এক মৌসুমে লবণ, আরেক মৌসুমে ধান- কক্সবাজারের টেকনাফের উপকূলীয় কৃষিতে তৈরি হচ্ছে এমন এক নতুন সম্ভাবনা। বছরের একটি সময় লবণ উৎপাদনে ব্যবহৃত যেসব জমি পরে দীর্ঘদিন অনাবাদি পড়ে থাকত, সেসব জমিতে এখন চাষ হচ্ছে স্বল্পমেয়াদী ও উন্নত জাতের রোপা আমন ধান। লবণাক্ততা মোকাবিলা করে এসব জমিতে আশাব্যঞ্জক ফলন পাওয়ায় কৃষকদের মধ্যেও বাড়ছে আগ্রহ।

চলতি রোপা আমন মৌসুমে টেকনাফ উপজেলার পাঁচ ইউনিয়নে প্রায় ২০২ হেক্টর (৪৯৯ একর) লবণাক্ত জমিতে ধানের আবাদ হয়েছে। ব্রিধান-৩৩, ব্রিধান-৪৯, ব্রিধান-৭৫, বিনা-৭, বিন্নি ও পাইজামসহ বিভিন্ন জাতের ধান চাষ করেছেন কৃষকেরা। ইতোমধ্যে কোনো কোনো মাঠে ধান পেকে সোনালি হয়ে উঠেছে, আবার কোথাও চলছে কাটা ও মাড়াইয়ের প্রস্তুতি।

কৃষকদের অভিজ্ঞতা বলছে, লবণ চাষের পর একই জমিতে ধান আবাদ এখন আর অসম্ভব নয়। বরং সঠিক জাত, সময়মতো বীজ-সার ও কৃষি পরামর্শ পাওয়া গেলে এসব জমি থেকে বছরে দুই ধরনের ফসল ঘরে তোলা সম্ভব।

লবণ মাঠে সোনালি ধান

সরেজমিনে টেকনাফের হোয়াইক্যং, হ্নীলা, সদর, সাবরাং ও বাহারছড়ার বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা যায়, লবণ উৎপাদনের মৌসুম শেষ হওয়ার পর অনেক জমিতে রোপা আমনের আবাদ হয়েছে। কোথাও কৃষকেরা পাকা ধান কাটছেন, কোথাও শ্রমিক নিয়ে ধান কেটে স্তুপ করছেন।

সাবরাং ইউনিয়নের হারিয়াখালী এলাকার কৃষক নজির আহমদ বলেন, ‘‘একসময় লবণের মাঠে লবণ চাষ ছাড়া ধান চাষের কথা চিন্তাই করা যেত না। এখন লবণের মৌসুম শেষ হলে একই জমিতে ধান চাষ করছি। এতে একই জমি থেকে দুই ধরনের ফসল পাওয়া যাচ্ছে। কৃষি অফিস থেকে আরও সহযোগিতা পেলে উৎপাদন বাড়ানো সম্ভব।”

হারিয়াখালী দক্ষিণ পাড়ায় ৮ থেকে ১০ জন শ্রমিক নিয়ে ধান কাটছিলেন কৃষক রশিদ আহমদ। তিনি চলতি মৌসুমে ১০ কানি জমিতে ধান চাষ করেছেন। তাঁর হিসাবে ১০ কানি জমি প্রায় ৪০০ শতক।

রশিদ আহমদ বলেন, ‘ফলন মোটামুটি ভালো হয়েছে। তবে সার সংকটের কারণে উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে কিছুটা কম হতে পারে।’

একই এলাকার কৃষক নুর আলম ১২ কানি বা প্রায় ৪৮০ শতক জমিতে আগাম রোপা আমনের আবাদ করেছেন। তিনি বলেন, “প্রতি শতকে ৮০ থেকে ১০০ আড়ি পর্যন্ত ধান হতে পারে। সব মিলিয়ে প্রায় ২৮ থেকে ৩৫ মণ ধান উৎপাদনের আশা করছি। বৃষ্টি বা মৌসুমি আবহাওয়া ক্ষতি না করলে সুষ্ঠুভাবে ধান ঘরে তুলতে পারব।”

‘লবণের মাঠে ধান হবে-আগে ভাবাই যেত না’

সাবরাংয়ের মাঠে ধান কাটার সময় কথা হয় কৃষক নুরুল ইসলামের সঙ্গে। তিনি চলতি মৌসুমে ২০ কানি বা প্রায় ৮০০ শতক জমিতে ধানের আবাদ করেছেন।

তিনি বলেন, ‘লবণের মাঠে ধান হবে—আগে এটা ভাবাই যেত না। এখন কয়েক বছর ধরে চাষ করছি। ফলন ভালো হলে আমাদের জন্য খুবই লাভজনক। তবে আবহাওয়া এবং সার-বীজের সরবরাহ ঠিক থাকা জরুরি।’

সার সংকটের কথা উল্লেখ করে নুরুল ইসলাম আরও বলেন, ‘‘সঠিক সময়ে সার দিতে না পারায় ধানের কিছুটা ক্ষতি হয়েছে। সার সংকট ও পাচার বন্ধে সরকারের সংশ্লিষ্ট দপ্তরকে আরও কার্যকর ভূমিকা নিতে হবে।’’

