রাঙামাটির পার্বত্য তিনটি উপজেলা- বাঘাইছড়ি, লংগদু ও নানিয়ারচরকে সংযুক্ত করে জেলা সদর ও পার্শ্ববর্তী খাগড়াছড়ি, চট্টগ্রামের সঙ্গে যোগসূত্র স্থাপন করতে ‘বগাছড়ি-নানিয়ারচর-লংগদু’ আঞ্চলিক সড়ক নির্মাণের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। প্রায় ৩৭ দশমিক ৫০ কিলোমিটার দীর্ঘ এই সড়কটি নির্মাণ হলে পার্বত্য এলাকার মানুষদের যোগাযোগ ব্যবস্থা উল্লেখযোগ্যভাবে সহজতর হবে। ফলে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, ব্যবসা-বাণিজ্য ও জরুরি সেবা লাভের ক্ষেত্রে অভূতপূর্ব উন্নয়ন ঘটবে। দীর্ঘদিন ধরে এই সড়ক নির্মাণের অপেক্ষায় থাকা স্থানীয় জনগণ একদিকে যেমন স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলেছে, অন্যদিকে সেখানে অবৈধ অস্ত্রধারী সংগঠন ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্র্যাটিক ফ্রন্ট (ইউপিডিএফ) সড়ক নির্মাণে বাধা দেয়ার মাধ্যমে উন্নয়নের গতি থমকে দেয়ার চেষ্টা চালাচ্ছে। সম্ভাব্য কারণগুলো আলোচনা করা যেতে পারে-
প্রথমত, ইউপিডিএফের বাঁধা দেওয়ার অন্যতম প্রধান কারণ হল তাদের নিজেদের অস্ত্র ও সন্ত্রাসী কার্যক্রমের অব্যাহত অবস্থান নিশ্চিত করা। পার্বত্য এলাকায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দ্রুত ও সহজ গতিশীলতা ইউপিডিএফের অবৈধ অস্ত্র কার্যক্রম, চাঁদাবাজি ও সন্ত্রাসী দমনে বড় ধাক্কা হতে পারে। নতুন সড়ক নির্মাণ হলে নিরাপত্তা বাহিনী দ্রুত ওই দুর্গম এলাকায় পৌঁছে তাদের দমনে সক্ষম হবে, যা ইউপিডিএফের জন্য একটি বড় হুমকি। ফলে, তারা নিজেরাই ঐতিহাসিকভাবে ‘অভিযোজন’ করে আসা উন্নয়ন প্রকল্পগুলোতে বাধা দিয়ে নিজেদের রাজনৈতিক ও অস্ত্রধারী আধিপত্য রক্ষার চেষ্টা করে। এই বাধা দিয়ে তারা শুধু নিজেদের ক্ষমতা ধরে রাখতে চায়, সমাজের সমগ্র উন্নয়নকে নিজেদের স্বার্থবিরোধী মনে করে।
দ্বিতীয়ত, ইউপিডিএফের জন্য উন্নয়ন প্রকল্পগুলো শুধুমাত্র ‘বাহ্যিক হুমকি’ নয়, বরং তাদের ‘অর্থনৈতিক উৎস’ হিসেবেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। পার্বত্য অঞ্চলে অবৈধ অস্ত্রধারী গোষ্ঠী হিসেবে তাদের চাঁদাবাজি, জোরপূর্বক আর্থিক দাবি, বনজ সম্পদ দখলসহ বিভিন্ন অপরাধমূলক কার্যক্রমের মাধ্যমে অর্থ সংগ্রহের একটি বড় নেটওয়ার্ক রয়েছে। উন্নত সড়ক ও যোগাযোগ ব্যবস্থা এ সমস্ত অবৈধ অর্থ উপার্জনের পথ বন্ধ করে দিতে পারে, কারণ প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী কার্যক্রম আরও গতিশীল হবে। সুতরাং, ইউপিডিএফের পক্ষে উন্নয়ন প্রকল্পগুলো বাধাগ্রস্ত করা তাদের অর্থনৈতিক স্বার্থ রক্ষার জন্য অপরিহার্য।
