মায়ানমারের সীমান্তরক্ষী বাহিনী (নাসাকা) ও আধা-সামরিক লুন্টিন বাহিনী ১৯৯১ সালের ২১ ডিসেম্বর ভোরে বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলার রেজুপাড়া বিওপিতে আকস্মিক আক্রমণ চালায়। এই আক্রমণে বিডিআর (বর্তমানে বিজিবি) সদস্যরা হতভম্ব হয়ে পড়ে। তাদের তিনজন সাহসী সৈনিক শহীদ হন, এবং বেশ কিছু সৈনিক আহত হন। লুনথিং বাহিনী চৌকির অস্ত্রাগার লুট করে এবং চলে যায়। এ ঘটনা সীমান্তে চরম উত্তেজনার সৃষ্টি করে।
বিডিআর মহাপরিচালক সেদিন নাইক্ষ্যংছড়ির অন্যপ্রান্তে ঘুমধুম সীমান্ত পরিদর্শনে ছিলেন। সকাল ১০টার দিকে খবর পেয়ে তিনি দ্রুত ব্যাটালিয়ন কমান্ডারকে নির্দেশ দেন রেজুপাড়ায় ছুটে গিয়ে পরিস্থিতি মোকাবিলা করতে। এ আক্রমণের পরিপ্রেক্ষিতে দ্রুত প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা নিতে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী পদক্ষেপ নেয়।

সেনাবাহিনীর নিয়ন্ত্রণ গ্রহণ

এই সঙ্কটময় সময়ে, বান্দরবান অঞ্চলে মোতায়েনকৃত ব্রিগেড কমান্ডার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল এম সাখাওয়াত হোসেনকে দায়িত্ব দেওয়া হয় “অপারেশন নাফ রক্ষা”র। ব্রিগেডিয়ার সাখাওয়াত দ্রুত প্রতিক্রিয়া জানান এবং চট্টগ্রাম সেনানিবাস থেকে একটি পদাতিক ব্যাটালিয়ন ও একটি আর্টিলারি ব্যাটারি নিয়ে কক্সবাজার-টেকনাফ অক্ষরেখায় মোতায়েন করেন। পদাতিক বাহিনীর অধিনায়ক হিসেবে দায়িত্ব পান লেফটেন্যান্ট কর্নেল আবু শরাফত জামিল, যিনি রেজুপাড়ায় দ্রুত প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তোলেন এবং শত্রুর সম্ভাব্য আক্রমণ মোকাবিলার জন্য চৌকির চারপাশে বাংকার নির্মাণ করেন।
এ বিষয়ে ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অবঃ) এম সাখাওয়াত হোসেন (বর্তমানে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের উপদেষ্টা) লিখেন- ‘১৯৯১ সালের ডিসেম্বরের শেষ দিকে বাংলাদেশের তৎকালীন বাংলাদেশ রাইফেলসের সীমান্ত চৌকি রেজুপাড়াতে মায়ানমারের সীমান্তবর্তী নাসাকা বাহিনী অতর্কিতে হামলা চালায় এবং কয়েকটি অস্ত্র লুট করে নিয়ে গিয়েছিল। মায়ানমারের অভিযোগ ছিল, তৎকালীন বিডিআরের সহযোগিতায় রোহিঙ্গা জঙ্গি সংগঠন নাসাকা বাহিনীর ওপর হামলা চালিয়েছিল। আমার মনে হয়, স্বাধীন বাংলাদেশে ওই প্রথম একটি প্রতিবেশী দেশের বিরুদ্ধে সীমান্তে এত বৃহৎ আকারে সামরিক বাহিনী মোতায়েন হয়েছিল। শুধু সেনাবাহিনী নয়, মোতায়েন হয়েছিল তিনবাহিনী। ব্রিগেড অধিনায়ক হিসেবে আমি ওই বাহিনীর কমান্ডে প্রায় একমাস যুদ্ধাবস্থায় কাটিয়েছিলাম। পরে সীমান্ত থেকে সেনা অপসারণের পরপরই রাখাইন অঞ্চল থেকে রোহিঙ্গা শরণার্থীর ব্যাপক আগমন ঘটে।’ (সন্ত্রাস: দক্ষিণ এশিয়া ও মধ্যপ্রাচ্য, ব্রিগেডিয়ার জেনারেল এম সাখাওয়াত হোসেন)

