প্রকৃতির অনিন্দ্য সুন্দর ও মেঘের রাজ্য হিসেবে পরিচিত সাজেক আজ কেবল পর্যটকদের আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু নয়; বরং পাহাড়ে আধিপত্য বিস্তারকারী আঞ্চলিক সশস্ত্র দলগুলোর পারস্পরিক সংঘাত, বিশাল অঙ্কের চাঁদাবাজি এবং নতুন রাজনৈতিক কৌশলগত মেরুকরণের কারণে এক উত্তপ্ত জনপদে পরিণত হয়েছে। পর্যটন খাতকে ঘিরে চলা কোটি টাকার বাণিজ্যের নিয়ন্ত্রণ নিতে পাহাড়ের ভূ-রাজনীতিতে যে রুদ্ধশ্বাস খেলা চলছে, তার নেপথ্য কাহিনী এবং ‘সাজেক গণঅধিকার রক্ষা কমিটি’ নামের ছায়া সংগঠনের পেছনের কুশীলবদের বিষয়ে চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এসেছে।

সাজেকের রমরমা অর্থনীতি 
সাজেকে পর্যটন খাতকে কেন্দ্র করে বছরের পর বছর ধরে একটি শক্তিশালী অর্থনৈতিক অবকাঠামো গড়ে উঠেছে। এই অর্থনীতির চালিকাশক্তিগুলো মূলত কয়েকটি সুনির্দিষ্ট খাতের ওপর দাঁড়িয়ে রয়েছে। সাজেকে পর্যটকদের থাকার জন্য গড়ে উঠেছে বিলাসবহুল এবং স্থানীয় মাচাংঘর আদলে শতাধিক হোটেল-মোটেল। হোটেল মালিকরা কেবল এই আবাসন খাত থেকেই প্রতি বছর প্রায় ৩০ কোটি টাকার ব্যবসা করে থাকেন। পর্যটকদের ভোজনবিলাসের জন্য রয়েছে বাহারি রেস্তোরাঁ। এসব রেস্তোরাঁ থেকে প্রতি বছর পর্যটন মৌসুমে প্রায় ২২ থেকে ২৫ কোটি টাকার বাণিজ্য হয়ে থাকে।

সাজেক ও খাগড়াছড়ির মধ্যে সারা বছর পর্যটক আনা-নেওয়ার জন্য একটি সুসংহত ট্যুরিস্ট পরিবহন খাত রয়েছে। এই খাতের মালিকরা বছরজুড়ে আয় করেন প্রায় ৩০ কোটি টাকা। পর্যটনের পাশাপাশি আদা, হলুদ এবং বাঁশ ও ফুলঝাড়ুর মতো বনজ পণ্য সাজেকের অন্যতম প্রধান অর্থনৈতিক খাত হিসেবে শক্ত অবস্থান তৈরি করেছে।

ইউপিডিএফের চাঁদাবাজির স্বর্গরাজ্য দখল নিতে চায় জেএসএস
শান্তিচুক্তি বিরোধী পার্বত্য চট্টগ্রাম ভিত্তিক সশস্ত্র সংগঠন প্রসীত খীসার নেতৃত্বাধীন ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট (ইউপিডিএফ) সাজেকের এই অর্থনীতি পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ করে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক স্থানীয় ব্যবসায়ীদের সাক্ষ্য অনুযায়ী, সাজেকের পর্যটন ব্যবসা, পরিবহন খাত, স্থানীয় কৃষি পণ্য, বাঁশ ও ফুলঝাড়ুর ব্যবসা এমনকি ঝরনা থেকে সংগ্রহ করা পানির উপর চাঁদা-সহ নিয়মিত মোটা অঙ্কের চাঁদা পরিশোধ করেই ব্যবসায়ীদের সাজেকে ব্যবসা পরিচালনা করতে হয়।

