সম্প্রতি জাতীয় সংসদের এলডি হলে “জাতীয় ঐকমত্য কমিশন” নামে একটি রাষ্ট্র সংস্কারপন্থী উদ্যোগের আওতায় ইউপিডিএফ (প্রসীত)-এর সঙ্গে অনুষ্ঠিত বৈঠক পার্বত্য চট্টগ্রামসহ সারা দেশের সচেতন নাগরিকদের মধ্যে চরম উদ্বেগ ও বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। স্বায়ত্তশাসনের নামে স্বাধীনতার চুক্তিবিরোধী এজেন্ডা এবং রাষ্ট্রবিরোধী কার্যকলাপে জড়িত একটি সশস্ত্র সংগঠনের সঙ্গে সরকারের ঘনিষ্ঠ বুদ্ধিজীবী ও সংগঠকদের বসে আলোচনা করা কোনোভাবেই রাষ্ট্রীয় দায়িত্বশীলতার পরিপ্রেক্ষিতে গ্রহণযোগ্য নয়।
ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট বা ইউপিডিএফ একটি অস্বীকৃত, সশস্ত্র ও কার্যত বিচ্ছিন্নতাবাদী সংগঠন, যাদের উত্থান ১৯৯৭ সালের শান্তিচুক্তির বিরোধিতার মধ্য দিয়ে। এই সংগঠনটি মূলত ভারতের সীমান্তবর্তী এলাকা ও দেশবিরোধী কিছু আন্তর্জাতিক গোষ্ঠীর প্রত্যক্ষ পৃষ্ঠপোষকতায় গঠিত হয়, যারা বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা ও ভূখণ্ডগত অখণ্ডতার বিরুদ্ধে অবস্থান নেয়। স্বাধীনতা-পরবর্তী সময়ে দেশের সবচেয়ে বড় অস্ত্রবিরোধী চুক্তি বাস্তবায়নের পথে ইউপিডিএফ ছিল সবচেয়ে বড় অন্তরায়। শান্তিচুক্তি স্বাক্ষরের বছরখানেকের মধ্যেই তারা অস্ত্র হাতে নিয়ে সন্ত্রাস চালানো শুরু করে।
পরিসংখ্যান বলছে, ইউপিডিএফ ও তার সহযোগী সংগঠনগুলো পার্বত্য চট্টগ্রামে বছরে প্রায় ৩০০-৪০০ কোটি টাকার অবৈধ চাঁদাবাজি করে। এই অর্থ দিয়ে সংগঠনটি অস্ত্র, গোলাবারুদ ও অন্যান্য সামরিক সরঞ্জাম সংগ্রহ করে থাকে। গত এক বছরে ইউপিডিএফ (প্রসীত) এর হাতে গুম, অপহরণ ও হত্যার শিকার হয়েছে অন্তত ৪৮ জন পাহাড়ি ও বাঙালি নাগরিক। এই হত্যার শিকাররা কেবল বাঙালি নন, বরং মারমা, তঞ্চঙ্গ্যা, ত্রিপুরা ও বম জাতিগোষ্ঠীর লোকজনও এর অন্তর্ভুক্ত। দলটি পার্বত্য অঞ্চলে একটি নিপীড়নমুখী শাসনব্যবস্থা কায়েম করে রেখেছে, যেখানে চাঁদা না দিলে ব্যবসা, কৃষিকাজ, এমনকি চাকরিও করা যায় না।
টেলিকম অপারেটরদের কাছ থেকে কোটি কোটি টাকা চাঁদা দাবি করে ইউপিডিএফ। চাঁদা না দিলে মোবাইল টাওয়ারের ক্যাবল কেটে ফেলা, জেনারেটর চুরি, অগ্নিসংযোগ, কর্মীদের অপহরণ – এসব এখন নৈমিত্তিক ঘটনা। এক্ষেত্রে খাগড়াছড়ি ও রাঙামাটির ৩৫টি টাওয়ার ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঘটনায় এ অঞ্চলের যোগাযোগ ব্যবস্থা ভেঙে পড়ে।
পার্বত্য চট্টগ্রামের গোপন রাজনীতিতে ভারতের দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত আগ্রহ নতুন নয়। শান্তিচুক্তির ঠিক পরেই ইউপিডিএফ-এর জন্ম এবং তাদের হাতে প্রশিক্ষিত অস্ত্রের সরবরাহ- সব মিলিয়ে এটিকে শুধু অভ্যন্তরীণ সমস্যা বলে উড়িয়ে দেওয়া যায় না। ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর প্রত্যক্ষ মদদে ইউপিডিএফ পাহাড়ে একটি "জুম্মল্যান্ড" প্রতিষ্ঠার ষড়যন্ত্র করে আসছে। ফলে এটি কেবল একটি জাতীয় নিরাপত্তার ইস্যু নয়, বরং বৈদেশিক হস্তক্ষেপের প্রেক্ষাপটেও বিচারযোগ্য।
