সরকারের দায়িত্ব গ্রহণের পাঁচ মাস পূর্তি উপলক্ষে ‘সরকারের ৫ মাস: পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির অগ্রগতির মূল্যায়ন’ শীর্ষক একটি মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে আগামীকাল বুধবার (২৯ জুলাই)।

পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বাস্তবায়ন আন্দোলনের উদ্যোগে আয়োজিত এ সভা বুধবার সকাল ১০টায় রাজধানীর জাতীয় প্রেসক্লাবের জহুর হোসেন চৌধুরী কনফারেন্স রুমে অনুষ্ঠিত হবে।

আয়োজকরা জানিয়েছেন, সভায় সরকারের পাঁচ মাসের সময়ে পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বাস্তবায়নের অগ্রগতি, বিদ্যমান চ্যালেঞ্জ এবং ভবিষ্যৎ করণীয় বিষয়ে আলোচনা করা হবে।

উল্লেখ্য, স্বাধীনতার পর ভূমি, প্রশাসনিক ক্ষমতা, সাংস্কৃতিক অধিকার এবং উন্নয়ন বৈষম্যকে কেন্দ্র করে সেখানে দীর্ঘদিন অস্থিরতা বিরাজ করে। দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে চলা সেই সংঘাতের অবসানে ১৯৯৭ সালের ২ ডিসেম্বর সরকার ও পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির (জেএসএস) মধ্যে স্বাক্ষরিত হয় পার্বত্য চট্টগ্রাম শান্তিচুক্তি। চুক্তির অন্যতম অঙ্গীকার ছিল একটি পৃথক মন্ত্রণালয় গঠন, যা ১৯৯৮ সালের ১৫ জুলাই বাস্তবায়িত হয়।

প্রতিষ্ঠার পর থেকে পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয় পার্বত্য অঞ্চলের উন্নয়ন পরিকল্পনা, বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও সংস্থার কার্যক্রমে সমন্বয়, পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ড, আঞ্চলিক পরিষদ ও তিন পার্বত্য জেলা পরিষদের কার্যক্রম তদারকি এবং শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কৃষি, যোগাযোগ, পর্যটন ও সংস্কৃতির উন্নয়নে নীতিগত ভূমিকা পালন করে আসছে। বর্তমানে মন্ত্রণালয়ের অধীনে পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদ, তিন পার্বত্য জেলা পরিষদ, পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ড, ভারত প্রত্যাগত শরণার্থী পুনর্বাসন টাস্কফোর্সসহ একাধিক প্রতিষ্ঠান কাজ করছে।

সরকারি তথ্য অনুযায়ী, গত ২৮ বছরে পার্বত্য অঞ্চলে সড়ক ও সেতু নির্মাণ, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য অবকাঠামোর সম্প্রসারণ, বিদ্যুৎ সুবিধা বৃদ্ধি, বিশুদ্ধ পানির সরবরাহ, কৃষি উন্নয়ন, পর্যটন অবকাঠামো নির্মাণ এবং ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর জীবনমান উন্নয়নে বহু প্রকল্প বাস্তবায়িত হয়েছে। পাশাপাশি ভাষা, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য সংরক্ষণেও নেওয়া হয়েছে বিভিন্ন উদ্যোগ।

সম্প্রতি জাতিসংঘের আদিবাসী-সংক্রান্ত স্থায়ী ফোরামের ২৫তম অধিবেশনে বাংলাদেশের প্রতিনিধি দল জানায়, ১৯৯৭ সালের পার্বত্য চট্টগ্রাম শান্তিচুক্তির ৭২টি ধারার মধ্যে ৬৫টি সম্পূর্ণ এবং ৩টি আংশিক বাস্তবায়িত হয়েছে। বাকি চারটি ধারা বাস্তবায়নের প্রক্রিয়ায় রয়েছে।

অধিবেশনে পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিব মোহাম্মদ মিজানুর রহমান বলেন, শান্তিচুক্তি বাস্তবায়ন একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক ও অংশগ্রহণমূলক প্রক্রিয়া।সরকার শিক্ষা, স্বাস্থ্য, সামাজিক নিরাপত্তা, ডিজিটাল সংযোগ, জীবিকা উন্নয়ন ও সংস্কৃতি সংরক্ষণে ধারাবাহিক কর্মসূচি বাস্তবায়ন করছে। পাশাপাশি ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীবিষয়ক বিশেষ সহকারী নিয়োগ এবং পার্বত্য এলাকায় ২০ লাখ বৃক্ষরোপণের পরিকল্পনার কথাও তুলে ধরা হয়।