এদিকে, দীর্ঘদিন ধরে জ্যোতিরিন্দ্র বোধিপ্রিয় লারমা ওরফে সন্তু লারমার নেতৃত্বাধীন পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি- পিসিজেএসএস বা জেএসএস এই লাভজনক পর্যটন নগরী সাজেকের নিয়ন্ত্রণ নিতে চাইলেও ইউপিডিএফের মজবুত কাঠামোর কারণে সফল হতে পারেনি। তবে শান্তিচুক্তি স্বাক্ষরকারী সংগঠন এই জেএসএস গত কয়েক মাস আগে অত্যন্ত সুকৌশলে সাজেকের নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে নিতে শুরু করে। স্থানীয়দের তথ্যমতে, বর্তমানে সাজেকের প্রায় ৭০ শতাংশ এলাকা সন্তু লারমার সংগঠনটির দখলে চলে গেছে। সাজেক জয়ের এই মিশনে সামনে থেকে জেএসএসকে যিনি নেতৃত্ব দিয়েছেন, তিনি হলেন তরু চাকমা।

কে এই তরু চাকমা?
তরু চাকমা মূলত একজন সশস্ত্র ক্যাডার এবং তিনি পার্বত্য চট্টগ্রামের সশস্ত্র সংগঠন ইউপিডিএফ-এর সংস্কারপন্থী অংশ তথা 'ইউপিডিএফ (সংস্কার)' বা গণতান্ত্রিক ইউপিডিএফের খাগড়াছড়ি শাখার সশস্ত্র কমান্ডার হিসেবে পরিচিত। তার বাড়ি খাগড়াছড়ি সদরে।

তরু চাকমা, আটকের সময়ের ছবি

অনুসন্ধানে জানা যায়, তরু চাকমা প্রকৃতপক্ষে ভারতের মিজোরাম প্রদেশের আইজলের স্থায়ী নাগরিক এবং তার পরিবার সেখানেই বসবাস করে। মূলত বাংলাদেশে সশস্ত্র কর্মকাণ্ড পরিচালনা করার জন্যই তিনি একাকী খাগড়াছড়িতে বসবাস করছেন।

মাস দুয়েক আগে তিনি মিজোরামের নিজ জেলা আইজলে অস্ত্রসহ পুলিশের হাতে আটক হয়েছিলেন। পরবর্তীতে পিসিজেএসএস-এর ভারতীয় শাখার প্রত্যক্ষ সহযোগিতায় তিনি কারাগার থেকে মুক্ত হয়ে রাঙামাটির বাঘাইছড়ি উপজেলার খেদারমারা ইউনিয়নে এসে আশ্রয় নেন। সেখান থেকে তিনি জেএসএস-এর শীর্ষ নেতাদের সাথে যোগাযোগ স্থাপন করেন এবং পরবর্তীতে সারোয়াতলী হয়ে জেএসএস-এর নিয়ন্ত্রিত এলাকায় যোগ দেন। তার এই অন্তর্ভুক্তি ও প্রত্যক্ষ সহযোগিতাতেই পিসিজেএসএস সাজেকে কয়েকটি ধারাবাহিক অভিযান চালিয়ে ইউপিডিএফের নিয়ন্ত্রিত বেশির ভাগ এলাকা নিজেদের দখলে নিতে সক্ষম হয়।

কূলহারা ইউপিডিএফের নতুন কৌশল- ‘সাজেক গণঅধিকার রক্ষা কমিটি’
প্রসীত খীসার নেতৃত্বাধীন ইউপিডিএফ অস্ত্রের জোরে সাজেকে তাদের আধিপত্য বা হারানো নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে ব্যর্থ হওয়ার পর সম্পূর্ণ ভিন্ন রাজনৈতিক কৌশল অবলম্বন করে। এলাকা নিজেদের কব্জায় রাখতে তারা স্থানীয় জনসাধারণ এবং নিজেদের রাজনৈতিক শাখার কর্মীদের সমন্বয়ে একটি ছায়া সংগঠন দাঁড় করায়। স্থানীয় জনগণ ও সংবাদকর্মীদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, এই সংগঠনটির নাম ‘সাজেক গণঅধিকার রক্ষা কমিটি’। সংগঠনটির পক্ষ থেকে জানানো হয় যে এটি ২০২৪ সালের ১৮ জুন প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। সাজেকের নিয়ন্ত্রণ হাতছাড়া হয়ে যাওয়ার পর দিশেহারা ইউপিডিএফ তাদের রাজনৈতিক কৌশলের অংশ হিসেবে এই ছায়া সংগঠনটিকে মাঠে নামায়, যেখানে দলের বিভিন্ন শাখার নেতাকর্মী ছাড়াও তাদের সমর্থিত নারী-পুরুষদের সম্পৃক্ত করা হয়েছে। এই পুরো সংগঠনের সামনের সারিতে থেকে নেতৃত্ব দিচ্ছেন বাবুধন চাকমা।

