পার্বত্য চট্টগ্রামের নিরাপত্তা পরিস্থিতিতে গত কয়েক বছরে সবচেয়ে আলোচিত সশস্ত্র সংগঠনগুলোর একটি কুকি-চিন ন্যাশনাল ফ্রন্ট (কেএনএফ)। ২০২২ সালে আত্মপ্রকাশের সময় সংগঠনটি নিজেদের বমসহ কয়েকটি ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও প্রশাসনিক অধিকার আদায়ের লক্ষ্যে গঠিত একটি রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্ম হিসেবে পরিচয় দেয়।
কিন্তু অল্প সময়ের মধ্যেই সংগঠনটি একটি সশস্ত্র রূপ নেয়। পরবর্তীতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে সংঘর্ষ, অপহরণ, চাঁদাবাজি, ব্যাংক ডাকাতি, অস্ত্র লুট এবং জঙ্গি প্রশিক্ষণের অভিযোগে সংগঠনটির নাম বারবার আলোচনায় আসে। নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, পার্বত্য চট্টগ্রামের দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক বিভাজন, দুর্গম ভৌগোলিক বাস্তবতা এবং প্রশাসনিক সীমাবদ্ধতার সুযোগে কেএনএফ দ্রুত নিজেদের সংগঠিত করতে সক্ষম হয়।
যদিও সংগঠনটি নিজেদের রাজনৈতিক অধিকার আদায়ের আন্দোলন বলে দাবি করে, নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মূল্যায়ন হলো- সময়ের সঙ্গে সঙ্গে কেএনএফ একটি সুসংগঠিত সশস্ত্র গোষ্ঠীতে পরিণত হয়েছে, যা শুধু পার্বত্য চট্টগ্রামের নয়, বাংলাদেশের সামগ্রিক অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তার জন্যও নতুন মাত্রার চ্যালেঞ্জ সৃষ্টি করেছে।
ব্যাংক হামলার পর পাল্টে যায় পরিস্থিতি
২০২৪ সালের এপ্রিল মাসে বান্দরবানের রুমা ও থানচিতে সোনালী ব্যাংক ও বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের শাখায় সমন্বিত হামলা, ব্যাংক ব্যবস্থাপককে অপহরণ এবং আনসার সদস্যদের অস্ত্র লুটের ঘটনা দেশজুড়ে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করে।
ঘটনার পর সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে কেএনএফকে দায়ী করে এবং সংগঠনটির সঙ্গে চলমান শান্তি আলোচনা স্থগিত ঘোষণা করে। একই সঙ্গে সেনাবাহিনীর নেতৃত্বে বিজিবি, র্যাব ও পুলিশকে নিয়ে যৌথ অভিযান শুরু হয়।
পরবর্তী কয়েক মাসে বান্দরবানের দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় ধারাবাহিক অভিযানে সংগঠনটির বহু সদস্যকে আটক করা হয়। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী বিপুল পরিমাণ অস্ত্র, গোলাবারুদ ও যোগাযোগ সরঞ্জাম উদ্ধারের পাশাপাশি কেএনএফের একাধিক ঘাঁটি ধ্বংসের দাবি করে।
বিশ্লেষকদের মতে, পার্বত্য শান্তিচুক্তির পর ধাপে ধাপে সেনা ক্যাম্প প্রত্যাহারের ফলে কিছু দুর্গম এলাকায় যে নিরাপত্তা শূন্যতা তৈরি হয়েছিল, কেএনএফ সেই পরিস্থিতির সুযোগ নিতে সক্ষম হয়।
তাদের মতে, শান্তি আলোচনার মতো রাজনৈতিক প্রক্রিয়া চলাকালে নিরাপত্তা ব্যবস্থায় শিথিলতা দেখা দিলে সশস্ত্র সংগঠনগুলো অনেক সময় নিজেদের শক্তি প্রদর্শন, দরকষাকষির সক্ষমতা বৃদ্ধি কিংবা কৌশলগত বার্তা দেওয়ার উদ্দেশ্যে সহিংস কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ে।
চাঁদাবাজি, অপহরণ ও আধিপত্য বিস্তারের অভিযোগ
আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও স্থানীয় প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, কেএনএফের বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন ধরেই অপহরণ, চাঁদাবাজি এবং দুর্গম এলাকায় আধিপত্য বিস্তারের অভিযোগ রয়েছে।
স্থানীয় ব্যবসায়ী, ঠিকাদার, পরিবহন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি এবং উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নকারী প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে নিয়মিত অর্থ আদায়ের অভিযোগ একাধিক মামলায় উঠে এসেছে।
যদিও কেএনএফ এসব অভিযোগ বরাবরই অস্বীকার করে আসছে। সংগঠনটির দাবি, তাদের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত প্রচারণা চালানো হচ্ছে।
নিষিদ্ধ উগ্রবাদী সংগঠনকে প্রশিক্ষণের অভিযোগ
