১৯৯৮ সালের ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থা র-এর একটি নজিরবিহীন বিশ্বাসঘাতকতায় হোঁচট খেয়েছিল রাখাইন জনগোষ্ঠীর স্বাধীনতা আন্দোলনের সশস্ত্র উদ্যোগ আরাকান আর্মি (AA)। তৎকালীন আরাকান আর্মির প্রধান জেনারেল খাইং রাজাসহ অন্যান্য শীর্ষ নেতাদের আন্দামানে ডেকে নিয়ে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়েছিল। এটি আরাকানিদের স্বাধীনতা সংগ্রামের বিরুদ্ধে ভারতীয় ষড়যন্ত্রের একটি দৃষ্টান্ত, যা সেদিনের পর থেকে আজও চলমান।
ঘুরে দাড়ানো আরাকান আর্মি যখন আরাকান অঞ্চলের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণের দ্বারপ্রান্তে,তখনই, ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থা র প্রভাবিত সরকারি সংস্থা ইন্ডিয়ান কাউন্সিল অফ ওয়ার্ল্ড অ্যাফেয়ার্স (ICWA) মায়ানমারের স্বাধীনতাকামী সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর প্রতিনিধিদের ভারতীয় মাটিতে আমন্ত্রণ জানিয়েছে। বৈঠকে আমন্ত্রণ পেয়েছে আরাকান আর্মিও। মায়ানমারের সামরিক জান্তার সাথে ৫১ মিলিয়ন ডলারের অস্ত্র বিক্রি করেছে ভারত। মায়ানমার সেনাবাহিনী যাদের বিরুদ্ধে এই অস্ত্র ব্যবহার করছে, তাদের সাথেই বৈঠক করার উদ্যোগ নিয়েছে দিল্লি। নাটকীয়তা এখানেই শেষ নয়, নেপিদোর সাথে সামরিক জোট বেধে ভারত-মায়ানমার সীমান্তে এই সশস্ত্র জাতিগোষ্ঠী নিমূলে অপারেশন সানরাইজ পরিচালনা করেছে ভারত। অথচ সেই রক্তের দাগ এখনও শুকায়নি।
শুধু ভূ-রাজনীতি নয়, বরং ভারতের বাণিজ্যিক স্বার্থও এখানে প্রবলভাবে জড়িত। ৪০০ মিলিয়ন ডলারের কালাদান প্রকল্পের কারণে প্যালেটোয়া ও সিটুওয়ে বন্দরে প্রভাব বিস্তারে মরিয়া ভারত। আরাকানের এই গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টগুলো আরাকান আর্মির দখলে চলে আসায়, ভারত এ ক্ষেত্রে সামরিক জান্তার ওপর আস্থা হারাচ্ছে। তবে আরাকান আর্মিকে দুর্বল করে জান্তাকে শক্তিশালী করার কোনো ছক ভারত কষছে কি না, সন্দেহ থেকেই যাচ্ছে।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের পর সেভেন সিস্টার্স অঞ্চলে পণ্য পরিবহণের করিডোর গড়ার আশা ছেড়ে দিতে বাধ্য হয়েছে ভারত। সে ক্ষেত্রে কালাদান প্রজেক্টকে বেশ গুরুত্বের সাথে দেখছে দিল্লি। উদ্ভুত পরিস্থিতিতে ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থা র এরই মধ্যে আরাকান আর্মিকে কিছু লোভনীয় প্রস্তাব দিয়েছে। প্যালেটোয়া ও সিটুওয়েতে বিদ্যুৎ সরবরাহের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে, যা আরাকান জনগণের জীবনযাত্রার মান উন্নয়নের জন্য একটি মহৎ উদ্যোগ হিসেবে দাবি করা হচ্ছে। কিন্তু, ভারতের ইতিহাসে প্রতিবেশী দেশের প্রতি বৈরী আচরণের নজির রয়েছে। এই কারণে, তাদের এই মহৎ উদ্যোগে সন্দেহ থাকাই স্বাভাবিক।
ভারতীয় সেনাবাহিনী মায়ানমারের সেনাবাহিনীর সাথে গোয়েন্দা তথ্য আদান-প্রদান করে এবং সীমান্ত স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে চেষ্টা চালাচ্ছে। এভাবেই তারা ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলোতে বিচ্ছিন্নতাবাদ মাথাচাড়া না দেয়, সে জন্য নেপিদোর সাথে সম্পর্ক বজায় রাখতে সচেষ্ট। সম্প্রতি, ভারতীয় প্রতিনিধিরা মায়ানমারের সামরিক বাহিনীর শীর্ষ কর্মকর্তাদের সাথে বৈঠক করেছে, যা অঞ্চলটির নিরাপত্তা পরিস্থিতির ওপর গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলতে পারে।
সম্প্রতি মায়ানমারের সামরিক বাহিনীর চিফ অফ জেনারেল স্টাফ জেনারেল মাং মাং অয়-এর সাথে ভারতের সিনিয়র সামরিক কর্মকর্তাদের বৈঠক হয়েছে, যেখানে প্রশিক্ষণ ও একাডেমিক সহযোগিতা নিয়ে আলোচনা হয়েছে। যদিও অধিকাংশ পশ্চিমা দেশ মায়ানমারের জান্তার সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করেছে, ভারত তাদের সহযোগিতা বজায় রেখেছে।
নিজের অখণ্ডতার স্বার্থে ভারত আরাকান আর্মির চেয়ে জান্তার ওপর বেশি আস্থা রাখবে, এটা চোখ বন্ধ করে বলা যায়। আরাকান স্বাধীন হলে, সেই স্বাধীনতার স্পৃহা মণিপুর-মিজোরামেও ছড়িয়ে পড়তে পারে, এমন আশঙ্কা আছে দিল্লির। তাই রাখাইন বিশ্লেষকরা মনে করছেন, অতীতের বিশ্বাসঘাতকতা ভুলে গিয়ে যদি আরাকান আর্মি ভারতের সাথে সম্পর্ক গড়ার চেষ্টা করে, তাহলে এটি তাদের স্বাধীনতা সংগ্রামের জন্য বড় একটি বিপদ হয়ে দাঁড়াবে।
আরাকান আর্মি কি আবারও কী ভারতের ফাঁদে পা দিচ্ছে?
আরাকান আর্মির প্রধান জেনারেল খাইং রাজাসহ অন্যান্য শীর্ষ নেতাদের আন্দামানে ডেকে নিয়ে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়েছিল। এটি আরাকানিদের স্বাধীনতা সংগ্রামের বিরুদ্ধে ভারতীয় ষড়যন্ত্রের একটি দৃষ্টান্ত, যা সেদিনের পর থেকে আজও চলমান।
সি
স্টাফ রিপোর্টার
৩০ অক্টোবর, ২০২৪ ৫:১২ পূর্বাহ্ন২ মিনিট পড়া

ছবি: ইরাবতী নিউজ

