সাজেকে সম্প্রতি সংঘটিত সড়ক অবরোধ ও বিক্ষোভকে কেন্দ্র করে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে এসেছে-নিরাপত্তার দাবিতে পরিচালিত এই আন্দোলনের প্রকৃত উদ্দেশ্য কী? সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, নাকি প্রতিদ্বন্দ্বী সশস্ত্র সংগঠনকে সরিয়ে দিয়ে একটি নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর একচ্ছত্র আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করা? যে সংগঠনের বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন ধরে স্থানীয় জনগণকে ভয়ভীতি প্রদর্শন, অপহরণ, চাঁদাবাজি, বাধ্যতামূলক শ্রম এবং সম্পত্তি ধ্বংসের মতো গুরুতর অভিযোগ রয়েছে, সেই সংগঠনের সমর্থনে পরিচালিত আন্দোলনের উদ্দেশ্য ও নৈতিক অবস্থান নিয়ে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক।

নিরাপত্তা বাহিনীর দায়িত্ব কোনো একটি সশস্ত্র সংগঠনের প্রতিপক্ষকে সরিয়ে দিয়ে অন্য সংগঠনের আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করা নয়। বরং সব সশস্ত্র গোষ্ঠীর অবৈধ কর্মকাণ্ড প্রতিরোধ, অপরাধের নিরপেক্ষ তদন্ত এবং সাধারণ মানুষের জানমাল ও মৌলিক অধিকার সুরক্ষিত করা। প্রতিপক্ষের সশস্ত্র উপস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ থাকলে তা অবশ্যই গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করতে হবে। কিন্তু সেই উদ্বেগকে কোনো পক্ষের একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার হাতিয়ার হতে দেওয়া যায় না।

একটি বিশেষ প্রতিবেদনে ইউপিডিএফ (প্রসীত)-এর বিরুদ্ধে দীর্ঘদিনের বিভিন্ন গুরুতর অভিযোগ তুলে ধরা হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০০৭ সালের পর থেকে সাজেক ও বাঘাইছড়ির বিভিন্ন এলাকায় সংগঠনটির সশস্ত্র সদস্যদের বিরুদ্ধে অপহরণ, চাঁদাবাজি, নির্যাতন, বাধ্যতামূলক শ্রম এবং সাধারণ মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রায় বাধা সৃষ্টির অভিযোগ রয়েছে। এসব অভিযোগের সত্যতা প্রতিষ্ঠিত হলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।

এ বছরের ২১ অক্টোবরে খাগড়াছড়ির সাতজন পাহাড়ি গ্রামবাসীকে অস্ত্রের মুখে অপহরণের অভিযোগ উঠেছে ইউপিডিএফ (প্রসীত)-এর সদস্যদের বিরুদ্ধে। এর আগে, ১০ জুন ২০২৬ সাজেক ইউনিয়নের কালুছড়া এলাকায় পাঁচজন ত্রিপুরা কৃষকের প্রায় ৮০০ মণ শুকনো হলুদ পুড়িয়ে দেওয়ার অভিযোগও ওঠে একই সংগঠনের সশস্ত্র সদস্যদের বিরুদ্ধে। প্রতিবেদনে এ ঘটনায় সংগঠনটির কয়েকজন নেতার সংশ্লিষ্টতার অভিযোগও উল্লেখ করা হয়েছে। এসব ঘটনা সত্য হলে তা শুধু ব্যক্তিগত সম্পত্তির ওপর আঘাত নয়, বরং স্থানীয় কৃষকদের জীবিকা ও অর্থনৈতিক নিরাপত্তার ওপর গুরুতর আঘাত।

