— মেজর নাসিম হোসেন (অব.)
পার্বত্য চট্টগ্রাম নিয়ে বাস্তব জ্ঞান ও দীর্ঘমেয়াদি মাঠপর্যায়ের অভিজ্ঞতা সবচেয়ে বেশি রয়েছে সেনাবাহিনীর। গত প্রায় ৫০ বছর ধরে এই ইস্যুর সঙ্গে তারা সরাসরি সম্পৃক্ত। শরীর, মন ও মগজ দিয়ে তারা এই অঞ্চলের বাস্তবতা প্রত্যক্ষ করেছে এবং মাঠে থেকেই এর ভূ-রাজনৈতিক ও নিরাপত্তাগত বাস্তবতা সম্পর্কে অভিজ্ঞতা অর্জন করেছে।
অথচ পার্বত্য চট্টগ্রাম নিয়ে জাতীয় পর্যায়ে নীতিনির্ধারণের ক্ষেত্রে এমন অনেক ব্যক্তিকে সম্পৃক্ত করা হয়েছে, যাদের এই অঞ্চলের সঙ্গে প্রত্যক্ষ পরিচয় বা মাঠপর্যায়ের অভিজ্ঞতা ছিল সীমিত। হুমায়ুন আজাদের মতো একজন বিশিষ্ট বুদ্ধিজীবীও ১৯৯৭ সালের আগে পার্বত্য চট্টগ্রাম সরেজমিনে দেখেছেন কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। ড. কামাল হোসেন ও জাতীয় অধ্যাপক ড. আনিসুজ্জামানের মতো বিশিষ্ট ব্যক্তিদের ক্ষেত্রেও সংবিধান প্রণয়নের আগে পার্বত্য চট্টগ্রাম সম্পর্কে তাঁদের প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা কতটুকু ছিল, তা আলোচনার দাবি রাখে।
আমার আপত্তি এখানেই—পার্বত্য চট্টগ্রামের মতো একটি জটিল ভূখণ্ড, যেখানে ইতিহাস, জাতিসত্তা, ভূমি, নিরাপত্তা ও ভূ-রাজনীতি পরস্পরের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত, সেখানে কেবল রাজধানীকেন্দ্রিক জ্ঞান দিয়ে নীতিনির্ধারণ করা কতটা যুক্তিসংগত?
পার্বত্য চট্টগ্রামে শুধু চাকমা জনগোষ্ঠীই নেই। মারমা, ত্রিপুরা, তঞ্চঙ্গ্যা, বম, ম্রো, খুমি, খিয়াং, পাংখোয়া, লুসাইসহ বিভিন্ন জাতিসত্তার মানুষ সেখানে বসবাস করে। অথচ নীতিনির্ধারণের সময় এই বৈচিত্র্য কতটা গুরুত্ব পেয়েছে, সেটিই বড় প্রশ্ন।
পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির আগে আলোচনাকারী কাঠামোয় সেনাবাহিনীর প্রত্যক্ষ প্রতিনিধিত্ব না থাকার বিষয়টিও আজ নতুন করে মূল্যায়ন করা প্রয়োজন। সেনাবাহিনী তার নিরাপত্তাগত অবস্থান ও মোতায়েনের বিষয়ে যে কঠোর অবস্থান নেবে, সেটি তখন থেকেই অনুমেয় ছিল। কারণ পার্বত্য চট্টগ্রামের অন্যতম প্রধান বাস্তবতা ছিল নিরাপত্তা।
কিন্তু আলোচনার টেবিলে যারা ছিলেন, তাঁদের প্রত্যেকের কি পার্বত্য চট্টগ্রামের মাঠপর্যায়ের অভিজ্ঞতা ছিল? তাঁরা কি সব উপজেলার নাম, সব জাতিসত্তার পরিচয় এবং এই অঞ্চলের জটিল ইতিহাস সম্পর্কে সমানভাবে অবহিত ছিলেন? যদি না হয়ে থাকেন, তাহলে এত গুরুত্বপূর্ণ একটি চুক্তির ক্ষেত্রে মাঠপর্যায়ের বাস্তব অভিজ্ঞতাকে যথেষ্ট গুরুত্ব দেওয়া হয়েছিল কি না, সেই প্রশ্ন থেকেই যায়।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো বাঙালি পুনর্বাসন বা প্রত্যাহারের প্রশ্ন। বাস্তবতা হলো—১৯৭০ ও ১৯৮০-এর দশকে পার্বত্য চট্টগ্রামে বসতি স্থাপনকারী বহু বাঙালি পরিবার পরবর্তী কয়েক দশক ধরে সেখানে বসবাস করছে। তাঁদের সন্তান-সন্ততির একটি বড় অংশ পাহাড়েই জন্মেছে ও বেড়ে উঠেছে। তাদের অনেকের পূর্বপুরুষ হয় মারা গেছেন, নয়তো অন্যত্র ফিরে গেছেন। ফলে আজকের প্রজন্মের একটি বড় অংশের কাছে পার্বত্য চট্টগ্রামই জন্মভূমি।
তাহলে প্রশ্ন হলো—এই মানুষগুলোকে কোথায় পাঠানো হবে? কোন আইনি ও মানবিক ভিত্তিতে জন্মসূত্রে ওই অঞ্চলের বাসিন্দা একটি পরিবারকে উচ্ছেদ করা হবে? কোনো রাজনৈতিক সরকারই কি বাস্তবে কয়েক লাখ মানুষকে তাদের বসতভিটা থেকে উচ্ছেদ করে অন্যত্র পাঠাতে পারবে?
