টানা ভারী বৃষ্টিতে ভবন ভেঙে যাওয়ার পর বন্ধ হয়ে যাওয়া বান্দরবানের আলীকদম উপজেলার দুর্গম পাহাড়ি এলাকার সাকহ্লানপাড়া বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়টি পুনর্নির্মাণ করা হচ্ছে। প্রায় ১০ লাখ টাকা ব্যয়ে বিদ্যালয় ও হোস্টেল ভবন নির্মাণের কাজ শুরু হয়েছে। চলতি মাসেই নির্মাণকাজ শেষ করার লক্ষ্য রয়েছে।

নয়াপাড়া ইউনিয়নের ৮ নম্বর ওয়ার্ডের গহিন পাহাড়ে অবস্থিত বিদ্যালয়টি ২০২২ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়। দুর্গম এলাকার প্রায় ৫০ থেকে ৬০ জন শিশু এখানে পড়াশোনা করেন। বিদ্যালয়ে পাঠদানের পাশাপাশি আবাসিক ব্যবস্থাও রয়েছে। শিক্ষক রয়েছেন দুজন।

গত জুলাইয়ের প্রথম দিকে টানা ভারী বৃষ্টিতে বিদ্যালয় ভবনটি সম্পূর্ণ বিধ্বস্ত হয়। এতে বন্ধ হয়ে যায় শ্রেণি কার্যক্রম। দুর্গম এলাকার শিশুদের পড়াশোনা অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়ে।

বিদ্যালয়টির প্রতিষ্ঠাতাদের একজন জানান, ভবনটি বিধ্বস্ত হওয়ার বিষয়টি আলীকদম উপজেলা ছাত্রদলের আহ্বায়ক ও কলেজ শিক্ষক মো. নূরুল ছাফার নজরে আসে। পরে তিনি মুঠোফোনে বিষয়টি প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ সহকারী মো. সাইয়েদ বিন আবদুল্লাহকে অবহিত করেন। এরপর দ্রুত সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে যোগাযোগ করে বিদ্যালয়টি পুনর্নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়।

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের দিকনির্দেশনায় বান্দরবান জেলা প্রশাসকের মাধ্যমে বিষয়টি আলীকদম উপজেলা প্রশাসনের কাছে পৌঁছায়। পরে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. মনজুর আলমের তত্ত্বাবধানে পুনর্নির্মাণকাজ শুরু হয়।

জানা গেছে, গত ২৩ জুলাই বিদ্যালয় ও হোস্টেল ভবনের নির্মাণকাজ শুরু হয়েছে। ইতোমধ্যে প্রায় ২০ শতাংশ কাজ শেষ হয়েছে। পাহাড়ি স্থাপত্যের আদলে ভবন দুটি নির্মাণ করা হচ্ছে। এতে ব্যয় হবে আনুমানিক ১০ লাখ টাকা।

নয়াপাড়ার বাসিন্দা চাই হ্লা মং মারমা বলেন, ‘দুর্গম এলাকার স্কুলটি বৃষ্টিতে ভেঙে যাওয়ায় ছেলে-মেয়েদের পড়ালেখা বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। ভেবেছিলাম, স্কুল আর হবে না। কিন্তু সরকার বিষয়টি জানার পর দ্রুত স্কুলঘর নির্মাণ করছে দেখে ভালো লাগছে।’

আলীকদম উপজেলার সমাজকর্মী ইসমাইল হাসান বলেন, দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নির্মাণ বরাবরই চ্যালেঞ্জের। এর মধ্যে প্রাকৃতিক দুর্যোগে পুরো স্থাপনা ধ্বংস হয়ে যাওয়ায় শিক্ষার্থীদের শিক্ষা কার্যক্রম অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়েছিল। দ্রুত পুনর্নির্মাণকাজ শুরু হওয়ায় স্থানীয়দের মধ্যে স্বস্তি ফিরেছে।

মো. নূরুল ছাফা বলেন, ‘আমাদের লক্ষ্য ছিল কোনো রাজনৈতিক পরিচয় নয়, দুর্গম এলাকার শিক্ষার্থীদের শিক্ষা নিশ্চিত করা। একটি স্কুল পুনর্নির্মাণ মানে শুধু একটি ভবন তৈরি নয়, এর মাধ্যমে একটি প্রজন্মের ভবিষ্যৎ রক্ষার সুযোগ তৈরি করা।’

বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক গর্ডেন ত্রিপুরা বলেন, ‘প্রবল বৃষ্টিপাতে বিদ্যালয়টি ভেঙে পড়ায় শিক্ষার্থীদের পড়াশোনা বন্ধ হয়ে যায়। দ্রুত পুনর্নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়ায় আমরা অত্যন্ত আনন্দিত।’

পাড়া কারবারি (পাহাড়ি গ্রামের প্রধান) দমলয় মুরুং বলেন, ‘এখানে চারটি গ্রামের মানুষ বসবাস করেন। ছেলে-মেয়েদের পড়ালেখার জন্য এই স্কুলটিই ছিল একমাত্র আশার জায়গা। স্কুলটি ভেঙে যাওয়ায় আমরা খুব কষ্ট পেয়েছিলাম। এখন আবার স্কুলটি গড়ে উঠছে। এটি আমাদের জন্য শুধু একটি ভবন নয়, সন্তানদের স্বপ্ন ফিরে পাওয়ার মতো।’

আলীকদম উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. মনজুর আলম বলেন, ‘নির্ধারিত সময়ের মধ্যে মানসম্মতভাবে নির্মাণকাজ শেষ করে শিক্ষার্থীদের দ্রুত স্বাভাবিক পাঠদানের পরিবেশ নিশ্চিত করাই আমাদের লক্ষ্য।’

বিদ্যালয়টি পুনর্নির্মাণ শেষ হলে দুর্গম পাহাড়ি এলাকার অর্ধশতাধিক শিশুর আবারও নিয়মিত পড়াশোনার সুযোগ তৈরি হবে। স্থানীয়দের আশা, নতুন ভবনে শিগগিরই আবার শুরু হবে শ্রেণি কার্যক্রম।