কুকি-চিন ন্যাশনাল আর্মির (কেএনএ) তাণ্ডবে ভারতের মিজোরামে পালিয়ে গিয়ে আশ্রয় নেওয়া বম সম্প্রদায়ের তিন পরিবারের ১৮ সদস্য অবশেষে বান্দরবানের থানচি উপজেলার নিজ পাড়ায় ফিরেছেন।

রোববার (১৩ সেপ্টেম্বর) সন্ধ্যায় বাকলাই পাড়া আর্মি ক্যাম্পের সহায়তায় তারা নিজ নিজ গ্রামে ফিরে যান। ক্যাম্প কমান্ডার ক্যাপ্টেন সাফকাত মুবাররাত চৌধুরীর নেতৃত্বে সন্ধ্যা ৬টার দিকে তাদের শেরকর ও প্রাতা পাড়ায় পৌঁছে দেওয়া হয়। এ সময় শেরকর পাড়ার কারবারি তুমথন বম ও প্রাতা পাড়ার কারবারি পার্কেল বম উপস্থিত ছিলেন।

ফিরে আসা পরিবারের প্রধান ভানরৌখম বম, রুয়াতখুপ বম ও লালচম বম জানান, কুকি-চিন ন্যাশনাল আর্মির (কেএনএ) তাণ্ডবের কারণে নিরাপত্তার জন্য তারা ভারতে মিজোরামে চলে যান। দীর্ঘদিন সেখানে থাকার পর দেশে ফিরে স্বস্তি প্রকাশ করেছেন তারা।

ভানরৌখম বম বলেন, ‘নিজ দেশ ছেড়ে অন্য দেশে থাকলে কখনো নিজের বাড়ির মতো লাগে না। এতদিন পর নিজের পাড়ায় ফিরতে পেরে ভালো লাগছে। নিজের মাটি ও মানুষের কাছে ফিরে এসেছি, এটাই সবচেয়ে বড় আনন্দ।’

রুয়াতখুপ বম বলেন, ‘বাড়িঘর, আত্মীয়স্বজন ও নিজের পাড়ার কথা সব সময় মনে পড়ত। মিজোরামে থাকলেও মন পড়ে থাকত দেশে। অনেক বছর পর আবার নিজের জায়গায় ফিরেছি।’

লালচম বম বলেন, ‘নিজ দেশ ও মাতৃভূমি ছেড়ে সুখে নেই। নানা কষ্টের মধ্যে এত বছর পার করেছি। এখন নিজের পাড়ায় ফিরে এসেছি। পরিবার নিয়ে শান্তিতে থাকতে চাই।’

পরিবারগুলোর সদস্যরা জানান, ২০২৩ সালে কেএনএফের সশস্ত্র তৎপরতার কারণে নিরাপত্তার জন্য তারা রুমা ও থানচি উপজেলার সীমান্ত দিয়ে ভারতের মিজোরামে পালিয়ে যান।

তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালে বম সোশ্যাল কাউন্সিলের নেতৃবৃন্দ ও সেনাবাহিনীর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগের পর দেশে ফেরার বিষয়ে তারা আশ্বস্ত হন। গত ১১ সেপ্টেম্বর মিজোরামের শিলকর থেকে রাঙামাটির শিলকোপাড়া সীমান্ত দিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করেন তারা। পরে শিলকোপাড়া ১২ বিজিবির থেগামুখ বিওপি তাদের হেফাজতে নেয়। রোববার ১৩ সেপ্টেম্বর বেলা সাড়ে ১১টার দিকে বান্দরবান রিজিয়নের আইসি বিভাগ (১৬ ইবি) তাদের গ্রহণ করে। এরপর সেনাবাহিনীর তত্ত্বাবধানে নিজ পাড়ায় ফেরানোর জন্য তাঁদের বাকলাই পাড়া আর্মি ক্যাম্পে নেওয়া হয়।

ফিরে আসা তিন পরিবারের মধ্যে প্রথম পরিবারের সদস্য সাতজন। পরিবারের প্রধান রুয়াতখুপ বম (৪৬)। তাঁর সঙ্গে রয়েছেন জিং সিয়াম ময় বম (৪০), রুসাত সাং বম (১৫), নিএং ময় বম (১৩), সিয়াম থারময় বম (১০), জিরসময় বম (৭) ও জেকলিয়ান বম (৫)। পরিবারটির বাড়ি থানচি সদর ইউনিয়নের ৯ নম্বর ওয়ার্ডের শেরকর পাড়ায়।

দ্বিতীয় পরিবারের সদস্য আটজন। পরিবারের প্রধান লালচম বম (৫৫)। তার সঙ্গে রয়েছেন- জুমিয়া ইয়াং বম (৪৬), জিলিয়ান বম (২৫), লালথান জোয়াল বম (২২), ভানসিরাম পার বম (২৪), লালমাঙ্গাই বম (২), সলত্রং পার বম (১৮) ও ডামনুন সাং বম (১২)। এ পরিবারেরও বাড়ি থানচি সদর ইউনিয়নের ৯ নম্বর ওয়ার্ডের শেরকর পাড়ায়।

তৃতীয় পরিবারের সদস্য তিনজন। পরিবারের প্রধান ভানরৌখম বম (২৭)। তার সঙ্গে রয়েছেন- হেলেন বম (২৬) ও ভানলাললম বম (৪)। পরিবারটির বাড়ি একই ইউনিয়নের ৯ নম্বর ওয়ার্ডের প্রাতা পাড়ায়।

নিজ পাড়ায় ফেরার আগে বাকলাই পাড়া আর্মি ক্যাম্পের পক্ষ থেকে প্রতিটি পরিবারকে নগদ ১৫ হাজার টাকা, ৫০ কেজি চাল, ১০ কেজি ডাল, পাঁচ কেজি তেল, পাঁচ কেজি পেঁয়াজ, পাঁচ কেজি আলু ও পাঁচ কেজি লবণ দেওয়া হয়। পাশাপাশি প্রতিটি পরিবারকে একটি করে সোলার প্যানেল, ব্যাটারি, বালতি, মগ, পাতিল, প্লেট, গ্লাসসহ প্রয়োজনীয় সামগ্রী দেওয়া হয়।