এখানে আবেগ নয়, প্রয়োজন বাস্তবতা ও আইনভিত্তিক সমাধান।
পার্বত্য চট্টগ্রামের ভূমি-প্রশ্ন আরও জটিল। বনভূমি, খাসজমি, কৃষিজমি ও পতিত জমির মালিকানা, ব্যবহার এবং ঐতিহাসিক অধিকারের প্রশ্ন একে অপরের সঙ্গে জড়িত। এ অঞ্চলের ভূমি ব্যবস্থার ইতিহাসও সমতলের ভূমি ব্যবস্থার মতো সরল নয়।
চাকমা রাজা, জমিদারি ব্যবস্থা, ব্রিটিশ আমলের রাজস্বনীতি এবং পরবর্তী ভূমি প্রশাসনের ইতিহাস বিশ্লেষণ না করে বর্তমান ভূমি-অধিকার প্রশ্নের সমাধান করা সম্ভব নয়। মুঘল আমলে চাকমা নেতৃত্বের রাজনৈতিক ও রাজস্ব-সম্পর্কিত ভূমিকা ছিল—কিন্তু তার অর্থ আধুনিক অর্থে ব্যক্তিগত ভূমির মালিকানা ছিল কি না, সেটিও ঐতিহাসিক দলিলের ভিত্তিতে বিচার করতে হবে।
আজকের সবচেয়ে বড় বিপদ হলো—পার্বত্য চট্টগ্রামের মতো একটি জটিল সমস্যাকে সরলীকরণ করা। একদিকে কেউ শুধু ‘নিরাপত্তা’ দেখছেন, অন্যদিকে কেউ শুধু ‘জাতিসত্তার অধিকার’ দেখছেন। কিন্তু বাস্তবতা হলো—নিরাপত্তা, ভূমি, নাগরিক অধিকার, জাতিসত্তার সাংস্কৃতিক অধিকার, উন্নয়ন এবং রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্ব—সবগুলো বিষয় একই সঙ্গে বিবেচনা করতে হবে।
দুঃখজনকভাবে, বাংলাদেশের রাজনীতিতে পার্বত্য চট্টগ্রাম নিয়ে মাঠপর্যায়ের জ্ঞান ও অভিজ্ঞতার ঘাটতি এখনও স্পষ্ট। সংসদের কোনো কোনো জনপ্রতিনিধি পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর অনুষ্ঠানে গিয়ে তাঁদের সংস্কৃতির প্রতি সম্মান প্রদর্শন করেন—এটি স্বাভাবিক ও ইতিবাচক। কিন্তু রাজনৈতিক সৌজন্য আর রাষ্ট্রীয় নীতিনির্ধারণ এক বিষয় নয়। ‘আদিবাসী’ শব্দের রাজনৈতিক ও সাংবিধানিক ব্যবহার নিয়ে যদি বিতর্ক থাকে, তাহলে সেটিরও আবেগ দিয়ে নয়, সংবিধান, আইন ও রাষ্ট্রীয় স্বার্থের আলোকে আলোচনা হওয়া উচিত।
১৯৯১ সালে আমি বর্তমানের একজন প্রতিমন্ত্রীকে হেলিকপ্টারে করে পার্বত্য চট্টগ্রাম দেখাতে নিয়ে গিয়েছিলাম। তখন তিনি রাষ্ট্রের এত বড় দায়িত্বে ছিলেন না। আজ তিনি রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে আছেন। এই অভিজ্ঞতা আমাকে একটি কথাই মনে করিয়ে দেয়—যারা রাষ্ট্র পরিচালনা করবেন, তাঁদের শুধু ফাইলের তথ্য নয়, মাঠের বাস্তবতাও জানতে হবে।
পাহাড়কে দূর থেকে দেখে পাহাড় বোঝা যায় না। মানচিত্র দেখে পাহাড়ের রাজনীতি বোঝা যায় না। আর রাজধানীর বৈঠকখানায় বসে পাহাড়ের নিরাপত্তা, ভূমি, জাতিসত্তা ও মানুষের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করতে গেলে ভুল হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি।
পাহাড়ের ভবিষ্যৎ নির্ধারণের আগে তাই পাহাড়কে জানতে হবে—পাহাড়ের মানুষকে জানতে হবে, পাহাড়ের ইতিহাস জানতে হবে এবং সবচেয়ে বড় কথা, পাহাড়ের বাস্তবতায় গিয়ে দাঁড়াতে হবে।


