আবার পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বাস্তবায়ন নিয়ে পাহাড়কে অস্থিতিশীল করার জন্য মাথাচারা দিয়ে উঠেছে জনসংহতি সমিতি (জেএসএস) সমর্থিত একটি গোষ্ঠী। ইতিপূর্বেই ঢাকা ছাড়াও পার্বত্য অঞ্চলের বেশ কয়েকটি স্থানে সভা-সমাবেশ করেছে এদের একাংশ। সোমবার (২৫ নভেম্বর) রাজধানীর তেজগাঁও প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয়ে প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম-এর নিকট একটি খোলা চিঠি হস্তান্তর করেছে পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বাস্তবায়ন আন্দোলন।
সংশ্লিষ্ট বিষয়ে বিশেষজ্ঞদের ধারণা, আসছে ২ ডিসেম্বর পার্বত্য চট্টগ্রাম শান্তিচুক্তি দিবস। আর এ উপলক্ষ্যেই মাঠ চাঙ্গা করতে চায় সন্তু লারমার নেতৃত্বাধীন জনসংহতি সমিতি (জেএসএস)-সহ সমমনা দল ও তাদের নেতারা। তাদের মতে, পাহাড়ের রাজনীতিতে নিজেদের প্রাসঙ্গিক রাখতেই তাদের এই প্রয়াস। তাছাড়া বর্তমান সরকার সম্প্রতি নানা ধরণের দাবি-দাওয়ার মুখে, সহজেই এসব দাবি তুলে পাহাড়কে অস্থির করা সহজ বলে মনে করছে এই গোষ্ঠী।
পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বাস্তবায়ন আন্দোলনের ওই চিঠিতে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের কর্মসূচিতে পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বাস্তবায়নের বিষয়টি অগ্রাধিকার তালিকায় রাখার দাবি জানানো হয়েছে। চিঠিতে বলা হয়, নতুন বাংলাদেশ বিনির্মাণে নতুন সরকারের অভিযাত্রায় আমরা ঐতিহাসিক পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বাস্তবায়নের দিকে একটি গুরুত্বপূর্ণ সম্ভাবনার নতুন বাঁকে এসে দাঁড়িয়ে আছি। ১৯৯৭ সালের ২ ডিসেম্বর পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি স্বাক্ষরের পর ২৬ বছর ধরে চুক্তির 'মূল' উপাদানগুলি অবাস্তবায়িত রয়েছে, যা পার্বত্য চট্টগ্রামের পাহাড়ি জনগণ এবং সারাদেশের নাগরিকদের এক অনিশ্চয়তার মধ্যে ফেলেছে। এই চুক্তির পূর্ণাঙ্গ ও যথাযথ বাস্তবায়ন শুধু পার্বত্য চট্টগ্রামের স্থায়ী শান্তি ও স্থিতিশীলতার জন্যই নয়; বরং বাংলাদেশের 'আদিবাসীদের' মর্যাদা ও অধিকার সমুন্নত রাখা এবং একই সঙ্গে দেশের জাতীয় ঐক্যের জন্য অপরিহার্য।
চিঠিতে ৭ দফা দাবি তুলে ধরা হয়। দাবিগুলোর মধ্যে প্রথমটি হলো চুক্তি বাস্তবায়নে সুনির্দিষ্ট সময়সীমাভিত্তিক একটি সুস্পষ্ট ও কার্যকর পরিকল্পনা প্রণয়ন করা। এ ছাড়া পার্বত্য চট্টগ্রামে সামরিক তত্ত্বাবধান বন্ধ; চুক্তির বিধানের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে পাহাড়ের শাসনকাঠামো বিকাশের ব্যবস্থা গ্রহণ, আঞ্চলিক ও জেলা পরিষদের ক্ষমতায়ন, ভূমি অধিকার এবং ভারত থেকে আগত পাহাড়ী শরণার্থী ও অভ্যন্তরীণ উদ্বাস্তুদের পুনর্বাসন, অর্থনৈতিক অন্তর্ভুক্তি ও উন্নয়ন, সমতলের 'আদিবাসীদের' জন্য প্রতিনিধিত্বশীল শক্তিশালী গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা গ্রহণ এবং সমতলের আদিবাসীদের জন্য পৃথক ভূমি কমিশন প্রতিষ্ঠা।
এসব দাবির পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন শুরু করার লক্ষ্যে পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বাস্তবায়ন অগ্রাধিকার তালিকায় রাখার দাবি করা হয়। এ জন্য পাঁচ বিষয় দ্রুত বাস্তবায়ন করার দাবিও রাখা হয় চিঠিতে। সেগুলো হলো পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ কমিটির পুনর্গঠন, পার্বত্য চট্টগ্রাম ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি কমিশন সক্রিয় করা, আঞ্চলিক পরিষদের সঙ্গে সংলাপ, পার্বত্য চট্টগ্রাম মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা পরিষদ পুর্নগঠন এবং সমতলের আদিবাসীদের ভূমি ও মানবাধিকার রক্ষায় উদ্যোগ গ্রহণ।
