রাঙামাটির বাঘাইছড়ি উপজেলার সাজেক সড়কে টানা অষ্টম দিনের মতো অবরোধ কর্মসূচি চলছে। সাজেকের নিয়ন্ত্রণ, নিরাপত্তা ও বিভিন্ন দাবিকে কেন্দ্র করে চলমান এই অবরোধে সড়কে যান চলাচল বন্ধ রয়েছে। বৃহস্পতিবার (২৯ অক্টোবর) সকালে সড়কের কয়েকটি স্থানে গাছের গুঁড়ি ফেলে আগুন দেন অবরোধকারীরা। গুরুত্বপূর্ণ স্থানে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের উপস্থিতি রয়েছে।
সাজেক গণঅধিকার রক্ষা কমিটি ও সাজেক কার্বারি অ্যাসোসিয়েশনের ডাকে এই অবরোধ কর্মসূচি পালিত হচ্ছে। আন্দোলনকারীদের পাঁচ দফা দাবির মধ্যে চারটি বিষয়ে প্রশাসনের প্রতিনিধিদের সঙ্গে সমঝোতা হলেও একটি দাবি বাস্তবায়নের বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত না হওয়ায় অবরোধ প্রত্যাহার করা হয়নি।
গত সোমবার (২৬ অক্টোবর) বিকেল ৩টা থেকে সন্ধ্যা পৌনে ৬টা পর্যন্ত সাজেক ইউনিয়নের উজো বাজারে প্রশাসনের প্রতিনিধিদের সঙ্গে আন্দোলনকারী সংগঠনগুলোর নেতাদের বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকে পাঁচ দাবির চারটি বিষয়ে সমঝোতা হয়।
খাগড়াছড়ির সংসদ সদস্য ও পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি ওয়াদুদ ভূঁইয়া জানান, প্রধান দাবির বিষয়ে সিদ্ধান্ত না হওয়ায় অবরোধ প্রত্যাহারের পথ তৈরি হয়নি।
সোমবার রাতে সাজেক গণঅধিকার রক্ষা কমিটির ফেসবুক পেজে সরাসরি সম্প্রচারে সংগঠনটির আহ্বায়ক বাবুধন চাকমা বলেন, প্রধান দাবি বাস্তবায়নের বিষয়ে সরকার নির্দিষ্ট আশ্বাস দিতে পারেনি। সরকার প্রথমে এক মাস সময় চাইলেও আন্দোলনকারীরা তিন দিন সময় দিতে রাজি ছিলেন। পরে সরকার ৫ নভেম্বর পর্যন্ত সময় চাইলে আন্দোলনকারীরা আরও পাঁচ দিন অপেক্ষা করতে সম্মত হন। তবে নিশ্চিত আশ্বাস না পাওয়ায় অবরোধ চালিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। সরকার আবার আলোচনায় বসতে চাইলে তারা প্রস্তুত রয়েছেন বলেও জানান তিনি।
ইউপিডিএফের বিচার বিভাগ সামলানোর পাশাপাশি তিনি প্রথমে 'সাজেক গণঅধিকার রক্ষা কমিটি'র সদস্য সচিব এবং বর্তমানে আহ্বায়ক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। এর পাশাপাশি তিনি গঙ্গারাম উজোবাজার ব্যবসায়ী কমিটির সহ-সভাপতির দায়িত্বেও রয়েছেন।
সাজেকের মাচালং বন বিভাগের কার্যালয়ে হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনায় বন বিভাগের দায়ের করা মামলার এজাহারভুক্ত আসামি বাবুধন চাকমা। পুলিশের খাতায় তিনি পলাতক আসামি হিসেবে তালিকাভুক্ত হলেও বর্তমানে তিনি সাজেকে ইউপিডিএফের প্রধান ফায়ারব্র্যান্ড হিসেবে প্রকাশ্যে সামনের সারিতে থেকে অবরোধের মতো কঠোর কর্মসূচি পরিচালনা ও নেতৃত্ব দিয়ে যাচ্ছেন বলে জানা গেছে।
আন্দোলনকারীদের পাঁচ দফা দাবি
আন্দোলনকারীদের দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছে—
১. গত ২২ অক্টোবর অবরোধ চলাকালে হামলার ঘটনায় জড়িত ব্যক্তিদের শাস্তি এবং নিরপেক্ষ বিচার বিভাগীয় তদন্ত।
২. উজো বাজারে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসায়ীদের ক্ষতিপূরণ প্রদান এবং সেখান থেকে সেনা ও পুলিশ সদস্যদের প্রত্যাহার।
৩. হামলায় আহত ব্যক্তিদের চিকিৎসার ব্যয়ভার গ্রহণ।