এই প্রেক্ষাপটে ইউপিডিএফ (প্রসীত)–এর প্রতিনিধি মাইকেল চাকমা, যিনি নিজে একাধিক হত্যা, চাঁদাবাজি ও সন্ত্রাসের মামলার আসামি, তার নেতৃত্বে একটি প্রতিনিধি দলের সঙ্গে সরকারঘনিষ্ঠ বুদ্ধিজীবীদের বৈঠক তীব্র উদ্বেগজনক। জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সহ-সভাপতি অধ্যাপক আলী রিয়াজ যেভাবে এই সশস্ত্র দলটিকে "নাগরিক অধিকারের সংগ্রামী দল" হিসেবে স্বীকৃতি দেন, তা অত্যন্ত দুঃখজনক এবং বিপজ্জনকও বটে।
প্রশ্ন হচ্ছে—চাঁদাবাজি, অপহরণ, খুন, অগ্নিসংযোগ এবং রাষ্ট্রবিরোধী তৎপরতায় লিপ্ত কোনো দল কি কেবল "রাজনৈতিক দলের" ট্যাগ লাগালেই বৈধ হয়ে যায়? যদি তাই হয়, তবে তো দেশের প্রতিটি সন্ত্রাসী গোষ্ঠী নিজেদের রাজনৈতিক দল ঘোষণা করে রাষ্ট্রের সঙ্গে বৈঠকের দাবি তুলতে পারে।
একটি রাষ্ট্র যদি তারই বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়া ও সন্ত্রাস চালানো সংগঠনের সঙ্গে একই টেবিলে বসে, তবে এটা সাধারণ নাগরিকের কাছে কী বার্তা দেয়? যারা স্বজন হারিয়েছেন ইউপিডিএফ-এর হাতে, তারা কিভাবে এই বৈঠকের অর্থ ব্যাখ্যা করবেন?
ইউপিডিএফ এবং এ ধরনের সংগঠনগুলোর বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া সময়ের দাবি। প্রথমত, ইউপিডিএফ, জেএসএস (সন্তু) ও কেএনএফসহ সব সশস্ত্র সংগঠনকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করতে হবে। এদের নেতাদের বিচারের আওতায় আনতে হবে। তৃতীয়ত, পাহাড়ে সেনা ক্যাম্প বৃদ্ধি করে সীমান্তে বিজিবি বিওপি (বর্ডার অবজারভেশন পোস্ট) স্থাপন করে অস্ত্র, মাদক ও সন্ত্রাসী অনুপ্রবেশ বন্ধ করতে হবে। এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, ১৯০০ সালের ব্রিটিশ শাসনবিধিকে বাতিল করে পাহাড়ি-বাঙালি বৈষম্য দূর করতে হবে।
পার্বত্য চট্টগ্রাম বাংলাদেশের অবিচ্ছেদ্য অংশ। এই অঞ্চলে শান্তি, উন্নয়ন ও সহাবস্থান নিশ্চিত করতে হলে রাষ্ট্রকে শক্ত অবস্থানে যেতে হবে। যারা এই শান্তিকে নস্যাৎ করে বিভাজন সৃষ্টি করতে চায়, তাদের প্রতি কোনোরূপ রাজনৈতিক সহনশীলতা প্রদর্শন আত্মঘাতী হবে। একটি সন্ত্রাসী গোষ্ঠীকে রাজনৈতিক বৈধতা দেওয়া মানে হলো শত শত শহীদের রক্তের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করা। সুতরাং, এখনই সময় ইউপিডিএফ-এর মতো সংগঠনকে কঠোরভাবে নিষিদ্ধ ঘোষণা করে রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব রক্ষার পথে অবিচল থাকার।
-সাঈদ সেকেন্দার, শিক্ষক ও সাংবাদিক


