের জীবনপ্রণালী পাহাড়ের নিচে গড়ে উঠেছে, সেসব মানুষকে বারবার ‘সতর্ক’ করা হয়, কখনো মাইকিং, কখনো আশ্রয়কেন্দ্র খোলা হয়। কিন্তু প্রশ্ন হলো, এই মানুষগুলো কি শুধু দুর্যোগ আসার সময়ই সরকারের নজরে পড়ে? বছরের বাকি সময় তারা কোথায় থাকে, কীভাবে থাকে, কেন তারা সেই ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় বাস করতে বাধ্য হয়, এ প্রশ্নগুলো সাধারণত উপেক্ষিত থাকে।
বাংলাদেশ একটি দুর্যোগপ্রবণ দেশ। এটা যেমন বাস্তবতা, তেমনই এটাও সত্য যে আমরা চাইলে অনেক ক্ষয়ক্ষতি এড়াতে পারি। এর জন্য চাই দৃঢ় রাজনৈতিক সদিচ্ছা, টেকসই অবকাঠামো, এবং প্রাকৃতিক ভারসাম্য রক্ষার প্রতি আন্তরিক অঙ্গীকার।
আবহাওয়া অধিদপ্তরের সতর্কতা কেবল সংবাদ শিরোনাম হয়ে থাকলে চলবে না। এসব বার্তা স্থানীয় প্রশাসন, নাগরিক সমাজ, গণমাধ্যমসহ সব মহলে দ্রুত পৌঁছাতে হবে। দুর্যোগপ্রবণ এলাকায় ‘প্রশিক্ষিত স্থানীয় প্রতিরক্ষা বাহিনী’ গঠনের কথাও বারবার এসেছে, কিন্তু তা বাস্তবায়নে রাজনৈতিক অগ্রাধিকারের অভাব স্পষ্ট। দুর্যোগ প্রস্তুতির বিষয়টি শিক্ষাব্যবস্থার অংশ না হলে ভবিষ্যৎ প্রজন্মও এই সংকট থেকে মুক্ত হতে পারবে না।
আমরা প্রকৃতিকে দোষ দিয়ে সব দায় ঝেড়ে ফেলতে পারি না। অনেক দুর্যোগই আমরা প্রতিরোধ করতে পারি, যদি সময়মতো ব্যবস্থা নিই, পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা করি এবং দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় প্রকল্পের সংখ্যার চেয়ে ফলাফলের গুরুত্ব দিই।
দুর্যোগকে রুখে দেওয়া সম্ভব নয়, কিন্তু তার ধাক্কা কমিয়ে আনা সম্ভব। আমাদের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় দরকার আর্তমানবতার দৃষ্টিভঙ্গি, দৃঢ় পরিকল্পনা, স্বচ্ছতা এবং দীর্ঘমেয়াদি প্রস্তুতি। এখনই সময়, দুর্যোগ প্রতিরোধে সক্ষমতা বাড়ানোর কার্যকর পথে হাঁটার। কথায় নয়, কাজে তা প্রমাণ করতে হবে।
- - মাহাদী সেকেন্দার, সাংবাদিক ও শিক্ষক


