দুই মাস ধরে খাগড়াছড়ির রামগড় উপজেলার কয়েক হাজার মানুষ যেন তথ্য-অন্ধকারে বসবাস করছে। মোবাইল নেটওয়ার্ক ও ইন্টারনেট সেবা কার্যত বন্ধ। সরকারি-বেসরকারি অফিসের কাজকর্মে বিপর্যয় নেমে এসেছে, প্রবাসী পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন, মোবাইল ব্যাংকিং সেবা থেমে গেছে, এমনকি জরুরি মুহূর্তে সহায়তার জন্য ফোন করাটাও এখন বিলাসিতা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
এ যেন একবিংশ শতাব্দীর ডিজিটাল বাংলাদেশে প্রাগৈতিহাসিক বিচ্ছিন্নতার চিত্র। অথচ আমরা গর্ব করে বলি- ‘দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলেও এখন ডিজিটাল সেবা পৌঁছে গেছে।’ রামগড়বাসী হয়তো তিক্ত হাসি দিয়ে বলবে, এই ডিজিটাল সেবা এখন শুধু কাগজে-কলমে।
সরকারি-বেসরকারি কেউই সরাসরি মুখ খুলতে চায় না। তবে স্থানীয় সূত্র বলছে, এ বিপর্যয়ের মূল কারণ আঞ্চলিক সশস্ত্র সংগঠনের বেপরোয়া তৎপরতা। চাঁদাবাজির অভিযোগ নতুন নয়, কিন্তু এবার ব্যাপারটা সরাসরি যোগাযোগ অবকাঠামো ধ্বংসের দিকে গড়িয়েছে। বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা, টাওয়ারে অগ্নিসংযোগ, অপারেটর কর্মীদের অপহরণ সবই ঘটেছে এখানে।
সংবাদমাধ্যমে বলা হয়েছে- একজন টাওয়ার কেয়ারটেকার জানান, ইউপিডিএফ পরিচয়ে দু’জন এসে স্পষ্ট জানিয়ে গেছে- “তাদের অনুমতি ছাড়া টাওয়ারে কোনো কার্যক্রম করা যাবে না।” অর্থাৎ, রাষ্ট্রীয় সেবার ওপর বেসরকারি অপারেটর নয়, বরং সশস্ত্র গোষ্ঠীর নিয়ন্ত্রণ!
মোবাইল অপারেটর কোম্পানিগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ করলে তারা ‘ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের অনুমতি’ বা ‘প্রযুক্তিগত জটিলতা’ বলে এড়িয়ে যান। হয়তো তাদেরও ভয় আছে, কিংবা নিরাপত্তা নিশ্চয়তা নেই। কিন্তু প্রশ্ন হলো- এটা কি শুধুই বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের দায়? ব্যবসায়িক বা বিনিয়োগ নিরাপত্তা কোথায়? এই টাওয়ারগুলোর নিরাপত্তা, অবকাঠামো রক্ষণাবেক্ষণ ও সেবা সচল রাখা কি রাষ্ট্রের দায়িত্ব নয়?
সরকারি কর্মকর্তারাও দায় এড়িয়ে যাচ্ছেন। রামগড় উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা বলেছেন, “সমস্যা সমাধানের চেষ্টা চলছে।” কিন্তু এ চেষ্টা কবে সফল হবে, তার কোনো সময়সীমা নেই। দুই মাস ধরে মানুষ নেটওয়ার্কবিহীন জীবন কাটাচ্ছে- এটা কি ছোটখাটো সমস্যা?
সবচেয়ে বিস্ময়কর বিষয় হলো, যেসব সশস্ত্র গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠছে, তারা প্রকাশ্য সভা-সমাবেশ করছে, গণমাধ্যমে বক্তব্য দিচ্ছে। তাদের অস্ত্রধারী সদস্যরা গ্রামে-গঞ্জে অবাধে চলাফেরা করছে। তাহলে কি রাষ্ট্র তাদের সঙ্গে এক ধরনের ‘অঘোষিত সহাবস্থান’ মেনে নিয়েছে? নাকি নিয়ন্ত্রণের সক্ষমতা হারিয়েছে?
