ডোনাল্ড ট্রাম্প নিজেকে আন্তর্জাতিক শান্তির একজন স্থপতি হিসেবে উপস্থাপন করতে ভালোবাসেন। ইউক্রেনে যুদ্ধবিরতির ডাক দিয়ে তিনি নিজেকে একজন শান্তিকামী নেতা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে চেয়েছেন। কিন্তু গাজায় ইসরায়েলের গণহত্যার প্রতি তার সমর্থন এবং নীরবতা তার আসল চরিত্রকে উন্মোচিত করেছে। ট্রাম্পের এই দ্বিচারিতা শুধু আমেরিকার ভাবমূর্তিকেই ক্ষুণ্ন করছে না, বিশ্বব্যাপী শান্তি প্রতিষ্ঠার সম্ভাবনাকেও ধ্বংস করছে।
ইসরায়েল-ফিলিস্তিন সংঘাতের ইতিহাস জুড়েই দেখা গেছে, ইসরায়েল একের পর এক চুক্তি লঙ্ঘন করে চলেছে, আর আমেরিকা তাকে নির্বিচারে সমর্থন দিয়ে যাচ্ছে। ১৯৯৩ সালের অসলো চুক্তি থেকে শুরু করে ২০০৩ সালের রোডম্যাপ ফর পিস—প্রতিটি চুক্তিই ইসরায়েলের একতরফা লঙ্ঘনের শিকার হয়েছে। ইসরায়েলের কৌশল খুবই সহজ: প্রথমে চুক্তি স্বাক্ষর করা, তারপর চুক্তির শর্ত পালন না করে নতুন শর্ত চাপিয়ে দেওয়া, এবং শেষে ফিলিস্তিনিদেরকে শান্তি প্রক্রিয়ার বাধা হিসেবে চিহ্নিত করা। এই কৌশলটি বারবার পুনরাবৃত্তি হয়েছে, আর আমেরিকা কখনোই ইসরায়েলকে জবাবদিহিতার মুখোমুখি করেনি।
গাজায় ইসরায়েলের সাম্প্রতিক গণহত্যা এই দ্বিচারিতারই আরেকটি উদাহরণ। মার্চের ১৮ তারিখ থেকে ইসরায়েলি বাহিনী সহস্রাধিক ফিলিস্তিনিকে হত্যা করেছে, যাদের বেশিরভাগই ছিল নারী ও শিশু। এই হামলাগুলোকে ইসরায়েলের পক্ষ থেকে "ফিলিস্তিনি প্রতিরোধকে চুক্তি পুনর্বিবেচনায় বাধ্য করার কৌশল" হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, ইসরায়েল চুক্তির শর্ত মানতে অস্বীকার করছে এবং ফিলিস্তিনিদেরকে অনাহার ও হত্যার মাধ্যমে নতুন শর্ত চাপিয়ে দিচ্ছে।
এই পরিস্থিতিতে আমেরিকার ভূমিকা আরও বেশি হতাশাজনক। আমেরিকা, মিশর ও কাতারের মতো মধ্যস্থতাকারী দেশগুলো ইসরায়েলের লঙ্ঘনের বিরুদ্ধে কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নেয়নি। বরং, ট্রাম্প প্রশাসন ইসরায়েলের পক্ষে অবস্থান নিয়ে তাদেরকে আরও উৎসাহিত করেছে। গত ফেব্রুয়ারিতে ট্রাম্প সোশ্যাল মিডিয়ায় লিখেছিলেন, "ইসরায়েল যে সিদ্ধান্তই নিক না কেন, আমেরিকা তা সমর্থন করবে!" এই বক্তব্য ইসরায়েলকে গাজায় গণহত্যা চালিয়ে যাওয়ার জন্য সবুজ সংকেত দিয়েছে।
ট্রাম্পের এই দ্বিচারিতা শুধু ফিলিস্তিনিদের জন্যই বিপজ্জনক নয়, এটি বিশ্বব্যাপী আমেরিকার ভাবমূর্তিকেও ধ্বংস করছে। ইউক্রেনে শান্তির কথা বলার সময় ট্রাম্পের মুখে যেন নৈতিকতার বুলি ফুটে ওঠে। কিন্তু গাজায় গণহত্যার প্রতি তার সমর্থন এবং ইসরায়েলের প্রতি তার অন্ধ আনুগত্য তার আসল চরিত্রকে প্রকাশ করে। ট্রাম্পের এই নীতিহীনতা আমেরিকাকে বিশ্বব্যাপী একটি অবিশ্বস্ত ও স্বার্থপর রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করছে।
আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ও ইসরায়েলের বিরুদ্ধে কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নিতে ব্যর্থ হয়েছে। জাতিসংঘ, ইউরোপীয় ইউনিয়ন এবং অন্যান্য আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো ইসরায়েলের লঙ্ঘনের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিতে পারেনি। এই নিষ্ক্রিয়তা ইসরায়েলকে আরও বেশি উৎসাহিত করেছে। তারা জানে যে, আমেরিকার সমর্থন এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের নিষ্ক্রিয়তার কারণে তাদের কোনো শাস্তি হবে না।
এই পরিস্থিতিতে ফিলিস্তিনিদের জন্য ন্যায়বিচার পাওয়ার কোনো আশাই নেই। ইসরায়েলের গণহত্যা এবং চুক্তি লঙ্ঘনের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া উচিত। আমেরিকাকে অবশ্যই তার ভূমিকা পুনর্বিবেচনা করতে হবে এবং ইসরায়েলের প্রতি তার অন্ধ সমর্থন বন্ধ করতে হবে। নইলে শান্তি প্রতিষ্ঠার কোনো সম্ভাবনাই নেই।
ট্রাম্পের দ্বিচারিতা এবং ইসরায়েলের গণহত্যার প্রতি তার সমর্থন শুধু ফিলিস্তিনিদের জন্যই নয়, পুরো বিশ্বের জন্যই হুমকিস্বরূপ। এই নীতিহীন নেতৃত্বের অবসান ঘটানো জরুরি। নইলে শান্তি ও ন্যায়বিচারের স্বপ্ন কেবলই স্বপ্ন থেকে যাবে।
-গোলাম যাকারিয়া, সাংবাদিক ও কলামিস্ট
ট্রাম্পের কত রূপ! গাজায় গণহত্যা- ইউক্রেনে শান্তির দূত
গাজায় ইসরায়েলের গণহত্যায় ট্রাম্পের নীরব সমর্থন এবং ইউক্রেন যুদ্ধবিরতিতে তার সক্রিয়তা দ্বিচারিতার প্রকাশ। এই নীতিহীন অবস্থান বিশ্ব শান্তির জন্য হুমকি।
সি
স্টাফ রিপোর্টার
২৩ মার্চ, ২০২৫ ৮:০৪ পূর্বাহ্ন২ মিনিট পড়া

ছবি: সংগৃহীত