৪. সাজেক থেকে জেএসএস-সন্তু লারমা গ্রুপের সশস্ত্র সদস্যদের প্রত্যাহার এবং চাঁদাবাজি ও জুলুম বন্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ।
৫. আন্দোলনকারীদের গ্রেপ্তার, হয়রানি এবং বাড়িঘর ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে তল্লাশি বন্ধ করা।
১১ অক্টোবর থেকে আন্দোলন, ২২ অক্টোবর থেকে অনির্দিষ্টকালের অবরোধ
সন্তু লারমার নেতৃত্বাধীন জেএসএসের সশস্ত্র সদস্যদের সাজেক থেকে প্রত্যাহার, স্থানীয় বাসিন্দাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং প্রশাসনের পূর্ববর্তী আশ্বাস বাস্তবায়নের দাবিতে গত ১১ অক্টোবর থেকে আন্দোলন শুরু করে সাজেক গণঅধিকার রক্ষা কমিটি ও সাজেক কার্বারি অ্যাসোসিয়েশন।
শারদীয় দুর্গাপূজা উপলক্ষে ১৬ থেকে ২১ অক্টোবর পর্যন্ত আন্দোলন স্থগিত রাখা হয়। পরে দাবি পূরণ না হওয়ায় ২২ অক্টোবর থেকে পুনরায় অনির্দিষ্টকালের জন্য সড়ক অবরোধের ডাক দেয় সংগঠন দুটি।
অবরোধের প্রথম দিনে সাজেক ভ্যালিতে দুই হাজার ৯৩৩ জন পর্যটক আটকা পড়েন। পরে ২২ অক্টোবর সকালে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী ও পুলিশ পর্যটকদের গাড়িবহরকে নিরাপত্তা দিয়ে সাজেক থেকে খাগড়াছড়িতে নিয়ে আসে।
সাজেকের পর্যটন ও অর্থনৈতিক নিয়ন্ত্রণ নিয়ে বিরোধ
সাজেকের পর্যটন, পরিবহন, কৃষিপণ্য, বাঁশ ও ফুলঝাড়ুর ব্যবসাসহ বিভিন্ন অর্থনৈতিক খাতের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে ইউপিডিএফ ও জেএসএসের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে বিরোধ রয়েছে বলে স্থানীয় সূত্রগুলো দাবি করছে।
শান্তিচুক্তিবিরোধী পার্বত্য চট্টগ্রামভিত্তিক সশস্ত্র সংগঠন প্রসীত খীসার নেতৃত্বাধীন ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট (ইউপিডিএফ) সাজেকের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে প্রভাব বিস্তার করে বলে স্থানীয় কয়েকজন ব্যবসায়ীর অভিযোগ। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ব্যবসায়ীদের ভাষ্য অনুযায়ী, পর্যটন, পরিবহন, কৃষিপণ্য, বাঁশ, ফুলঝাড়ু এবং ঝরনা থেকে সংগ্রহ করা পানির ব্যবসাসহ বিভিন্ন খাতে চাঁদা দিয়ে তাঁদের ব্যবসা পরিচালনা করতে হয়।
অন্যদিকে, জ্যোতিরিন্দ্র বোধিপ্রিয় লারমা ওরফে সন্তু লারমার নেতৃত্বাধীন পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি (পিসিজেএসএস বা জেএসএস) দীর্ঘদিন ধরে সাজেকের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করছে বলে স্থানীয় সূত্রগুলোর দাবি।
স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, গত কয়েক মাসে সাজেকের বিভিন্ন এলাকায় জেএসএসের প্রভাব বেড়েছে এবং প্রায় ৭০ শতাংশ এলাকার নিয়ন্ত্রণ তাদের হাতে চলে গেছে বলে দাবি করা হচ্ছে। এ ক্ষেত্রে তরু চাকমা জেএসএসের হয়ে সামনে থেকে নেতৃত্ব দিয়েছেন বলেও স্থানীয় সূত্রগুলো উল্লেখ করেছে।
এদিকে, প্রধান দাবি বাস্তবায়নের বিষয়ে চূড়ান্ত সমঝোতা না হওয়ায় সাজেক সড়কে অবরোধ অব্যাহত রয়েছে। এতে স্থানীয় বাসিন্দা, ব্যবসায়ী ও পর্যটকদের যাতায়াত এবং পর্যটননির্ভর অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।