কেএনএফের বিরুদ্ধে সবচেয়ে গুরুতর অভিযোগগুলোর একটি হলো নিষিদ্ধ উগ্রবাদী সংগঠন জামাআতুল আনসার ফিল হিন্দাল শারক্বীয়ার সদস্যদের পাহাড়ে সামরিক প্রশিক্ষণ ও আশ্রয় দেওয়া।
র্যাব এবং পুলিশের কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম (সিটিটিসি) ইউনিটের দাবি, অর্থের বিনিময়ে কেএনএফ ওই জঙ্গি সংগঠনের সদস্যদের প্রশিক্ষণ দিয়েছে। এ অভিযোগের ভিত্তিতে পরিচালিত একাধিক অভিযানে দুই সংগঠনের সদস্যদের গ্রেপ্তার করা হয়।
সাধারণ মানুষের ওপর প্রভাব
নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, কেএনএফ-সংক্রান্ত সংঘাতের সবচেয়ে বড় ভুক্তভোগী হয়েছে পার্বত্য অঞ্চলের সাধারণ মানুষ।
দুর্গম এলাকায় পর্যটন কার্যক্রম স্থবির হয়ে পড়ে, ব্যবসা-বাণিজ্য ক্ষতিগ্রস্ত হয়, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবা ব্যাহত হয়। নিরাপত্তাহীনতার কারণে অনেক পরিবার সাময়িকভাবে এলাকা ছেড়ে যেতে বাধ্য হয়েছে বলেও বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর অবস্থান
বান্দরবানের বমসহ কয়েকটি ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর প্রতিনিধিরা প্রকাশ্যে বলেছেন, কেএনএফ তাদের প্রতিনিধিত্ব করে না।
তাদের মতে, একটি সশস্ত্র সংগঠনের কর্মকাণ্ডের দায় পুরো একটি জনগোষ্ঠীর ওপর চাপানো উচিত নয়। তারা এই সশস্ত্র গ্রুপকে বয়কটের পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন।
আবারও সক্রিয় হওয়ার আশঙ্কা
আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের একটি অংশের মতে, সাম্প্রতিক সময়ে কেএনএফের সীমিত তৎপরতার ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে। দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় বিচ্ছিন্ন চলাচল, স্থানীয় পর্যায়ে যোগাযোগ পুনর্গঠন এবং কয়েকটি ছোট পরিসরের নাশকতামূলক কর্মকাণ্ডের তথ্য নিরাপত্তা সংস্থাগুলোর নজরে এসেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এ তৎপরতার পেছনে আঞ্চলিক ভূরাজনৈতিক বাস্তবতাও ভূমিকা রাখতে পারে। মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে সাম্প্রতিক মাসগুলোতে দেশটির সামরিক বাহিনী ব্যাপক বিমান হামলা, ভারী গোলাবর্ষণ এবং স্থল অভিযান জোরদার করেছে। এর ফলে আরাকান আর্মি (এএ) কয়েকটি কৌশলগত এলাকায় তীব্র সামরিক চাপে রয়েছে বলে বিভিন্ন নিরাপত্তা মূল্যায়নে উল্লেখ করা হয়েছে।
নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের ধারণা, কেএনএফ ও আরাকান আর্মির মধ্যে অতীতে গড়ে ওঠা যোগাযোগ ও সহযোগিতার প্রেক্ষাপটে সীমান্তবর্তী এলাকায় পরিস্থিতি জটিল হয়ে উঠতে পারে। যদি আরাকান আর্মির কিছু সদস্য বা নেতৃত্ব সীমান্তসংলগ্ন অঞ্চলে নিরাপদ আশ্রয়ের চেষ্টা করে, তাহলে কেএনএফ তাদের সহায়তার চেষ্টা করতে পারে- এমন আশঙ্কাও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না। তবে এ ধরনের সম্ভাবনার বিষয়ে এখনো স্বাধীনভাবে যাচাইযোগ্য কোনো প্রকাশ্য প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
বিশ্লেষকদের আরও অভিমত, এমন পরিস্থিতিতে কেএনএফ যদি পার্বত্য অঞ্চলে বিচ্ছিন্ন সহিংসতা বা নিরাপত্তা বিঘ্নকারী কর্মকাণ্ড বাড়ানোর চেষ্টা করে, তবে এর একটি উদ্দেশ্য হতে পারে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর মনোযোগ অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা পরিস্থিতির দিকে ব্যস্ত রাখা এবং সীমান্তবর্তী এলাকায় সম্ভাব্য সহযোগিতামূলক কার্যক্রমের জন্য কৌশলগত সুযোগ সৃষ্টি করা।
এদিকে একাধিক সূত্র জানিয়েছে, সাম্প্রতিক গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে পার্বত্য চট্টগ্রামের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় নজরদারি ও গোয়েন্দা তৎপরতা ইতোমধ্যে জোরদার করা হয়েছে। সীমান্তসংলগ্ন দুর্গম অঞ্চলগুলোতে টহল বৃদ্ধি, সম্ভাব্য অনুপ্রবেশের পথগুলো পর্যবেক্ষণ এবং কেএনএফের পুনর্গঠনের যেকোনো প্রচেষ্টা প্রতিহত করতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সতর্ক অবস্থানে রয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে।