প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তোলা

প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা শক্তিশালী করতে সৈন্যদের বিভিন্ন কৌশলগত গুরুত্বপূর্ণ স্থানে মোতায়েন করা হয়। রেজুপাড়ার চারপাশে নতুন বাংকার নির্মাণ শুরু হয়। শত্রুর হামলা ঠেকানোর জন্য প্রতিটি বাংকারে ভারী অস্ত্র স্থাপন ও গোলাবারুদ মজুদ করা হয়। বাংকারগুলোর মধ্যে সমন্বয় করতে স্থাপন করা হয় বিশেষ কন্ট্রোল পয়েন্ট এবং গোয়েন্দা ইউনিটকে সক্রিয় রাখা হয় সীমান্তের প্রতিটি বিন্দুতে শত্রুর গতিবিধি পর্যবেক্ষণের জন্য।
এই প্রস্তুতি সম্পূর্ণ করতে সেনাবাহিনীর পক্ষে প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের তৎপরতা ত্বরান্বিত হয়, এবং বিভিন্ন ইউনিটের মধ্যে কার্যকর যোগাযোগ ব্যবস্থা নিশ্চিত করা হয়। বাংকার এবং অন্যান্য প্রতিরক্ষা স্থাপনায় স্থানীয় জনগণের সহায়তা নেওয়া হয়, যা বাহিনীর মনোবলকে আরও দৃঢ় করে তোলে।
সাপ্তাহিক বিচিত্রার সাংবাদিক সেলিম ওমরাও খান, সীমান্ত অঞ্চলে ঘুরে সে সময়ের জনপ্রিয় ম্যাগাজিন বিচিত্রায় রিপোর্ট করেছিলেন।
সেলিম ওমরাও খান লিখেছেন, ‘কক্সবাজার থেকে দক্ষিণে টেকনাফের রাস্তায় পড়বে বালুখালি। সেখান থেকে কাঁচা পাকা পথ আরাকান সড়ক ধরে ২ মাইল পূর্বে ঘুমধুম সীমান্ত। বাংলাদেশের শেষ একটি পাহাড়ের উপর বিডিআর ক্যাম্পের দৃশ্যপট থমথমে। তার আগে পাহাড়ের উপরে পড়বে একটি প্রাইমারি স্কুল। সেই স্কুলেও অবস্থান নিয়েছে বাংলাদেশী সৈন্যরা। ঘুমধুম সীমান্তের ২০০ গজ পূর্বে বার্মা সীমান্ত ডেকুবুনিয়া। বার্মার আধা-সামরিক লুন্টিন বাহিনী সেখানে তাদের অবস্থান জোরদার করেছে। তাদের ক্যাম্পের আশেপাশে অসংখ্য নতুন বাংকার খনন করা হয়েছে’। (বার্মা সীমান্তে সংঘাতের আশঙ্কা, সেলিম ওমরাও খান, বিচিত্রা, ১০ জানুয়ারি, ১৯৯২)।

সক্রিয় হয় নৌ ও বিমানবাহিনী

ব্রিগেডিয়ার জেনারেল এম সাখাওয়াত সশস্ত্র বাহিনীর অন্য ইউনিটের সঙ্গে সমন্বয় করেন। বঙ্গোপসাগরের উপকূলবর্তী এলাকায় নৌবাহিনীর যুদ্ধজাহাজ প্রস্তুত রাখা হয়, যাতে আক্রমণ বাড়তে থাকলে দ্রুত নৌ সমর্থন প্রদান করা যায়। বিমানবাহিনীর স্কোয়াড্রনগুলো আকাশ পথে টহল দিতে থাকে এবং টেকনাফসহ পুরো সীমান্ত এলাকার আকাশসীমায় যেকোনো মায়ানমার বাহিনীর গতিবিধি পর্যবেক্ষণে রেখেছিল।