তবে এই মূল্যায়নের সঙ্গে একমত নয় শান্তিচুক্তির অন্যতম পক্ষ পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি (জেএসএস)।

সংগঠনটির ২০২৬ সালের অর্ধবার্ষিক মানবাধিকার প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, প্রায় তিন দশক পরও শান্তিচুক্তির গুরুত্বপূর্ণ অংশ বাস্তবায়িত হয়নি। তাদের অভিযোগ, ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি, প্রশাসনিক ক্ষমতা হস্তান্তর, আঞ্চলিক পরিষদের কার্যকারিতা এবং পার্বত্য অঞ্চলের সার্বিক রাজনৈতিক পরিবেশ নিয়ে এখনো মৌলিক অগ্রগতি হয়নি।

পার্বত্য শান্তিচুক্তি নিয়ে ২০০১ সালে ক্ষমতায় এসে বিএনপি সরকার চুক্তি বাতিল করেনি বরং পরবর্তী সময়ে কয়েকটি প্রশাসনিক দায়িত্ব হস্তান্তরসহ বাস্তবায়নের কিছু পদক্ষেপও নেওয়া হয়।

২০২৬ সালের নির্বাচনী ইশতেহারে বিএনপি শান্তিচুক্তি বাতিল নয়, বরং পুনর্মূল্যায়ন ও প্রয়োজনীয় সংস্কারের প্রতিশ্রুতি দেয়। একই সঙ্গে পাহাড়ি ও বাঙালি—উভয় জনগোষ্ঠীর নিরাপত্তা, সমান অধিকার, স্থানীয় সরকারকে শক্তিশালী করা এবং পার্বত্য অঞ্চলের স্বাস্থ্য ও অবকাঠামো উন্নয়নের অঙ্গীকার করা হয়। সরকার প্রথম অর্থবিলের মাধ্যমে পার্বত্য তিন জেলা ও সমতলের ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর জন্য বিদ্যমান করসুবিধা আরও সম্প্রসারণের উদ্যোগও নিয়েছে, যা বিশ্লেষকদের মতে শান্তিচুক্তির সামাজিক ও অর্থনৈতিক লক্ষ্য বাস্তবায়নের অংশ হিসেবেও বিবেচিত হতে পারে।

প্রায় ২৯ বছর পরও শান্তিচুক্তির বাস্তবায়ন নিয়ে বিতর্ক থামেনি। প্রশ্ন উঠছে—সরকার যখন বলছে ৯০ শতাংশের বেশি ধারা বাস্তবায়িত হয়েছে, তখন কেন এখনো আন্দোলন, দাবি ও বিতর্ক অব্যাহত?

লেখক ও সাংবাদিক গোলাম যাকারিয়ার মতে, শান্তিচুক্তির বাস্তবায়নের প্রশ্নটি সন্তু লারমার নেতৃত্বাধীন জেএসএসের রাজনৈতিক অস্তিত্বের অন্যতম প্রধান ভিত্তি। দীর্ঘদিন ধরে দলটি শান্তিচুক্তির পূর্ণ বাস্তবায়নকে তাদের মূল রাজনৈতিক এজেন্ডা হিসেবে সামনে রেখেছে। ফলে চুক্তি সম্পূর্ণ বাস্তবায়িত হয়েছে—এমন ধারণা প্রতিষ্ঠিত হলে সংগঠনটির সামনে নতুন রাজনৈতিক ইস্যু তৈরি করা কঠিন হয়ে পড়তে পারে।

তিনি মনে করেন, শান্তিচুক্তির বাস্তবায়নের আন্দোলন জেএসএসের জন্য শুধু অধিকার আদায়ের প্রশ্ন নয়; এটি সংগঠনের রাজনৈতিক বৈধতা, জনসমর্থন ও সাংগঠনিক শক্তি ধরে রাখার কৌশলেরও অংশ। কারণ, তাদের প্রধান রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী ইউপিডিএফ ঐতিহাসিকভাবে শান্তিচুক্তির বিরোধিতা করে এসেছে। ফলে শান্তিচুক্তি ইস্যুটি যত বেশি আলোচনায় থাকবে, ততই পাহাড়ের রাজনৈতিক প্রতিযোগিতাও তত বেশি সক্রিয় থাকবে।