পার্বত্য চট্টগ্রামের ঘন সবুজ পাহাড়, ঝরনা আর বৈচিত্র্যময় সংস্কৃতির আড়ালে লুকিয়ে আছে এক জটিল সামাজিক বাস্তবতা। এখানকার চাকমা, মারমা, ত্রিপুরা সহ অন্যান্য ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর সমাজে নারীরা অর্থনীতির চালিকাশক্তি। কৃষিকাজ থেকে শুরু করে সংসারের হাল ধরেন পাহাড়ি নারীরা। কিন্তু এই নারীর ক্ষমতায়নের বিপরীতে পুরুষদের একটি বড় অংশ দিন কাটান বেকারত্ব আর উদ্দেশ্যহীনতায়। এই শূন্যতা পূরণ করতে অনেকে জড়িয়ে পড়ছেন সন্ত্রাসবাদে। পার্বত্য অঞ্চলে শান্তি ও স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠায় এই দ্বন্দ্বের গভীরে যাওয়া জরুরি।
মাতৃতান্ত্রিক সমাজে নারীর অদম্য লড়াই
পার্বত্য চট্টগ্রামের সমাজব্যবস্থায় নারীরা শুধু পরিবারের কর্ত্রী নন, অর্থনীতিরও কেন্দ্রবিন্দু। জুম চাষ থেকে শুরু করে বাড়ির আঙিনার সবজি চাষ, পশুপালন—প্রতিটি ক্ষেত্রে নারীর পরিশ্রমই মুখ্য। স্থানীয় ভাষায় একে বলা হয় "নারীদের জুম"। পাহাড়ের ঢালু জমিতে ফসল ফলানোর মতো কঠিন কাজটিও নারীদের হাতেই সম্পন্ন হয়। সমীক্ষা অনুযায়ী, পার্বত্য অঞ্চলের কৃষিশ্রমের ৮০%ই নারীদের দ্বারা পরিচালিত। এই পরিশ্রমের বিনিময়ে তারা সংসারের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করেন, সন্তানের শিক্ষার খরচ জোগান, এমনকি স্থানীয় বাজারে ফসল বিক্রি করে বাড়তি আয়ও করেন।
কিন্তু নারীর এই স্বাবলম্বীতার পেছনে লুকিয়ে আছে এক করুণ সত্য। পুরুষদের একটি বড় অংশ কাজের সংস্থানহীনতা আর সমাজের ঐতিহ্যগত ভূমিকা হারিয়ে ফেলার কারণে দিন কাটান নিষ্ক্রিয়তায়। অনেক পুরুষের মধ্যে কাজের প্রতি অনীহা বা দক্ষতার অভাবও দেখা যায়। ফলে, পারিবারিকভাবে নারীরাই প্রধান উপার্জনকারী হওয়ায় পুরুষেরা ক্রমশ হারিয়ে ফেলেন তাদের সামাজিক ভূমিকা।
বেকারত্বের গ্লানি ও সন্ত্রাসের ছায়া
পাহাড়ি পুরুষদের এই নিষ্ক্রিয়তার সুযোগ নেয় সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলো। যুবকদের মাঝে হতাশা, অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা আর সামাজিক মূল্যবোধের অবক্ষয়কে পুঁজি করে তারা জঙ্গি কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত করে। স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে আলাপচারিতায় উঠে আসে একই কথা: "যুবকেরা যখন দিনের পর দিন কাজ পায় না, তাদের হাতে অস্ত্র তুলে দেয়া সহজ হয়।"
২০১৯ সালের একটি গবেষণায় দেখা গেছে, পার্বত্য চট্টগ্রামে সন্ত্রাসী কার্যক্রমে জড়িতদের ৬০%ই ১৮-৩০ বছর বয়সী বেকার যুবক। এদের অনেকেই স্বীকার করেন, কাজের অভাবে তারা জড়িয়ে পড়েছেন মাদক পাচার, চাঁদাবাজি বা সশস্ত্র সংঘর্ষে। অন্যদিকে, নারীরা অর্থনৈতিকভাবে সক্রিয় হলেও সামাজিক নিরাপত্তাহীনতা তাদের জীবনেও আনে দুশ্চিন্তার ছায়া।
এই সংকটের মূলে শুধু অর্থনৈতিক কারণই নয়, রয়েছে ঐতিহাসিক ও রাজনৈতিক স্তরও। পার্বত্য চট্টগ্রাম শান্তি চুক্তির পর থেকে অঞ্চলটিতে উন্নয়ন প্রকল্প বাড়লেও তা স্থানীয়দের কর্মসংস্থানের চাহিদা মেটাতে পারেনি। পর্যটনশিল্পের সম্প্রসারণে তৈরি হওয়া হোটেল-রিসোর্টে চাকরি পায় মূলত নারীরা, যেখানে পুরুষরা পিছিয়ে রয়েছেন শিক্ষা ও দক্ষতার অভাবে। এছাড়া, ভূমি বিরোধ, প্রাকৃতিক সম্পদের ওপর নিয়ন্ত্রণ আর রাজনৈতিক অস্থিরতা যুব সমাজকে ঠেলে দিচ্ছে সহিংসতার দিকে।