এছাড়া গত ১২ জুন ২০২৫ সাজেকের বিভিন্ন পাড়া থেকে ১৯ জন গ্রামবাসীকে তুলে নিয়ে দুই দিন আটকে রাখা এবং অর্থ আদায়ের পর ছেড়ে দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। ৭ অক্টোবর ২০২৫ দক্ষিণ দাঁড়িপাড়া থেকে জুমচাষি চন্দক চাকমাকে অপহরণ এবং চাঁদার অর্থ দিতে না পারায় ভূবনময় ত্রিপুরা ও সাধনপ্রিয় চাকমাকে মারধরের অভিযোগও রয়েছে সংগঠনটির সদস্যদের বিরুদ্ধে। এসব অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণে ভুক্তভোগীদের বক্তব্য, প্রত্যক্ষদর্শীদের সাক্ষ্য এবং সংশ্লিষ্ট নথিপত্র যাচাই করা জরুরি। কোনো অভিযোগই যেন রাজনৈতিক পরিচয় বা সশস্ত্র প্রভাবের কারণে তদন্তের বাইরে না থাকে।

একই সঙ্গে সাজেকের কিছু এলাকায় স্থানীয় কৃষকদের কাছ থেকে কম দামে আদা, হলুদ, মরিচ ও তিল কিনতে বাধ্য করা এবং সাধারণ মানুষকে বিনা পারিশ্রমিকে জমি পরিষ্কার, চাষাবাদ, ফসল সংগ্রহ ও পরিবহনের কাজে নিয়োজিত করার অভিযোগ রয়েছে ইউপিডিএফের কয়েকজন কমান্ডারের বিরুদ্ধে। ২০২৫ সালের অক্টোবর মাসে প্রায় এক মাস ধরে সাজেকের অন্তত ২০টি গ্রামে চাল, ডাল, তেলসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য পরিবহনে নিষেধাজ্ঞা আরোপের অভিযোগও প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। এসব অভিযোগ সত্য হলে স্থানীয় মানুষের খাদ্যনিরাপত্তা, কৃষিকাজ, ব্যবসা-বাণিজ্য এবং স্বাভাবিক চলাচলের স্বাধীনতা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার কথা।

কোনো রাজনৈতিক সংগঠন কিংবা সশস্ত্র গোষ্ঠীর সাধারণ মানুষের শ্রম, কৃষিপণ্য, ব্যবসা-বাণিজ্য ও চলাচলের ওপর জোরপূর্বক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার অধিকার নেই। জনগণের ওপর ভয়ভীতি ও চাপ প্রয়োগ করে নিজেদের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করা কোনোভাবেই রাজনৈতিক অধিকার চর্চার অংশ হতে পারে না। তাই এসব অভিযোগের সুরাহা না করে শুধু প্রতিপক্ষের সশস্ত্র উপস্থিতি নিয়ে আন্দোলন পরিচালিত হলে সেই আন্দোলনের প্রকৃত উদ্দেশ্য ও গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক।

সাম্প্রতিক অবরোধ ঘিরে সবচেয়ে উদ্বেগজনক অভিযোগগুলোর একটি হলো স্থানীয় মানুষকে বাধ্য করে মিছিল ও সমাবেশে অংশগ্রহণ করানো। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক গ্রামবাসীদের বক্তব্য উদ্ধৃত করে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, অনেক ক্ষেত্রে স্থানীয়দের বিভিন্ন কর্মসূচিতে অংশ নিতে চাপ দেওয়া হয়। মিছিলে অনুপস্থিত থাকলে এক হাজার টাকা জরিমানা কিংবা অন্য ধরনের শাস্তির হুমকি দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে। এসব অভিযোগের স্বাধীন যাচাই প্রয়োজন। তবে অভিযোগগুলো সত্য হলে তা মানুষের রাজনৈতিক স্বাধীনতা ও ব্যক্তিগত অধিকারের পরিপন্থী।