তৃতীয়ত, ইউপিডিএফের অবস্থান রাজনৈতিক। দীর্ঘদিন ধরে পার্বত্য অঞ্চলে তারা নিজেদের ‘প্রতিনিধি’ হিসাবে উপস্থাপন করে আসছে। উন্নয়ন প্রকল্পগুলো পরিচালনার ক্ষেত্রে সরকারি তৎপরতা বাড়লে তাদের রাজনৈতিক প্রভাব সংকুচিত হবে, যা তাদের অস্তিত্বের জন্য সংকট ডেকে আনবে। সড়ক নির্মাণের মাধ্যমে স্থানীয় মানুষের জীবনে ইতিবাচক পরিবর্তন আসার সঙ্গে সঙ্গে তাদের রাজনৈতিক স্বার্থ ও ক্ষমতার খতরার আশঙ্কা থাকে। এজন্য তারা উন্নয়ন প্রকল্পগুলোকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহার করে ভীতি, সন্ত্রাস ও বাধা সৃষ্টি করে।
চতুর্থত, পার্বত্য অঞ্চলের অনেক সময় স্থানীয় জনগণের অংশগ্রহণ ও মতামত পেছনে থেকে এসব সন্ত্রাসী গোষ্ঠী নিজেদের নিজস্ব স্বার্থ হাসিলের জন্য কাজ করে থাকে। যদিও এই সড়ক নির্মাণ প্রকল্পটি স্থানীয় মানুষের বহু বছর ধরে আকাঙ্ক্ষিত, তথাপি ইউপিডিএফ নিজেদের নিয়ন্ত্রণ বিস্তার করার জন্য স্থানীয় জনগণের ভয়-ভীতি সৃষ্টি করে প্রকৃত উন্নয়নচিন্তাকে ধ্বংস করে। তাদের কর্মকাণ্ড থেকে সাধারণ মানুষ অনেকে আজও নিরাপত্তাহীনতায় রয়েছে এবং উন্নয়নের সুফল থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।
স্থানীয়দের অভিমত স্পষ্ট যে, ‘বগাছড়ি-নানিয়ারচর-লংগদু’ সড়ক নির্মাণ হলে তারা শিক্ষা, স্বাস্থ্য, ব্যবসা-বাণিজ্য ও জরুরি সেবায় ব্যাপক সুবিধা পাবে। দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে স্কুল-কলেজ যাওয়া, রোগীকে হাসপাতালে পৌঁছানো বা পণ্যের বাজারজাত করা সহজ হবে। এসব উন্নয়ন অর্জন করার স্বপ্নকে ধ্বংস করে দিয়ে ইউপিডিএফ একদিকে সন্ত্রাসী কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে, অন্যদিকে সরকারের উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে বাধা প্রদান করে মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রাকে দুর্বিষহ করে তুলছে।
সরকার এবং সমাজের কাছে এটি স্পষ্ট হওয়া দরকার যে, পার্বত্য এলাকায় সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলোর অবৈধ কার্যক্রম দমন না করলে এ ধরনের উন্নয়ন প্রকল্পের কার্যকারিতা অর্ধেক থেকে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে। তাই সরকারকে দ্রুত ব্যবস্থা নিয়ে ইউপিডিএফের মতো সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর কার্যক্রম বন্ধ করতে হবে। প্রশাসনকে সশস্ত্র ও নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করে এই সড়ক নির্মাণ প্রকল্প দ্রুত বাস্তবায়ন করতে হবে যাতে দীর্ঘদিন ধরে উন্নয়নের স্বপ্ন দেখেও ভোগান্তির শিকার পাহাড়ের মানুষ তাদের প্রাপ্য সুযোগ পেতে পারে।
‘বগাছড়ি-নানিয়ারচর-লংগদু’ আঞ্চলিক সড়ক শুধুমাত্র একটি যোগাযোগ পথ নয়, এটি পার্বত্য এলাকার মানুষের উন্নয়ন, শান্তি ও নিরাপত্তার প্রতীক। ইউপিডিএফের অবৈধ কর্মকাণ্ড এই প্রতীককে বিনষ্ট করতে পারে না। পার্বত্যবাসী তাদের অধিকার ও উন্নয়ন চেয়ে স্বপ্ন দেখেছে বহু বছর, সেই স্বপ্নের পথে স্থবিরতা মেনে নেওয়া যায় না। তাই সরকারের দৃঢ় পদক্ষেপ ও জনগণের ঐক্যবদ্ধ চেষ্টায় এই সড়ক নির্মাণে বাধা অপসারণ করে পাহাড়ে শান্তি ও উন্নয়নের নতুন অধ্যায় শুরু করা অপরিহার্য।

-হাসান বিশ্বাস, সাংবাদিক