পতাকা বৈঠক ও কূটনৈতিক প্রচেষ্টা

সীমান্ত পরিস্থিতি তীব্র হতে থাকায় বেশ কয়েক দফা পতাকা বৈঠক শুরু হয়। প্রথম দফা বৈঠকে মায়ানমারের পক্ষ থেকে আক্রমণের কথা অস্বীকার করা হয় এবং রোহিঙ্গা সন্ত্রাসীদের দায়ী করে তারা। তবে দ্বিতীয় দফায় মায়ানমার পক্ষ আক্রমণের বিষয়টি স্বীকার করতে বাধ্য হয়।
তৃতীয় পতাকা বৈঠকে বাংলাদেশ প্রতিনিধি দলের নেতৃত্ব দেন তৎকালীন বিডিআরের চট্টগ্রাম সেক্টরের অধিনায়ক কর্নেল আলী হাসান (পরে ব্রিগেডিয়ার জেনারেল)। ১৯৯২ সালের ১০ ফেব্রুয়ারি (৩য় বৈঠক) বার্মার মংডু শহরের টাউনশিপ হলে অনুষ্ঠিত ফ্ল্যাগ মিটিংয়ে লুন্টিন বাহিনীর অধিনায়ক লেফট্যানেন্ট কর্নেল সেন লুইন, বাংলাদেশ রাইফেলসের কক্সবাজার এলাকার ব্যাটালিয়ন অধিনায়কের কাছে লুট করা অস্ত্র ও গোলাবারুদ ফেরত দেন।
এ ব্যাপরে কক্সবাজারের প্রখ্যাত সাংবাদিক মুহাম্মদ নুরুল ইসলাম লিখেছিলেন, ‘অবশেষে সন্ধ্যা ৭টার দিকে আমরা টেকনাফ পৌঁছলাম। আমরা বার্মার আরাকান প্রদেশের মংডু টাউনশিপ থেকে ফিরে এসেছি এবং সাথে নিয়ে এসেছি বাংলাদেশ সীমান্তে লুটে নেওয়া অস্ত্রশস্ত্র। একথা জানতে পেরে মানুষের মধ্যে আনন্দের দ্যুতি খেলে গেল।’ (আরাকানের পথে পথে, মুহাম্মদ নুরুল ইসলাম)

সেনাবাহিনীর প্রতিরক্ষা নীতি ও কৌশলগত পরিবর্তন

এই ঘটনার পর বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা নীতিতে বড় ধরনের পরিবর্তন আনা হয়। দক্ষিণ চট্টগ্রাম ও বান্দরবান-কক্সবাজার অঞ্চলের সীমান্ত প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা পুনর্গঠন করা হয়। একটি স্থায়ী পদাতিক ডিভিশন ২০১৫ সালে রামুতে প্রতিষ্ঠিত হয়।
এর পাশাপাশি, নৌবাহিনী ও বিমানবাহিনীর সক্ষমতা বৃদ্ধি করা হয় এবং সেন্ট মার্টিন দ্বীপের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাও ঢেলে সাজানো হয়। সীমান্তে আরও শক্তিশালী প্রতিরক্ষা নিশ্চিত করার জন্য বিজিবির পুনর্গঠন সম্পন্ন করা হয়।
সে সময়ে সেনাসদরে ডাইরেক্টর অফ মিলিটারি অপারেশন (ডিএমও) হিসেবে দায়িত্বে থাকা মেজর জেনারেল সৈয়দ মুহাম্মদ ইব্রাহিম এই বিষয়ে লিখেছেন, ‘অপারেশন নাফ রক্ষার অভিজ্ঞতা থেকে সেনাবাহিনীর মধ্যে যে কৌশলগত পরিবর্তন আনা হয়, তা আমাদের সীমান্ত প্রতিরক্ষা ও নিরাপত্তায় দীর্ঘমেয়াদে কার্যকরী ভূমিকা রেখেছে।’
ব্রিগেডিয়ার জেনারেল এম সাখাওয়াত হোসেনের নেতৃত্বে ‘অপারেশন নাফ রক্ষা; সফলভাবে সম্পন্ন হয়, যা দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষায় একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হিসেবে চিহ্নিত হয়ে আছে।

 লেখক -সাঈফ ইবনে রফিক, সাংবাদিক