প্রতিবাদ করা যেমন নাগরিকের অধিকার, তেমনি কোনো প্রতিবাদে অংশ না নেওয়াও তাঁর ব্যক্তিগত স্বাধীনতা। ভয়ভীতি, জরিমানা কিংবা শাস্তির হুমকি দিয়ে মানুষকে মিছিলে হাজির করা হলে সেই উপস্থিতিকে স্বতঃস্ফূর্ত জনসমর্থনের প্রমাণ হিসেবে দেখানো যায় না। বরং এতে প্রশ্ন ওঠে-আন্দোলনটি সত্যিকার অর্থে জনগণের স্বতঃস্ফূর্ত দাবির প্রতিফলন, নাকি সাংগঠনিক চাপের মাধ্যমে জনসমর্থনের চিত্র তুলে ধরার চেষ্টা?

গত ২২ অক্টোবর ২০২৬ সাজেকে সড়ক অবরোধের কারণে প্রায় তিন হাজার পর্যটক আটকা পড়েন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তরের (আইএসপিআর) বরাতে সশস্ত্র সদস্যদের নিরাপত্তা বাহিনী ও পর্যটকদের লক্ষ্য করে গুলিবর্ষণ এবং স্থানীয় জনগণকে মানবঢাল হিসেবে ব্যবহারের অভিযোগও তুলে ধরা হয়েছে। এসব অভিযোগের সত্যতা, ঘটনার পূর্ণ বিবরণ এবং দায় নির্ধারণে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বক্তব্য ও স্বাধীন তদন্ত জরুরি।

তবে একটি বিষয় স্পষ্ট-সড়ক অবরোধ ও সশস্ত্র সংঘাতের সবচেয়ে বড় মূল্য দিতে হয় সাধারণ মানুষকে। পর্যটননির্ভর ব্যবসায়ী, পরিবহনশ্রমিক, স্থানীয় কৃষক এবং সাধারণ বাসিন্দারা আর্থিক ক্ষতি ও নিরাপত্তাহীনতার মুখে পড়েন। মানুষের জীবিকা, চলাচল ও নিরাপত্তাকে জিম্মি করে কোনো রাজনৈতিক বা সাংগঠনিক দাবি আদায়ের চেষ্টা গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।

সাজেক কার্বারি অ্যাসোসিয়েশন ও সাজেক গণঅধিকার রক্ষা কমিটির ঘোষিত দাবির মধ্যে জেএসএসের (সন্তু লারমা) সশস্ত্র সদস্যদের এলাকা থেকে সরিয়ে নেওয়ার বিষয়টি রয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। সংগঠন দুটির দাবি, প্রতিপক্ষের সশস্ত্র উপস্থিতির কারণে স্থানীয় বাসিন্দারা নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন। এই অভিযোগও গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করা প্রয়োজন। কোনো সশস্ত্র সংগঠনের উপস্থিতি যদি সাধারণ মানুষের নিরাপত্তার জন্য হুমকি সৃষ্টি করে, তবে তার বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। কিন্তু সেই ব্যবস্থা যেন অন্য কোনো সশস্ত্র গোষ্ঠীর একচ্ছত্র প্রভাব প্রতিষ্ঠার সুযোগ তৈরি না করে, সেটিও নিশ্চিত করা জরুরি।

প্রশ্ন হলো, প্রতিপক্ষের অস্ত্রকে অবৈধ বলে নিজের অস্ত্রের জন্য ছাড় দাবি করা যায় কি? প্রতিপক্ষের চাঁদাবাজির বিরোধিতা করে নিজের বিরুদ্ধে ওঠা চাঁদাবাজির অভিযোগ উপেক্ষা করার সুযোগ কোথায়? যদি কোনো আন্দোলনের প্রকৃত লক্ষ্য হয় প্রতিদ্বন্দ্বী সংগঠনকে সরিয়ে দিয়ে একটি নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা, তাহলে সেই আন্দোলন সাধারণ মানুষের নিরাপত্তার স্থায়ী সমাধান দিতে পারবে না। বরং তা পাহাড়ে সশস্ত্র প্রতিযোগিতা ও আধিপত্যের সংঘাতকে আরও তীব্র করে তুলতে পারে।