এখানে প্রশ্ন আসে- রাষ্ট্রের ভূমিকা কি? যদি রাষ্ট্র এই সন্ত্রাসী কার্যকলাপ থামাতে অক্ষম হয়, তবে তা শুধু স্থানীয় জনগণ নয়, গোটা দেশের জন্য ভয়াবহ সংকেত।
নেটওয়ার্ক বিপর্যয়ের ফলে মোবাইল ব্যাংকিং বন্ধ হয়ে যাওয়ায় রেমিট্যান্সপ্রাপ্ত পরিবারগুলো মারাত্মক সমস্যায় পড়েছে। স্থানীয় ব্যবসায়ীরা লেনদেন করতে পারছেন না। ব্যাহত হচ্ছে শিক্ষা সেবা, অনলাইনভিত্তিক পড়াশোনা বা পরীক্ষার কার্যক্রম বন্ধ হয়ে গেছে। জরুরি সময়ে ডাক্তার বা অ্যাম্বুলেন্সে ফোন করার সুযোগ নেই। কঠিন হয়ে পড়েছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী বা ফায়ার সার্ভিসে খবর দেওয়া। এ অবস্থায়, রামগড়ের মতো সীমান্তবর্তী ও সংবেদনশীল এলাকায় নেটওয়ার্ক বিপর্যয় শুধু প্রযুক্তিগত সমস্যা নয়- এটি সরাসরি জাতীয় নিরাপত্তা হুমকি।
বাস্তবতা হলো, বর্তমানে খাগড়াছড়ির কয়েকটি এলাকায় সশস্ত্র গোষ্ঠীর কথাই শেষ কথা। তারা চাইলে টাওয়ার সচল থাকবে, না চাইলে বন্ধ হয়ে যাবে। রাষ্ট্রের কর্তৃত্ব এখানে কার্যত অনুপস্থিত। তাহলে কি বলা যায়, রাষ্ট্র সশস্ত্র গোষ্ঠীর সঙ্গে পাল্লায় হেরে যাচ্ছে? উত্তর দিতে হয়তো কেউই চাইবে না, কিন্তু বাস্তব ঘটনা বলছে- রাষ্ট্রের সক্ষমতা প্রশ্নবিদ্ধ।
এই সংকট উত্তরণে সরকারের উচিত দ্রুত নেটওয়ার্ক টাওয়ারে নিরাপত্তা বাহিনী মোতায়েন করা। টাওয়ারে সোলার ও জেনারেটরের সুবিধা বাড়ানো, বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন করলেও যাতে নেটওয়ার্ক সচল থাকে। সশস্ত্র তৎপরতার বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি বাস্তবায়ন। গোয়েন্দা তৎপরতা বৃদ্ধির মাধ্যমে সন্ত্রাসী চাঁদাবাজি চক্রের অর্থ ও অস্ত্র সরবরাহ চ্যানেল বন্ধ করা। সরকার চাইলে স্থানীয়দের নিরাপত্তা সহযোগী হিসেবে যুক্ত করতে পারে, যাতে তারা দ্রুত তথ্য সরবরাহ করতে পারে।
রামগড়ের নেটওয়ার্ক বিপর্যয় শুধু একটি প্রযুক্তিগত সমস্যা নয়, এটি রাষ্ট্রীয় কর্তৃত্ব, নিরাপত্তা ও জনগণের অধিকার নিয়ে বড় ধরনের প্রশ্ন। যদি একটি সশস্ত্র গোষ্ঠী রাষ্ট্রের মৌলিক সেবা স্থবির করে দিতে পারে, তাহলে আগামী দিনে তারা আর কী করতে সক্ষম- এ প্রশ্ন আমাদের ভাবিয়ে তুলতে বাধ্য করে।
-গোলাম যাকারিয়া, সাংবাদিক ও কলামিস্ট


