বান্দরবান জেলা সদর হাসপাতালের তৃতীয় তলার একটি মজুত কক্ষে ছয় বছর ধরে পড়ে আছে নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রের (আইসিইউ) জন্য আনা কোটি টাকার চিকিৎসাসামগ্রী। ভেন্টিলেটর, হাই ফ্লো নাজাল ক্যানুলা, পেশেন্ট মনিটর, এবিজি মেশিনসহ বিভিন্ন সরঞ্জাম অব্যবহৃত অবস্থায় পড়ে থাকায় এরই মধ্যে কিছু সরঞ্জামের মেয়াদ শেষ হয়ে গেছে। দীর্ঘদিন সংরক্ষিত এসব যন্ত্র এখনো সচল আছে কি না, সেটিও নিশ্চিত নন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।
২০২০ সালে করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাবের সময় গুরুতর রোগীদের চিকিৎসার জন্য তিন শয্যার আইসিইউ স্থাপনের উদ্যোগ নেয় স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। জরুরি ভিত্তিতে বান্দরবান সদর হাসপাতালে আইসিইউ চালুর জন্য ২০২১ ও ২০২২ সালে দুই দফায় প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম পাঠানো হয়। তবে উপযোগী অবকাঠামো, প্রয়োজনীয় জনবল ও নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ–সুবিধা না থাকায় আইসিইউ চালু করা সম্ভব হয়নি।
প্রথম আলোর প্রতিবেদনে বলা হয়, হাসপাতালের তৃতীয় তলার মজুত কক্ষে তিন শয্যার আইসিইউর জন্য ছয়টি হাই ফ্লো নাজাল ক্যানুলা, তিনটি করে ভেন্টিলেটর, এবিজি মেশিন, পেশেন্ট মনিটরসহ বিভিন্ন যন্ত্রপাতি সারি করে রাখা হয়েছে। ২০২১ সালের এপ্রিল ও ২০২২ সালের সেপ্টেম্বরে সরবরাহ করা এসব সরঞ্জামের ব্যবহারকাল পাঁচ বছর উল্লেখ করা হয়েছে। সেই হিসাবে ২০২১ সালে সরবরাহ করা সরঞ্জামের মেয়াদ গত বছর শেষ হয়েছে। ২০২২ সালে সরবরাহ করা সরঞ্জামের মেয়াদও শেষ হওয়ার পথে।
করোনাকালে অবশ্য আইসোলেশন ওয়ার্ডে গুরুতর রোগীদের চিকিৎসায় কিছু হাই ফ্লো নাজাল ক্যানুলা ও ভেন্টিলেটর ব্যবহার করা হয়েছিল। করোনা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসার পর সেগুলোসহ অন্যান্য সরঞ্জাম মজুত কক্ষে রাখা হয়।
এদিকে বান্দরবানে গত মে মাস থেকে হামের প্রাদুর্ভাব দেখা দিয়েছে। বর্তমানে পরিস্থিতি কিছুটা নিয়ন্ত্রণে এলেও প্রতিদিন ১৫ থেকে ২০ জন হামের উপসর্গ নিয়ে আইসোলেশন ওয়ার্ডে চিকিৎসা নিচ্ছে। শ্বাসকষ্টসহ গুরুতর সমস্যায় আক্রান্ত ৩৭ জন রোগীকে, বিশেষ করে শিশুদের, চট্টগ্রামে পাঠানো হয়েছে।
হাসপাতালের আইসোলেশন ওয়ার্ডের জ্যেষ্ঠ কনসালট্যান্ট (শিশু) রাশেদুল আলম বলেন, মজুত থাকা আইসিইউর সরঞ্জাম সচল আছে কি না, তা পরীক্ষা না করে ব্যবহার করা সম্ভব নয়। করোনাকালে ব্যবহৃত কিছু সরঞ্জাম এখন আর ব্যবহার উপযোগী না-ও হতে পারে। আবার অনেক সরঞ্জাম অব্যবহৃত অবস্থাতেই মেয়াদ পার করেছে।
পড়ে আছে কোটি টাকার আরটি-পিসিআর ল্যাব
করোনাভাইরাস শনাক্তকরণের জন্য কোটি টাকা মূল্যের একটি আরটি-পিসিআর ল্যাবও ছয় বছর ধরে অব্যবহৃত অবস্থায় পড়ে আছে। প্রায় সাড়ে ৭ ফুট দীর্ঘ, ৩ ফুট প্রস্থ ও ৭ দশমিক ২৫ ফুট উচ্চতার ল্যাবটি স্থাপনের জন্য হাসপাতালের একটি দরজা কেটে প্রশস্ত করার চেষ্টা করা হয়েছিল। তবে শেষ পর্যন্ত তা স্থাপন করা সম্ভব হয়নি।
হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, নির্মাণাধীন নতুন হাসপাতাল ভবনের কাজ শেষ হলে আরটি-পিসিআর ল্যাবটি স্থাপন করা সম্ভব হতে পারে। তবে প্রয়োজনীয় জনবল না পাওয়া গেলে ল্যাবটি চালু করা যাবে না। চিকিৎসকদের তথ্য অনুযায়ী, ল্যাবটি পরিচালনার জন্য বিশেষজ্ঞসহ অন্তত ১৩ জন জনবল প্রয়োজন।
অবকাঠামো ও জনবলের সংকট এখনো কাটেনি
বান্দরবান সদর হাসপাতালের আবাসিক চিকিৎসা কর্মকর্তা (আরএমও) তৌহিদুল আনোয়ার বলেন, ছয় বছর আগে যেসব সীমাবদ্ধতার কারণে আইসিইউ চালু করা যায়নি, সেগুলোর বেশির ভাগই এখনো রয়েছে। আইসিইউ পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় জায়গা, ২৪ ঘণ্টা দায়িত্ব পালনের জনবল এবং নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ–সুবিধা নেই।
তিনি বলেন, নতুন নির্মাণাধীন হাসপাতাল ভবন হস্তান্তর করা হলে এবং প্রয়োজনীয় জনবল পাওয়া গেলে আইসিইউ চালু করা সম্ভব হতে পারে। নতুন ভবনের নির্মাণকাজ ৯৭ শতাংশ শেষ হয়েছে।
ছয় বছর আগে গুরুতর রোগীদের জীবন বাঁচাতে যে আইসিইউ স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল, অবকাঠামো ও জনবলের অভাবে তা এখনো বাস্তবায়িত হয়নি। ফলে কোটি টাকার চিকিৎসাসামগ্রী পড়ে থেকে মেয়াদোত্তীর্ণ হওয়ার পাশাপাশি জরুরি চিকিৎসাসেবার প্রয়োজনেও রোগীদের অন্য জেলায় পাঠাতে হচ্ছে।
খবর: প্রথম আলো থেকে নেয়া