আরেক কৃষক মোহাম্মদ বাদশা জানান, কয়েক বছর ধরে লবণ চাষের পর একই জমিতে রোপা আমন আবাদ করছেন তারা। এ বছর তিনি ১৫ কানি জমিতে ধান চাষ করেছেন।

বাদশা বলেন, ‘‘কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর থেকে ধানের বীজও দেওয়া হচ্ছে। এ বছর ১৫ কানি জমিতে ধান চাষ করেছি। ধান পাকা শুরু হয়েছে, এখন মাঠে কাটার ধুম পড়েছে। বৃষ্টি ক্ষতি না করলে ভালোভাবে ধান ঘরে তুলতে পারব। পরে আবার এই জমিতেই লবণ চাষ হবে।”

তবে সার সংকট নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করে তিনি বলেন, “সারের কৃত্রিম সংকট তৈরি করে কেউ কেউ মিয়ানমারে পাচার করছে। অথচ দেশের কৃষক সময়মতো ধানে সার দিতে পারছেন না। এতে উৎপাদন কমছে, কৃষকের ক্ষতি হচ্ছে এবং দেশের অর্থনীতিতেও এর প্রভাব পড়ছে।”

লবণাক্ত ২০২ হেক্টর জমিতে ধানের আবাদ

উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, চলতি রোপা আমন মৌসুমে টেকনাফে মোট ১১ হাজার ৭০ হেক্টর জমিতে বিভিন্ন ধরনের চাষাবাদ হয়েছে। এর মধ্যে লবণ মাঠে হোয়াইক্যংয়ে ৫০ হেক্টর, হ্নীলায় ৯০, টেকনাফ সদরে ১৫, সাবরাংয়ে ৪৫ এবং বাহারছড়ায় ২ হেক্টর মোট ২০২ হেক্টর জমিতে ধান চাষ হয়েছে।

কৃষক মোহাম্মদ জাফর, মোহাম্মদ আনোয়ার, মোহাম্মদ ফায়সাল, নুর হোছন, নুরুল আলম ও মোহাম্মদ আবদুল মান্নানসহ কয়েকজন জানান, লবণাক্ত জমিতে স্বল্পমেয়াদী জাতের ধান চাষ করে তারা আশানুরূপ ফলন পাচ্ছেন। প্রাকৃতিক দুর্যোগ না হলে প্রতি কানিতে প্রায় ১০০ আড়ি বা ৩৫ মণের বেশি ধান পাওয়ার আশা করছেন তারা।

তাদের মতে, লবণ উৎপাদনের মৌসুম শেষে জমি দীর্ঘ সময় ফেলে না রেখে সেখানে স্বল্পমেয়াদী ধানের আবাদ বাড়ানো গেলে কৃষকের আয় বাড়ার পাশাপাশি দেশের খাদ্য উৎপাদনও বাড়বে।

হ্নীলা ইউনিয়ন পরিষদের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান মোহাম্মদ আলী বলেন, “টেকনাফে প্রচুর লবণের মাঠ রয়েছে, যেগুলো লবণ মৌসুম শেষে খালি পড়ে থাকে। উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর যদি এসব জমি চিহ্নিত করে ধান চাষের আওতায় আনতে পারে, তাহলে এলাকার মানুষ উপকৃত হবে। পাশাপাশি দেশের খাদ্য উৎপাদনেও ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।”

উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা শফিউল আলম কুতুবী বলেন, “জেলার প্রত্যন্ত এলাকায় সারা বছর যে বিপুল পরিমাণ জমি পরিত্যক্ত পড়ে থাকে, সেখানে স্বল্পমেয়াদী জাতের ধান চাষ করা গেলে খাদ্য চাহিদা পূরণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। স্থানীয় উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তারা কৃষকদের প্রয়োজনীয় পরামর্শ ও সার্বিক সহযোগিতা দিয়ে যাচ্ছেন।”

টেকনাফ উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ কর্মকর্তা মো. হুমায়ুন কবির বলেন, “চলতি বছর আবহাওয়া অনুকূলে ছিল এবং কৃষি উপকরণও তুলনামূলক সহজলভ্য হওয়ায় রোপা আমনে ভালো ফলনের আশা করা যাচ্ছে। লবণাক্ত জমিতে ধান চাষের বিষয়টিও কৃষকদের মধ্যে নতুন আগ্রহ তৈরি করছে।”

টেকনাফের লবণ মাঠে ধান চাষ এখনো তুলনামূলক ছোট পরিসরে। তবে কৃষকদের মাঠপর্যায়ের অভিজ্ঞতা ও ফলন নতুন সম্ভাবনার ইঙ্গিত দিচ্ছে। লবণ উৎপাদনের পর একই জমিতে ধান চাষের এ পদ্ধতি পরিকল্পিতভাবে সম্প্রসারণ করা গেলে পতিত জমির ব্যবহার বাড়ানোর পাশাপাশি উপকূলীয় এলাকায় খাদ্য উৎপাদন ও কৃষকের আয়—দুটিই বাড়ানো সম্ভব।

কৃষকদের দাবি, লবণাক্ত জমির উপযোগী জাত নির্বাচন, মানসম্মত বীজ, সময়মতো সার সরবরাহ, সেচব্যবস্থা এবং নিয়মিত কৃষি পরামর্শ নিশ্চিত করা গেলে এ আবাদ আরও বিস্তৃত হবে।