কে এই বাবুধন চাকমা?
সাজেক গণঅধিকার রক্ষা কমিটির বর্তমান আহ্বায়ক হলেন বাবুধন চাকমা। তার অতীত ও বর্তমান কর্মকাণ্ডের বিবরণ বেশ চাঞ্চল্যকর। অতীতে তিনি রাঙামাটির লংগদু উপজেলার মাইনী এলাকায় বসবাস করতেন। আনুমানিক দেড় দশক আগে তিনি সাজেকের মাচালং বাজারে এসে ভাসমান কাপড়ের ব্যবসা শুরু করেন। পরবর্তীতে বাঘাইছড়ির বাঘাইহাট ও করেঙ্গাতলীতেও তিনি ভাসমান কাপড় বিক্রেতা হিসেবে পরিচিত ছিলেন।

সাজেক গণঅধিকার রক্ষা কমিটির আহ্বায়ক বাবুধন চাকমা

মাচালং বাজারটি ইউপিডিএফের একটি অত্যন্ত শক্তিশালী ও অধ্যুষিত অঞ্চল। ব্যবসার সুবাদে স্থানীয় ইউপিডিএফ নেতাকর্মীদের সাথে তার ঘনিষ্ঠ সখ্য গড়ে ওঠে। মোটামুটি শিক্ষিত ও চতুর প্রকৃতির হওয়ায় তিনি দ্রুত ইউপিডিএফের অন্ধ বিশ্বাস অর্জন করতে সক্ষম হন।

মাত্র কয়েক বছরের ব্যবধানে তিনি মাচালং বাজারে ইউপিডিএফের চাঁদাবাজি বা অর্থ আদায়ের 'কালেক্টর' হিসেবে দায়িত্ব পালন শুরু করেন। তার তৎপরতায় সন্তুষ্ট হয়ে ইউপিডিএফ পরবর্তীতে তাকে পুরো সাজেক অঞ্চলের তাদের নিজস্ব 'বিচার বিভাগের প্রধান' হিসেবে নিযুক্ত করে।

ইউপিডিএফের বিচার বিভাগ সামলানোর পাশাপাশি তিনি প্রথমে 'সাজেক গণঅধিকার রক্ষা কমিটি'র সদস্য সচিব এবং বর্তমানে আহ্বায়ক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। এর পাশাপাশি তিনি গঙ্গারাম উজোবাজার ব্যবসায়ী কমিটির সহ-সভাপতির দায়িত্বেও রয়েছেন। তিনি বাঘাইছড়ির বঙ্গলতলী ইউনিয়ন থেকে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন এবং উজোবাজারে তার নিজস্ব একটি কাপড় ও জুতোর দোকান রয়েছে। স্থানীয় জনগণ ও প্রশাসনিক বিভিন্ন সূত্র থেকে এই তথ্য নিশ্চিত হওয়া গেছে।

সাজেকের মাচালং বন বিভাগের কার্যালয়ে হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনায় বন বিভাগের দায়ের করা মামলার এজাহারভুক্ত আসামি বাবুধন চাকমা। পুলিশের খাতায় তিনি পলাতক আসামি হিসেবে তালিকাভুক্ত হলেও বর্তমানে তিনি সাজেকে ইউপিডিএফের প্রধান ফায়ারব্র্যান্ড হিসেবে প্রকাশ্যে সামনের সারিতে থেকে অবরোধের মতো কঠোর কর্মসূচি পরিচালনা ও নেতৃত্ব দিয়ে যাচ্ছেন।