চট্টগ্রাম চুক্তির পর থেকে এর বাস্তবায়নের অগ্রগতি নিয়ে নানা বিবেদ আছে। এর আগের  সরকারের পক্ষ থেকে চুক্তির নব্বইভাগ বাস্তবায়ন হয়েছে বলে বিভিন্ন সময় বলা হয়েছে। তবে পিসিজেএসএসসহ বিভিন্ন পাহাড়ি নেতাদের দাবি ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি, উদ্বাস্তুদের পুনর্বাসন, জেলা পরিষদের হাতে পুলিশ বিভাগকে হস্তান্তর করা এবং বিভিন্ন সামাজিক ও সাংস্কৃতিক প্রথাগত অধিকারসহ গুরুত্বপূর্ণ বেশকিছু ধারার পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন।
অন্যদিকে, বাঙালি নেতারা বলছেন, পার্বত্য চুক্তির যে ধারাগুলো বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়নি সেই ধারাগুলো সংবিধান সম্মত নয় এবং নাগরিক অধিকারের পরিপন্থী।এসব ধারা সংবিধানের আলোকে সংশোধন করে নাগরিক অধিকার নিশ্চিত ও বাস্তবায়ন করা সম্ভব হবে।
এর আগে এপ্রিলে জাতিসংঘের স্থায়ী ফোরামের ২৩তম অধিবেশনে পার্বত্য চট্রগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিব মোঃ মশিউর রহমান  ‘পার্বত্য শান্তিচুক্তি’ বাস্তবায়নের অগ্রগতি তুলে ধরেন, সেখানে তিনি বলেন, একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক এবং অংশগ্রহণমূলক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে এর ধারাগুলি বাস্তবায়নের প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে। মোট ৭২টি ধারার মধ্যে ইতোমধ্যে ৬৫টি সম্পূর্ণরূপে বাস্তবায়িত হয়েছে, ৩টি আংশিকভাবে বাস্তবায়িত হয়েছে এবং ৪টি ধারা বাস্তবায়নাধীন রয়েছে।
বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সাবেক প্রতিমন্ত্রী কুজেন্দ্র লাল ত্রিপুরা গণমাধ্যমে দেওয়া সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন,‘ধাপে ধাপে চুক্তির পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন করা হবে। চুক্তির শর্ত মতে ৭২ টি ধারার মধ্যে শতকরা ৯০ভাগ ধারা বাস্তবায়ন করা হয়েছে। বাকিগুলোর আংশিক বাস্তবায়ন হয়েছে এবং কিছু প্রক্রিয়াধীন আছে। চুক্তির অংশ হিসেবে তিন পার্বত্য জেলা পরিষদতে ন্যস্ত বিভাগগুলোর অধিকাংশ হস্তান্তর করা হয়েছে। খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলা পরিষদের ৩৩টি বিভাগের মধ্যে ৩০টি বিভাগ হস্তান্তর করা হয়েছে। বাকি ৩টি বিভাগ হস্তান্তরের জন্য দাফতরিক কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে।
উপজাতিদের অনেক নেতাই মনে করেন, ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তির জন্য কমিশন সক্রিয়ভাবে কাজ করছে। পাহাড়ি নেতারা আন্তরিক হলে ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি দ্রুত হবে। পাহাড়ে বসবাসকারীদের ও সব দলের নেতাদের আন্তরিক সহযোগিতা পেলে চুক্তির পুনর্বাস্তবায়ন সম্ভব। তারা বলেন, পার্বত্য চট্টগ্রামে প্রচলিত আইন, বিধি, রীতি ও বসবাসকারী সব লোকজনের অধিকার মাথায় রেখে কাজ করা হচ্ছে বিধায় একটু সময় লাগছে। 
এসব দাবির পরিপেক্ষিতে জেএসএস-এমএন লারমা গ্রুপের সাবেক সভাপতি সুধাসিন্ধু খীসা গণমাধ্যমে বলেছেন,‘সরকার চুক্তির বেশ কিছু ধারা বাস্তবায়ন করেছে তা সত্য। কিন্তু পার্বত্য চট্টগ্রামে ভূমি সমস্যার সমাধান, উদ্বাস্তু সমস্যার সমাধান, বাঙালিদের যত্রতত্র পুনর্বাসন বন্ধ, প্রশাসন-পুলিশ বাহিনী ও জেলা পরিষদের হাতে ন্যস্ত করা ছাড়া কখনও পার্বত্য চট্টগ্রামে প্রকৃত শান্তি প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব নয়।
এদিকে পাহাড়ে জেএসএস'র বিপক্ষ শক্তি হিসেবে পরিচিত ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট-ইউপিডিএফ (প্রসিত) আঞ্চলিক সংগঠনগুলোর মধ্যে ঐক্যের ডাক দিয়েছে। একইসাথে জেনে রাখা দরকার ইউপিডিএফ'র জন্ম শান্তিচুক্তির বিরোধীতা করে। শান্তিচুক্তি নিয়ে জেএসএস'র নিষ্ক্রিয়তার সমালোচনাকেও উৎসাহিত করে প্রসিত খীসার এই দলটি। ইউপিডিএফ'কে শত্রু বিবেচনায় রেখেই স্বভাবতই এ ঐক্যের ডাকে জেএসএস'র সাড়া দেওয়ার সম্ভাবনা নেই বললেই চলে। বরং উপজাতিদের মধ্যে ইউপিডিএফ বিরোধী মনোভাব সজাগ ও কর্মীদের চাঙ্গা রাখতেই জেএসএস শান্তিচুক্তির তাগাদায় মাঠ গরমের কৌশলকে বেছে নিতে পারে বলেই মনে করা যেতে পারে। 

লেখক --জাকারিয়া চৌধুরী, সাংবাদিক