বাংলাদেশের রাজনীতিতে দোষারোপ যেন একটি প্রতিষ্ঠিত সংস্কৃতিতে রূপ নিয়েছে। ক্ষমতায় থাকাকালীন সকল রাজনৈতিক দলই প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করতে দোষের রাজনীতি হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে। আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে এই চর্চা আরও ব্যাপকভাবে দেখা গেছে। আওয়ামী লীগ সরকার ও তাদের কর্মী সমর্থকরা আইনশৃঙ্খলাসহ যেকোনো দুর্ঘটনার দায় তদন্তের আগেই চাপিয়েছে বিএনপি-জামায়াতের ঘাড়ে। ট্রেনে হামলা হলো, তদন্ত হওয়ার আগেই পুলিশ কমিশনার গিয়ে বলছেন, এর পেছনে বিএনপি-জামায়াতের লোকজন জড়িত। ক্ষমতার পালাবদলে দোষের দায়ও পাল্টে গেছে। যাহোক, জাতীয় রাজনীতির এই হীন চর্চা ছড়িয়ে পড়ে আঞ্চলিক রাজনীতিতেও। পাহাড়ে যা কিছু খারাপ ঘটনা ঘটছে আঞ্চলিক সংগঠনগুলো সাথে সাথে বিবৃতি দিয়ে বলছে এর পেছনে 'সেটেলার' বাঙালিদের হাত রয়েছে। এ যেন বহুল চর্চিত প্রবাদ- "যত দোষ, নন্দ ঘোষ"! পাহাড়ি রাজনীতিতে এই নন্দ ঘোষ হচ্ছে স্থানীয় বাঙালিরা। তাদের দিকে আঙুল উঁচিয়ে রাজনৈতিক ফায়দা খুজছে পাহাড়ের সংগঠনগুলো।
ঘটনার প্রকৃত কারণ খুঁজে বের করার আগেই যেভাবে আঞ্চলিক সংগঠনগুলো গণধর্ষণ ও হত্যার অভিযোগে সরব হয়েছে, তা শুধু তদন্তকে প্রভাবিত করে না, বরং পাহাড়ে বসবাসকারী নিরীহ বাঙালি জনগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে এক প্রকার পূর্বনির্ধারিত ঘৃণার চিত্র তুলে ধরে। যেন তারা কেবল দোষী হওয়ার জন্যই সেখানে আছেন। 
চিংমা খিয়াং (২৯) নামের এই পাহাড়ি নারী থানচি উপজেলার মংখয় পাড়া গ্রামের বাসিন্দা এবং তিন সন্তানের জননী। তিনি সোমবার সকালে জুমচাষের উদ্দেশ্যে পাহাড়ে গেলে সন্ধ্যার পর তার মৃতদেহ পাওয়া যায় পার্শ্ববর্তী এক পাথুরে ঝিরিতে। জেলা প্রশাসন ও পুলিশ প্রশাসন যৌথ সংবাদ সম্মেলনে জানায়, মৃত্যুর প্রকৃত কারণ জানতে মরদেহ ময়নাতদন্তের জন্য পাঠানো হয়েছে এবং তদন্ত চলছে। পুলিশ সুপার শহিদুল্লাহ কাওছার জানিয়েছেন, শরীরে একাধিক আঘাতের চিহ্ন পাওয়া গেছে, তবে ধর্ষণের কোনো প্রমাণ এখনো মেলেনি।