সাজেকের চাকমা, ত্রিপুরা, মারমা, লুসাইসহ সব সম্প্রদায়ের মানুষের নিরাপদে বসবাস, কৃষিকাজ, ব্যবসা-বাণিজ্য এবং স্বাধীনভাবে মতপ্রকাশের অধিকার রয়েছে। কোনো সংগঠনের রাজনৈতিক অবস্থানের সঙ্গে একমত না হওয়া, তার বিরুদ্ধে অভিযোগ উত্থাপন করা কিংবা কোনো কর্মসূচিতে অংশ না নেওয়ার কারণে কাউকে ভয়ভীতি বা শাস্তির মুখে পড়তে হওয়া উচিত নয়। স্থানীয় মানুষের নিরাপত্তা ও অধিকার কোনো সংগঠনের রাজনৈতিক স্বার্থের অধীন হতে পারে না।

একইভাবে নিরাপত্তা বাহিনীর বিরুদ্ধেও কোনো অভিযোগ থাকলে তার নিরপেক্ষ তদন্ত ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। আইনের প্রয়োগ হতে হবে সবার জন্য সমান। কোনো সশস্ত্র সংগঠন, রাজনৈতিক পক্ষ কিংবা প্রভাবশালী ব্যক্তিকে বিশেষ সুবিধা দেওয়ার সুযোগ থাকা উচিত নয়। পাহাড়ে শান্তি প্রতিষ্ঠার অর্থ এক সশস্ত্র গোষ্ঠীর পরিবর্তে অন্য সশস্ত্র গোষ্ঠীর আধিপত্য প্রতিষ্ঠা নয়। শান্তির প্রকৃত অর্থ হলো সাধারণ মানুষের জীবন থেকে অস্ত্রের ভয়, অপহরণ, চাঁদাবাজি, জবরদস্তি ও সহিংসতার অবসান ঘটানো।

সাজেকের সাম্প্রতিক ঘটনাবলি তাই একটি মৌলিক প্রশ্ন সামনে এনেছে-নিরাপত্তার দাবি কি সত্যিই সাধারণ মানুষকে সুরক্ষা দেওয়ার জন্য, নাকি সেই দাবির আড়ালে রাজনৈতিক ও সশস্ত্র আধিপত্যের প্রতিযোগিতা চলছে? এই প্রশ্নের উত্তর কোনো পক্ষের প্রচার, পাল্টাপাল্টি অভিযোগ কিংবা জনসমাবেশের উপস্থিতি দিয়ে নির্ধারণ করা সম্ভব নয়। এর উত্তর পেতে প্রয়োজন নিরপেক্ষ তদন্ত, প্রমাণভিত্তিক তথ্য প্রকাশ, সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের জবাবদিহি এবং স্থানীয় জনগণের স্বাধীনভাবে মতামত প্রকাশের পরিবেশ।

সাজেকের মানুষ কোনো সংগঠনের ক্ষমতার লড়াইয়ে জিম্মি হয়ে থাকতে পারেন না। তাদের প্রয়োজন নিরাপত্তা, স্বাধীনতা, জীবিকার নিশ্চয়তা এবং আইনের সমান সুরক্ষা। নিরাপত্তার নামে নতুন কোনো আধিপত্য প্রতিষ্ঠিত হলে তা শান্তির সমাধান হবে না; বরং সাধারণ মানুষের দীর্ঘদিনের অনিরাপত্তাকে আরও দীর্ঘায়িত করবে। তাই এখন সবচেয়ে জরুরি হলো—সব সশস্ত্র পক্ষের বিরুদ্ধে একই মানদণ্ডে আইন প্রয়োগ এবং পাহাড়ের মানুষের অধিকার ও নিরাপত্তাকে সব রাজনৈতিক স্বার্থের ঊর্ধ্বে স্থান দেওয়া।