এই অপ্রতিষ্ঠিত ও অলস পুরুষদের মাঝে রাজনৈতিক ও সামাজিক সচেতনতার অভাবও স্পষ্ট। তাদের মধ্যে আত্মসমালোচনা, সৃজনশীলতা বা নিজেকে বিকশিত করার প্রবণতা অত্যন্ত কম। ফলে, এরা নিজেদের অবস্থান পরিবর্তনের জন্য কোনো ইতিবাচক উদ্যোগ নিতে ব্যর্থ হয়। এ অবস্থায়, সমাজে ইতিবাচক পরিবর্তনের পরিবর্তে, নেতিবাচক দিক থেকেই আত্মপ্রকাশ পায় সন্ত্রাসবাদ।
অর্থাৎ পার্বত্য অঞ্চলে সন্ত্রাসমূলক কার্যকলাপের অন্যতম কারণ হিসেবে এই অলসতা ও সুযোগের অভাবকে তুলে ধরা যায়। যদি পুরুষরা তাদের অলসতাকে কাটিয়ে উঠতে না পারে, তবে তা ভবিষ্যতে আরও বেশি সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের সূচনা করে দিতে পারে। অনেক ক্ষেত্রে দেখা গেছে, বেকার যুবকরা সন্ত্রাসবাদী গোষ্ঠীর কাছে যোগ দিয়ে তাদের সমাজের সমস্যার সমাধানের আশায়, বা নিজেদের মূল্যায়নের বিকল্প হিসেবে, নেতিবাচক পথে ঝুঁকতে শুরু করে।
সমাধানের পথ:
১. কর্মসংস্থান সৃষ্টি: পাহাড়ের উপযোগী শিল্প যেমন হস্তশিল্প, জৈব কৃষি, ইকো-ট্যুরিজমে যুবকদের প্রশিক্ষণ দিতে হবে। রাঙামাটি বা বান্দরবানে স্কিল ডেভেলপমেন্ট সেন্টার স্থাপন করা যেতে পারে।
২. নারী-পুরুষের সমন্বয়: নারীর অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নের পাশাপাশি পুরুষদের জন্য ভোকেশনাল ট্রেনিং প্রয়োজন। পারিবারিকভাবে নারী-পুরুষের সমঝোতা বাড়াতে সামাজিক প্রচারণা চালানো যেতে পারে।
৩. শিক্ষার সম্প্রসারণ: প্রাথমিক স্তর থেকেই কারিগরি শিক্ষার উপর জোর দিয়ে যুবকদের উদ্যোক্তা হিসেবে গড়ে তোলা যায়।
৪. সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্ব: পার্বত্য অঞ্চলের অনন্য চাহিদা অনুযায়ী নীতি প্রণয়ন করতে হবে। স্থানীয় এনজিও ও সামাজিক সংগঠনগুলোর সঙ্গে সমন্বয় করে ক্ষুদ্র ঋণ প্রকল্প চালু করা যেতে পারে।
পার্বত্য চট্টগ্রামের নারীরা যে সাফল্যের পরিচয় দিচ্ছেন, তা পুরুষ সমাজের অংশগ্রহণ ছাড়া পূর্ণতা পাবে না। এই অঞ্চলের টেকসই শান্তি ও উন্নয়নের জন্য নারী-পুরুষের সম্মিলিত প্রচেষ্টা জরুরি। সরকারি নীতিতে যদি স্থানীয় সংস্কৃতির প্রতি সংবেদনশীল হয়ে কর্মসংস্থান ও শিক্ষার সুযোগ সৃষ্টি করা যায়, তাহলে সন্ত্রাসবাদের বিষবৃক্ষ শুকিয়ে যাবে নিজে থেকেই। পাহাড়ের সৌন্দর্য তখনই প্রকৃত অর্থে উজ্জ্বল হবে, যখন এর প্রতিটি বাসিন্দা অর্থনৈতিক ও সামাজিকভাবে স্বাবলম্বী হয়ে উঠবেন।
-গোলাম যাকারিয়া, সাংবাদিক ও কলামিস্ট
পার্বত্য চট্টগ্রামে কর্মজীবী নারী ও পুরুষের বেকারত্ব: সন্ত্রাসবাদের অদৃশ্য সমীকরণ
পার্বত্য চট্টগ্রামে নারীরা অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি হলেও পুরুষদের বেকারত্ব উদ্বেগজনকভাবে বাড়ছে। এই পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলো যুবকদের নিজেদের দলে টানছে।
সি
স্টাফ রিপোর্টার
৯ মার্চ, ২০২৫ ৬:৪৭ পূর্বাহ্ন৩ মিনিট পড়া

ছবি: সংগৃহীত