নিহত চিংমা খিয়াং

তবুও ঘটনার পরপরই জনসংহতি সমিতি (সন্তু) ও ইউপিডিএফ (প্রসীত) এর অনলাইন মুখপাত্রগুলো দাবি করে—এই নারী বাঙালি শ্রমিকদের দ্বারা গণধর্ষণ ও হত্যার শিকার হয়েছেন। মজার ব্যাপার হলো, এই সংগঠনগুলো ‘ঘটনার আগের দিন’ চিংমা খিয়াংকে কয়েকজন বাঙালি শ্রমিকের আচরণে ‘ভয় পেয়ে’ ঘরে ফিরে আসার গল্প সাজিয়ে গণমাধ্যমে ছড়িয়ে দিয়েছে, যার কোনো সত্যতা বা প্রত্যক্ষদর্শীর কথা জানা যায়নি।
এই দাবিগুলোর একটি সুপরিকল্পিত সাংগঠনিক কাঠামো রয়েছে। ধর্ষণকারীদের গ্রেফতারপূর্বক যথাযথ শাস্তির দাবি জানিয়েছে বাংলাদেশ খেয়াং স্টুডেন্টস ইউনিয়ন (বিকেএসইউ)। মঙ্গলবার (৬ মে) চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে বিক্ষোভ মিছিল ও প্রতিবাদ সমাবেশ চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় আদিবাসী শিক্ষার্থীবৃন্দ। বিবৃতি প্রদান করেছে আদিবাসী নারী নেটওয়ার্ক। বিভিন্ন নামে-বেনামে সংগঠনের প্রতিবাদ, বিবৃতি ও মিছিলের মাধ্যমে একই অভিযোগ প্রতিষ্ঠা করতে সচেষ্ট হয়। যেনো সংগঠনের সংখ্যা বাড়ালেই অভিযোগের সত্যতাও বেড়ে যায়। এটি একটি পরিচিত প্রচার কৌশল: "repeat a lie often enough and it becomes the truth"।
এই ধরনের অভিযোগ শুধু তদন্তকে বাধাগ্রস্ত করে না, বরং বিচারপ্রক্রিয়াকেও অসংগত করে তোলে। কোনো অপরাধ সংঘটিত হলে তদন্তের কাজ পুলিশ ও বিচার বিভাগের। কিন্তু রাজনৈতিক ও জাতিগত উদ্দেশ্যপ্রণোদিত প্রচার সেই প্রক্রিয়াকে আক্রমণ করে। যার ফলে প্রকৃত অপরাধী আড়ালেও থেকে যেতে পারে। একই সঙ্গে পাহাড়ি-বাঙালি সম্পর্ক আরও বৈরী ও অবিশ্বাসের স্তরে পৌঁছায়।
বিশেষ করে এই ঘটনার সময়টিও সন্দেহজনকভাবে তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ সীমান্ত এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে সামরিক ও বেসামরিক উন্নয়ন কার্যক্রম—বিশেষ করে সীমান্ত সড়ক নির্মাণ প্রকল্প—আঞ্চলিক সংগঠনগুলোর বিরোধিতার মুখে পড়ে। সড়ক নির্মাণে শ্রমিকদের উপস্থিতিই এ ঘটনায় সহজ টার্গেটে পরিণত হয়েছে। প্রশ্ন জাগে, এই উন্নয়ন কর্মকাণ্ড ব্যাহত করার জন্যই কি এমন প্রচার চালানো হচ্ছে?
জনসংহতি সমিতি বা ইউপিডিএফের মতো সংগঠনগুলো বহুদিন ধরেই পাহাড়ি জনগণের হয়ে ‘অধিকার আদায়ের’ কথা বলে আসছে। কিন্তু তাদের রাজনৈতিক অবস্থান যে কতটা বিভাজনমূলক এবং উদ্দেশ্যপ্রণোদিত, তা বিভিন্ন ঘটনার মতো এই ঘটনায়ও স্পষ্ট। একদিকে এরা নিজেরাই সশস্ত্র রাজনীতি করে, চাঁদাবাজি ও আধিপত্য বিস্তারে লিপ্ত, অন্যদিকে যখন কোনো দুর্ঘটনা ঘটে, তখন সেটাকে বাঙালিদের উপর চাপিয়ে দিয়ে সুবিধা আদায়ের চেষ্টা করে।
তাদের যুক্তি, পাহাড়ে সব খারাপ ঘটনার পেছনে সেটেলারদের হাত। এই যুক্তি প্রশ্নাতীতভাবে মেনে নিলে পাহাড়ে বসবাসকারী লাখো বাঙালিকে 'অপরাধী' হিসেবে চিহ্নিত করে একটি সামাজিক-জাতিগত গেটো তৈরি করা হয়, যা বৈষম্য, ঘৃণা এবং বিভাজনকে উৎসাহ দেয়।
পাহাড়ের সমস্যার রাজনৈতিক সমাধান হতে পারে সংলাপ, অংশগ্রহণমূলক উন্নয়ন, সমান নাগরিক অধিকার এবং পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধের ভিত্তিতে। কিন্তু পাহাড়ি সংগঠনগুলোর একটি বড় অংশ এখনো গৃহযুদ্ধপরিস্থিতি ধরে রাখতে চায়। তাদের অস্তিত্বই নির্ভর করে বৈরিতা জিইয়ে রাখার ওপর। ফলে তারা যে কোনো সামান্য ঘটনাকেও সাম্প্রদায়িক উত্তেজনায় রূপ দিতে প্রস্তুত থাকে।
চিংমা খিয়াংয়ের মৃত্যুর ঘটনার তদন্ত এখনো শেষ হয়নি। আমরা জানি না সেটি দুর্ঘটনা, আত্মহত্যা, হত্যাকাণ্ড না কি অন্য কিছু। কিন্তু তার আগেই যে রাজনৈতিক আগুন জ্বলে উঠেছে, সেটিই আসল সংকট। যারা অপরাধের বিচার চান, তারা তদন্তের সুযোগ দেন। যারা বিচার চান না, তারাই আগে দোষী নির্ধারণ করেন।
বাংলাদেশের পার্বত্য চট্টগ্রাম একটি সংবেদনশীল অঞ্চল। এখানে প্রতিটি অপপ্রচার, প্রতিটি উস্কানিমূলক বক্তব্য, প্রতিটি ভিত্তিহীন অভিযোগ বড় অস্থিতিশীলতা ডেকে আনতে পারে। চিংমা খিয়াংয়ের মৃত্যু দুঃখজনক। এই ঘটনার পূর্ণ ও নিরপেক্ষ তদন্ত হওয়া দরকার। দোষী প্রমাণিত হলে যেই হোক, তাকে শাস্তি পেতে হবে। কিন্তু তার আগেই যেভাবে 'সেটেলার' বাঙালিদের টার্গেট করে অপপ্রচার চালানো হচ্ছে, তা শুধু নিন্দনীয় নয়, বিপজ্জনকও। এটা বন্ধ হওয়া দরকার, এখনই।

-গোলাম জাকারিয়া, সাংবাদিক ও কলামিস্ট