তারই নেতৃত্বে সাজেক থেকে সন্তু লারমার নেতৃত্বাধীন পিসিজেএসএসের সশস্ত্র সদস্যদের অপসারণ, সাজেকে ধারাবাহিক অস্থিতিশীল পরিস্থিতি সৃষ্টি, সাধারণ মানুষকে হুমকি-ভয়ভীতি প্রদর্শনের প্রতিবাদ, সন্ত্রাসীদের দ্রুত গ্রেফতার এবং স্থানীয়দের সার্বিক নিরাপত্তা ও জানমাল রক্ষার দাবিতে গত ১১ অক্টোবর থেকে সাজেকে সড়ক অবরোধ কর্মসূচি পালিত হয়ে আসছে। পূজার ছুটির দিনগুলো (১৬-২১ অক্টোবর) বাদ দিয়ে ছুটির পর এই অবরোধ কার্যক্রম পুনরায় সচল করা হয়।

সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর বক্তব্য
এই সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে ইউপিডিএফের কেন্দ্রীয় সংগঠক ও মুখপাত্র মাইকেল চাকমার সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, “সাজেক নিয়ে নিরাপত্তা বাহিনী একটি নাটক করেছে। তারা বলপ্রয়োগ করে পর্যটকদের নিয়ে আসার নামে অবরোধ ভাঙার চেষ্টা চালিয়েছে। সাজেক নিয়ে যারা যৌক্তিক আন্দোলন করছে, তাদের সাথে ইউপিডিএফের কোনো প্রাতিষ্ঠানিক সম্পৃক্ততা নেই। যারা এই আন্দোলনে নেতৃত্ব বা অংশগ্রহণ করছে তাদের মধ্যে সাধারণ কৃষক, ব্যবসায়ী ও কারবারীরা রয়েছেন।”

মাইকেল চাকমা
মাইকেল চাকমা। ফাইল ছবি

তবে তিনি স্বীকার করে বলেন, “তাদের এই আন্দোলনের প্রতি আমাদের রাজনৈতিক সংহতি রয়েছে।”

অন্যদিকে, জেএসএস-এর রাঙামাটি জেলা শাখার সভাপতি ডা. গঙ্গা মানিক চাকমার সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি স্পষ্ট জানিয়ে দেন যে, এ বিষয়ে তিনি কোনো মন্তব্য করতে পারছেন না। দলীয় প্রাতিষ্ঠানিক নিয়ম ও শৃঙ্খলার কথা উল্লেখ করে তিনি পিসিজেএসএসের তথ্য ও গবেষণা সম্পাদক সজীব চাকমার মেসেঞ্জারে যোগাযোগ করার পরামর্শ দেন। সজীব চাকমার মেসেঞ্জারে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি।

পাহাড়ের অন্যতম অর্থনৈতিক প্রাণকেন্দ্র সাজেককে ঘিরে দুটি প্রধান আঞ্চলিক দলের এই অস্ত্র ও রাজনীতির দ্বিমুখী লড়াই কেবল ক্ষমতার মারপ্যাঁচ নয়, বরং এটি সমগ্র অঞ্চলের আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি ও জাতীয় নিরাপত্তাকে এক গভীর অনিশ্চয়তার মুখে ঠেলে দিচ্ছে। পর্দার আড়ালে থাকা সশস্ত্র সংগঠনের প্রত্যক্ষ মদদে এবং পলাতক আসামিদের নেতৃত্বে পরিচালিত এসব ছায়া কমিটি পাহাড়ের শান্তি প্রতিষ্ঠার পথকে আরও বেশি কণ্টকাকীর্ণ করে তুলছে বলে মনে করছেন সচেতন মহল।